আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বীথিকা কাব্যগ্রন্থের ‘পথিক’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা হলো ‘পথিক’। এই কবিতায় এক চিরন্তন মানবীয় দ্বন্দ্ব অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে—ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা মানুষের বাইরের অসীম মুক্ত জগতের প্রতি আকর্ষণ এবং পথে চলা মুক্ত পথিকের ক্ষণিকের জন্য ঘরের স্নেহের বাঁধনের প্রতি টান।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপথিক
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থবীথিকা
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনমনস্তাত্ত্বিক ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা (Psychological and Romantic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার অন্ত্যপর্বের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থ। এই পর্বের কবিতায় কবির দার্শনিক ভাবনা, জীবনের অতীত স্মৃতি এবং মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো অত্যন্ত গভীরভাবে উঠে এসেছে। ‘পথিক’ কবিতায় কবি দুটি ভিন্ন সত্তার মানসিক অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন—একজন যে আপন ক্ষুদ্র সংসারের ঘরে বন্দী থেকে বাইরের বাঁধনহীন সুরের ডাকে কাঁদে, আর অন্যজন যে পথিক হয়েও চলার পথে সংসারের ছায়া ও বাঁধনের ডাক অনুভব করে। মুক্তি এবং বন্ধনের এই শাশ্বত দ্বন্দ্বই কবিতাটির মূল সুর।

পথিক – সম্পূর্ণ কবিতা

তুমি আছ বসি তোমার ঘরের দ্বারে
ছোটো তব সংসারে।
মনখানি যবে ধায় বাহিরের পানে
ভিতরে আবার টানে।
বাঁধনবিহীন দূর
বাজাইয়া যায় সুর,
বেদনার ছায়া পড়ে তব আঁখি-‘পরে–
নিশ্বাস ফেলি মন্দগমন ফিরে চলে যাও ঘরে।
    আমি-যে পথিক চলিয়াছি পথ বেয়ে
          দূরের আকাশে চেয়ে;
    তোমার ঘরের ছায়া পড়ে পথপাশে,
          সে ছায়া হৃদয়ে আসে।
              যত দূরে পথ যাক
              শুনি বাঁধনের ডাক,
    ক্ষণেকের তরে পিছনে আমায় টানে--
 নিশ্বাস ফেলি ত্বরিতগমন চলি সম্মুখপানে।

    উদার আকাশে আমার মুক্তি দেখি
            মন তব কাঁদিছে কি?
    এ মুক্তিপথে তুমি পেতে চাও ছাড়া,
          দুয়ারে লেগেছে নাড়া।
              বাঁধনে বাঁধনে টানি
              রচিলে আসনখানি,
    দেখিনু তোমার আপন সৃষ্টি তাই--
 শূন্যতা ছাড়ি সুন্দরে তব আমার মুক্তি চাই।

Romanized Version

Tumi aachho bosi tomar ghorer dware
Chhoto tobo songsare.
Monkhani jobe dhay bahirer pane
Bhitore abar tane.
Badhonbihin dur
Bajaiya jay shur,
Bedonar chhaya pore tobo akhi-‘pore–
Nishwas feli mondogomon phire chole jao ghore.
    Ami-je pothik choliyachi poth beye
          Durer akashe cheye;
    Tomar ghorer chhaya pore pothpashe,
          Se chhaya hridoye ashe.
              Joto dure poth jak
              Shuni badhoner dak,
    Khoneker tore pichhone amay tane--
 Nishwas feli tworitogomon choli sommukhpane.

    Udar akashe amar mukti dekhi
            Mon tobo kandichhe ki?
    E muktipothe tumi pete chao chhara,
          Duare legechhe nara.
              Badhone badhone tani
              Rochile asonkhani,
    Dekhinu tomar apon srishti tai--
 Shunnota chhari sundore tobo amar mukti chai.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সংসারী মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্ব:
“তুমি আছ বসি তোমার ঘরের দ্বারে / ছোটো তব সংসারে। / মনখানি যবে ধায় বাহিরের পানে / ভিতরে আবার টানে।”
— যে মানুষটি তার ছোট সংসারের গণ্ডিতে আবদ্ধ, অসীম দূরের সুর তাকে বারবার ডাকে; কিন্তু পিছুটান তাকে আবার ঘরের ভেতরেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
  • পথিকের পথে চলা ও ক্ষণিক মোহ:
“আমি-যে পথিক চলিয়াছি পথ বেয়ে … যত দূরে পথ যাক / শুনি বাঁধনের ডাক, / ক্ষণেকের তরে পিছনে আমায় টানে–“
— অসীম আকাশের দিকে চেয়ে চলা পথিকও চলার পথে গৃহস্থের ঘরের ছায়া দেখে ক্ষণিকের জন্য সেই বাঁধনের টান অনুভব করে, যদিও সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে সামনের দিকেই এগিয়ে যায়।
  • সুন্দরের মাঝে প্রকৃত মুক্তি:
“বাঁধনে বাঁধনে টানি / রচিলে আসনখানি, / দেখিনু তোমার আপন সৃষ্টি তাই– / শূন্যতা ছাড়ি সুন্দরে তব আমার মুক্তি চাই।”
— কেবল ঘর ছাড়লেই মুক্তি মেলে না। সংসারের নানা বাঁধন দিয়ে যে সুন্দর সৃষ্টি তৈরি হয়, সেই সুন্দরের মাঝেই কবি শূন্যতা পরিহার করে প্রকৃত মুক্তি খুঁজে পেতে চেয়েছেন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (বীথিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত