রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নদী’ একটি দীর্ঘ আখ্যানধর্মী প্রকৃতিকবিতা। কবিতাটি একই নামের নদী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত এবং নদীর উৎস থেকে তার সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রাকে এক জীবন্ত কাহিনির মতো উপস্থাপন করেছে। নদী কাব্যগ্রন্থটি ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থটি কবির ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর শুভপরিণয়দিনে উপহার দেওয়া হয়েছিল।
কবিতার শুরুতে একটি শিশুসুলভ কৌতূহল—“জলে কেন ওঠে এত ঢেউ”—থেকে প্রশ্নটি ধীরে ধীরে নদীর জন্ম, পাহাড়ি উৎস, অরণ্য, পাহাড়ি মানুষ ও প্রাণী, সমতল বাংলার গ্রামজীবন, কৃষি, জনপদ, ঋতু, জোয়ার-ভাটা এবং শেষ পর্যন্ত সাগরের অসীমতার দিকে এগিয়ে যায়। ফলে ‘নদী’ কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়; এটি প্রবাহ, জীবন, যাত্রা, পরিবর্তন এবং বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে মিলনের একটি কাব্যিক রূপক হিসেবেও পাঠ করা যায়।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| কবিতার নাম | নদী |
| কবি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| কাব্যগ্রন্থ | নদী |
| প্রকাশকাল | ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ |
| বঙ্গাব্দ | ১৩০২ |
| ধরন | প্রকৃতি ও আখ্যানধর্মী কবিতা |
| কেন্দ্রীয় বিষয় | নদীর জন্ম, যাত্রা, প্রকৃতি, মানুষ, জনজীবন ও সাগরে মিলন |
| প্রধান প্রতীক | নদী, পাহাড়, অরণ্য, গ্রাম, জোয়ার-ভাটা, সাগর |
| উৎসর্গ | বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভপরিণয় উপলক্ষে |
| প্রধান ভাব | প্রবাহ, অনুসন্ধান, বৈচিত্র্য, জীবন ও অসীমের সঙ্গে মিলন |
নদী কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গে লেখা আছে: “পরমস্নেহাস্পদ / শ্রীমান বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হস্তে / তাঁহার শুভপরিণয়দিনে / এই গ্রন্থখানি উপহৃত হইল।” তারিখ হিসেবে ২২ মাঘ ১৩০২ উল্লেখ রয়েছে।
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যজীবনের উনিশ শতকের শেষ দশক ছিল প্রকৃতি, প্রেম, সৌন্দর্য, মানুষের জীবন এবং নদীমাতৃক বাংলার সঙ্গে গভীর পরিচয়ের সময়। নদী কাব্যগ্রন্থ ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয়; একই সময়ের আশপাশে চিত্রা ও চৈতালী-ও প্রকাশিত হয়।
‘নদী’ কবিতায় প্রকৃতি কোনো স্থির দৃশ্য নয়। নদী চলমান, আর তার চলার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পৃথিবী। পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা থেকে অরণ্য, অরণ্য থেকে পাহাড়ি মানুষের জীবন, তারপর সমতলের কৃষিজীবন, গ্রাম, বাজার, ধর্মীয় স্থাপনা, পশুপাখি, মানুষের কাজকর্ম এবং শেষে সাগর—নদী যেন এক বিশাল চলমান দৃষ্টির বাহন।
কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, নদী নিজেই কবিতার প্রধান চরিত্র। সে ঘুমায়, জাগে, খেলে, হাসে, ছুটে চলে, সঙ্গী সংগ্রহ করে, বাধা অতিক্রম করে, কখনো ফুলে ওঠে, কখনো শুকিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সাগরের বুকে আশ্রয় নেয়।
সম্পূর্ণ কবিতা
নদী
ওরে তোরা কি জানিস কেউ
জলে কেন ওঠে এত ঢেউ।
ওরা দিবস-রজনী নাচে,
তাহা শিখেছে কাহার কাছে।
শোন্ চলচল্ ছলছল্
সদাই গাহিয়া চলেছে জল।
ওরা কারে ডাকে বাহু তুলে,
ওরা কার কোলে ব’সে দুলে।
সদা হেসে করে লুটোপুটি,
চলে কোন্খানে ছুটোছুটি।
ওরা সকলের মন তুষি
আছে আপনার মনে খুশি।
আমি বসে বসে তাই ভাবি,
নদী কোথা হতে এল নাবি।
কোথায় পাহাড় সে কোন্খানে,
তাহার নাম কি কেহই জানে।
কেহ যেতে পারে তার কাছে,
সেথায় মানুষ কি কেউ আছে।
সেথা নাহি তরু নাহি ঘাস,
নাহি পশুপাখিদের বাস,
সেথা শবদ কিছু না শুনি,
পাহাড় বসে আছে মহামুনি।
তাহার মাথার উপরে শুধু
সাদা বরফ করিছে ধু ধু।
সেথা রাশি রাশি মেঘ যত
থাকে ঘরের ছেলের মতো।
শুধু হিমের মতন হাওয়া
সেথায় করে সদা আসা-যাওয়া,
শুধু সারা রাত তারাগুলি
তারে চেয়ে দেখে আঁখি খুলি।
শুধু ভোরের কিরণ এসে
তারে মুকুট পরায় হেসে।
সেই নীল আকাশের পায়ে
সেথা কোমল মেঘের গায়ে
সেথা সাদা বরফের বুকে
নদী ঘুমায় স্বপনসুখে।
কবে মুখে তার রোদ লেগে
নদী আপনি উঠিল জেগে,
কবে একদা রোদের বেলা
তাহার মনে পড়ে গেল খেলা।
সেখায় একা ছিল দিনরাতি,
কেহই ছিল না খেলার সাথি।
সেথায় কথা নাহি কারো ঘরে,
সেথায় গান কেহ নাহি করে।
তাই ঝুরু ঝুরু ঝিরি ঝিরি।
নদী বাহিরিল ধীরি ধীরি।
মনে ভাবিল, যা আছে ভবে
সবই দেখিয়া লইতে হবে।
নীচে পাহাড়ের বুক জুড়ে
গাছ উঠেছে আকাশ ফুঁড়ে।
তারা বুড়ো বুড়ো তরু যত
তাদের বয়স কে জানে কত।
তাদের খোপে খোপে গাঁঠে গাঁঠে
পাখি বাসা বাঁধে কুটো-কাঠে।
তারা ডাল তুলে কালো কালো
আড়াল করেছে রবির আলো।
তাদের শাখায় জটার মতো
ঝুলে পড়েছে শেওলা যত।
তারা মিলায়ে মিলায়ে কাঁধ
যেন পেতেছে আঁধার-ফাঁদ।
তাদের তলে তলে নিরিবিলি
নদী হেসে চলে খিলিখিলি।
তারে কে পারে রাখিতে ধরে,
সে যে ছুটোছুটি যায় সরে।
সে যে সদা খেলে লুকোচুরি,
তাহার পায়ে পায়ে বাজে নুড়ি।
পথে শিলা আছে রাশি রাশি,
তাহা ঠেলে চলে হাসি হাসি।
পাহাড় যদি থাকে পথ জুড়ে
নদী হেসে যায় বেঁকেচুরে।
সেথায় বাস করে শিং-তোলা
যত বুনো ছাগ দাড়ি-ঝোলা।
সেথায় হরিণ রোঁয়ায় ভরা
তারা কারেও দেয় না ধরা।
সেথায় মানুষ নূতনতর,
তাদের শরীর কঠিন বড়ো।
তাদের চোখ দুটো নয় সোজা,
তাদের কথা নাহি যায় বোঝা।
তারা পাহাড়ের ছেলেমেয়ে
সদাই কাজ করে গান গেয়ে।
তারা সারা দিনমান খেটে
আনে বোঝাভরা কাঠ কেটে।
তারা চড়িয়া শিখর-‘পরে
বনের হরিণ শিকার করে।
নদী যত আগে আগে চলে
ততই সাথি জোটে দলে দলে।
তারা তারি মতো, ঘর হতে
সবাই বাহির হয়েছে পথে।
পায়ে ঠুনু ঠুনু বাজে নুড়ি,
যেন বাজিতেছে মল চুড়ি।
গায়ে আলো করে ঝিকিঝিক,
যেন পরেছে হীরার চিক।
মুখে কলকল কত ভাষে
এত কথা কোথা হতে আসে।
শেষে সখীতে সখীতে মেলি
হেসে গায়ে গায়ে হেলাহেলি।
শেষে কোলাকুলি কলরবে
তারা এক হয়ে যায় সবে।
তখন কলকল ছুটে জল–
কাঁপে টলমল ধরাতল,
কোথাও নীচে পড়ে ঝরঝর–
পাথর কেঁপে ওঠে থরথর,
শিলা খান্ খান্ যায় টুটে–
নদী চলে পথ কেটে কুটে।
ধারে গাছগুলো বড়ো বড়ো
তারা হয়ে পড়ে পড়ো-পড়ো।
কত বড়ো পাথরের চাপ
জলে খসে পড়ে ঝুপঝাপ।
তখন মাটি-গোলা ঘোলা জলে
ফেনা ভেসে যায় দলে দলে।
জলে পাক ঘুরে ঘুরে ওঠে,
যেন পাগলের মতো ছোটে।
শেষে পাহাড় ছাড়িয়ে এসে
নদী পড়ে বাহিরের দেশে।
হেথা যেখানে চাহিয়া দেখে
চোখে সকলি নূতন ঠেকে।
হেথা চারি দিকে খোলা মাঠ,
হেথা সমতল পথঘাট।
কোথাও চাষিরা করিছে চাষ,
কোথাও গোরুতে খেতেছে ঘাস।
কোথাও বৃহৎ অশথ গাছে
পাখি শিস দিয়ে দিয়ে নাচে।
কোথাও রাখাল ছেলের দলে
খেলা করিছে গাছের তলে।
কোথাও নিকটে গ্রামের মাঝে
লোকে ফিরিছে নানান কাজে।
কোথাও বাধা কিছু নাহি পথে,
নদী চলেছে আপন মতে।
পথে বরষার জলধারা
আসে চারি দিক হতে তারা,
নদী দেখিতে দেখিতে বাড়ে,
এখন কে রাখে ধরিয়া তারে।
তাহার দুই কূলে উঠে ঘাস,
সেথায় যতেক বকের বাস।
সেথা মহিষের দল থাকে,
তারা লুটায় নদীর পাঁকে।
যত বুনো বরা সেথা ফেরে
তারা দাঁত দিয়ে মাটি চেরে।
সেথা শেয়াল লুকায়ে থাকে,
রাতে হুয়া হুয়া করে ডাকে।
দেখে এইমতো কত দেশ,
কে বা গনিয়া করিবে শেষ।
কোথাও কেবল বালির ডাঙা,
কোথাও মাটিগুলো রাঙা রাঙা,
কোথাও ধারে ধারে উঠে বেত,
কোথাও দুধারে গমের খেত।
কোথাও ছোটোখাটো গ্রামখানি,
কোথাও মাথা তোলে রাজধানী–
সেথায় নবাবের বড়ো কোঠা,
তারি পাথরের থাম মোটা।
তারি ঘাটের সোপান যত,
জলে নামিয়াছে শত শত।
কোথাও সাদা পাথরের পুলে
নদী বাঁধিয়াছে দুই কূলে।
কোথাও লোহার সাঁকোয় গাড়ি
চলে ধকো ধকো ডাক ছাড়ি।
নদী এইমতো অবশেষে
এল নরম মাটির দেশে।
হেথা যেথায় মোদের বাড়ি
নদী আসিল দুয়ারে তারি।
হেথায় নদী নালা বিল খালে
দেশ ঘিরেছে জলের জালে।
কত মেয়েরা নাহিছে ঘাটে,
কত ছেলেরা সাঁতার কাটে;
কত জেলেরা ফেলিছে জাল,
কত মাঝিরা ধরেছে হাল,
সুখে সারিগান গায় দাঁড়ি,
কত খেয়া-তরী দেয় পাড়ি।
কোথাও পুরাতন শিবালয়
তীরে সারি সারি জেগে রয়।
সেথায় দু-বেলা সকালে সাঁঝে
পূজার কাঁসর-ঘণ্টা বাজে।
কত জটাধারী ছাইমাখা
ঘাটে বসে আছে যেন আঁকা।
তীরে কোথাও বসেছে হাট,
নৌকা ভরিয়া রয়েছে ঘাট।
মাঠে কলাই সরিষা ধান,
তাহার কে করিবে পরিমাণ।
কোথাও নিবিড় আখের বনে
শালিক চরিছে আপন মনে।
কোথাও ধু ধু করে বালুচর
সেথায় গাঙশালিকের ঘর।
সেথায় কাছিম বালির তলে
আপন ডিম পেড়ে আসে চলে।
সেথায় শীতকালে বুনো হাঁস
কত ঝাঁকে ঝাঁকে করে বাস।
সেথায় দলে দলে চখাচখী
করে সারাদিন বকাবকি।
সেথায় কাদাখোঁচা তীরে তীরে
কাদায় খোঁচা দিয়ে দিয়ে ফিরে।
কোথাও ধানের খেতের ধারে
ঘন কলাবন বাঁশঝাঁড়ে
ঘন আম-কাঁঠালের বনে
গ্রাম দেখা যায় এক কোণে।
সেথা আছে ধান গোলাভরা,
সেথা খড়গুলা রাশ-করা।
সেথা গোয়ালেতে গোরু বাঁধা
কত কালো পাটকিলে সাদা।
কোথাও কলুদের কুঁড়েখানি,
সেথায় ক্যাঁ কোঁ ক’রে ঘোরে ঘানি।
কোথাও কুমারের ঘরে চাক,
দেয় সারাদিন ধরে পাক।
মুদি দোকানেতে সারাখন
বসে পড়িতেছে রামায়ণ।
কোথাও বসি পাঠশালা-ঘরে
যত ছেলেরা চেঁচিয়ে পড়ে,
বড়ো বেতখানি লয়ে কোলে
ঘুমে গুরুমহাশয় ঢোলে।
হেথায় এঁকে বেঁকে ভেঙে চুরে
গ্রামের পথ গেছে বহু দূরে।
সেথায় বোঝাই গোরুর গাড়ি
ধীরে চলিয়াছে ডাক ছাড়ি।
রোগা গ্রামের কুকুরগুলো
ক্ষুধায় শুঁকিয়া বেড়ায় ধুলো।
যেদিন পুরনিমা রাতি আসে
চাঁদ আকাশ জুড়িয়া হাসে।
বনে ও পারে আঁধার কালো,
জলে ঝিকিমিকি করে আলো।
বালি চিকিচিকি করে চরে,
ছায়া ঝোপে বসি থাকে ডরে।
সবাই ঘুমায় কুটিরতলে,
তরী একটিও নাহি চলে।
গাছে পাতাটিও নাহি নড়ে,
জলে ঢেউ নাহি ওঠে পড়ে।
কভু ঘুম যদি যায় ছুটে
কোকিল কুহু কুহু গেয়ে উঠে,
কভু ও পারে চরের পাখি
রাতে স্বপনে উঠিছে ডাকি।
নদী চলেছে ডাহিনে বামে,
কভু কোথাও সে নাহি থামে।
সেথায় গহন গভীর বন,
তীরে নাহি লোক নাহি জন।
শুধু কুমির নদীর ধারে
সুখে রোদ পোহাইছে পাড়ে।
বাঘ ফিরিতেছে ঝোপে ঝাপে,
ঘাড়ে পড়ে আসি এক লাফে।
কোথাও দেখা যায় চিতাবাঘ,
তাহার গায়ে চাকা চাকা দাগ।
রাতে চুপিচুপি আসে ঘাটে,
জল চকো চকো করি চাটে।
হেথায় যখন জোয়ার ছোটে,
নদী ফুলিয়ে ঘুলিয়ে ওঠে।
তখন কানায় কানায় জল,
কত ভেসে আসে ফুল ফল।
ঢেউ হেসে ওঠে খলখল,
তরী করি ওঠে টলমল।
নদী অজগরসম ফুলে
গিলে খেতে চায় দুই কূলে।
আবার ক্রমে আসে ভাঁটা পড়ে,
তখন জল যায় সরে সরে।
তখন নদী রোগা হয়ে আসে,
কাদা দেখা দেয় দুই পাশে।
বেরোয় ঘাটের সোপান যত
যেন বুকের হাড়ের মতো।
নদী চলে যায় যত দূরে
ততই জল ওঠে পুরে পুরে।
শেষে দেখা নাহি যায় কূল,
চোখে দিক হয়ে যায় ভুল।
নীল হয়ে আসে জলধারা,
মুখে লাগে যেন নুন-পারা।
ক্রমে নীচে নাহি পাই তল,
ক্রমে আকাশে মিশায় জল,
ডাঙা কোন্খানে পড়ে রয়–
শুধু জলে জলে জলময়।
ওরে একি শুনি কোলাহল,
হেরি একি ঘন নীল জল।
ওই বুঝি রে সাগর হোথা,
উহার কিনারা কে জানে কোথা।
ওই লাখো লাখো ঢেউ উঠে
সদাই মরিতেছে মাথা কুটে।
ওঠে সাদা সাদা ফেনা যত
যেন বিষম রাগের মতো।
জল গরজি গরজি ধায়,
যেন আকাশ কাড়িতে চায়।
বায়ু কোথা হতে আসে ছুটে,
ঢেউয়ে হাহা করে পড়ে লুটে।
যেন পাঠশালা-ছাড়া ছেলে
ছুটে লাফায়ে বেড়ায় খেলে।
হেথা যতদূর পানে চাই
কোথাও কিছু নাই, কিছু নাই।
শুধু আকাশ বাতাস জল,
শুধুই কলকল কোলাহল,
শুধু ফেনা আর শুধু ঢেউ–
আর নাহি কিছু নাহি কেউ।
হেথায় ফুরাইল সব দেশ,
নদীর ভ্রমণ হইল শেষ।
হেথা সারাদিন সারাবেলা
তাহার ফুরাবে না আর খেলা।
তাহার সারাদিন নাচ গান
কভু হবে নাকো অবসান।
এখন কোথাও হবে না যেতে,
সাগর নিল তারে বুক পেতে।
তারে নীল বিছানায় থুয়ে
তাহার কাদামাটি দিবে ধুয়ে।
তারে ফেনার কাপড়ে ঢেকে,
তারে ঢেউয়ের দোলায় রেখে,
তার কানে কানে গেয়ে সুর
তার শ্রম করি দিবে দূর।
নদী চিরদিন চিরনিশি
রবে অতল আদরে মিশি।
Romanized Version
Nodi
Ore tora ki janis keu
Jole keno othe eto dheu.
Ora dibos-rojoni nache,
Taha shikhechhe kahar kachhe.
Shon cholchol chholchhol
Sodai gahiya cholechhe jol.
Ora kare dake bahu tule,
Ora kar kole bo’se dule.
Soda hese kore lutoputi,
Chole konkhane chhutachhuti.
Ora sokoler mon tushi
Achhe aponar mone khushi.
Ami bose bose tai bhabi,
Nodi kotha hote el nabi.
Kothay pahar se konkhane,
Tahar nam ki kehoi jane.
Keho jete pare tar kachhe,
Sethay manush ki keu achhe.
Setha nahi taru nahi ghash,
Nahi poshupakhider bash,
Setha shobdo kichhu na shuni,
Pahar bose achhe mahamuni.
Tahar mathar upore shudhu
Sada borof korichhe dhu dhu.
Setha rashi rashi megh joto
Thake ghorer chheler moto.
Shudhu himer moton hawa
Sethay kore soda asa-jawa,
Shudhu sara rat taraguli
Tare cheye dekhe ankhi khuli.
Shudhu bhorer kiran eshe
Tare mukut poray hese.
Sei nil akasher paye
Setha komol megher gaye
Setha sada borof-er buke
Nodi ghumay swopnosukhe.
Kobe mukhe tar rod lege
Nodi apni uthil jege,
Kobe ekda roder bela
Tahar mone pore gel khela.
Sekhay eka chhilo dinrati,
Kehoi chhilo na khelar sathi.
Sethay kotha nahi karo ghore,
Sethay gan keho nahi kore.
Tai jhuru jhuru jhiri jhiri.
Nodi bahiril dhiri dhiri.
Mone bhabil, ja achhe bhobe
Sob-i dekhiya loite hobe.
Niche paharer buk jure
Gachh uthechhe akash phure.
Tara buro buro taru joto
Tader boyos ke jane koto.
Tader khope khope gãthe gãthe
Pakhi basa bãdhe kuto-kathe.
Tara dal tule kalo kalo
Aral korechhe robir alo.
Tader shakhay jatar moto
Jhule porechhe sheola joto.
Tara milaye milaye kãdh
Jeno petechhe andhar-phãd.
Tader tale tale niribili
Nodi hese chole khilikili.
Tare ke pare rakhite dhore,
Se je chhutachhuti jay sore.
Se je soda khele lukochuri,
Tahar paye paye baje nuri.
Pothe shila achhe rashi rashi,
Taha thele chole hasi hasi.
Pahar jodi thake poth jure
Nodi hese jay bẽkechure.
Sethay bash kore shing-tola
Joto buno chhag dari-jhola.
Sethay horin rãyay bhora
Tara kareo dey na dhora.
Sethay manush nutontor,
Tader shorir kothin boro.
Tader chokh duto noy soja,
Tader kotha nahi jay bojha.
Tara paharer chele-meye
Sodai kaj kore gan geye.
Tara sara dinman khete
Ane bojhabhora kath kete.
Tara choriya shikhor-‘pore
Boner horin shikar kore.
Nodi joto age age chole
Totoi sathi jote dole dole.
Tara tari moto, ghor hote
Sobai bahir hoyechhe pothe.
Paye thunu thunu baje nuri,
Jeno bajitechhe mol churi.
Gaye alo kore jhikijhik,
Jeno porechhe hirar chik.
Mukhe kolkol koto bhase
Eto kotha kotha hote ase.
Sheshe sakhite sakhite meli
Hese gaye gaye helahéli.
Sheshe kolakuli kolrobe
Tara ek hoye jay sobe.
Tokhon kolkol chhute jol–
Kãpe tolmol dhoratal,
Kothao niche pore jhorjhor–
Pathor kẽpe othe thorthor,
Shila khan khan jay tute–
Nodi chole poth kete kute.
Dhare gachhgulo boro boro
Tara hoye pore poro-poro.
Koto boro pathorer chap
Jole khose pore jhupjháp.
Tokhon mati-gola ghola jole
Phena bhese jay dole dole.
Jole pak ghure ghure othe,
Jeno pagoler moto chhote.
Sheshe pahar chhariye eshe
Nodi pore bairer deshe.
Hetha jekhane chahiya dekhe
Chokhe sokoli nuton theke.
Hetha chari dike khola math,
Hetha somotal pothghat.
Kothao chashira korichhe chash,
Kothao gorute khetchhe ghash.
Kothao brihot oshoth gachhe
Pakhi shish diye diye nache.
Kothao rakhal chheler dole
Khela korichhe gachher tole.
Kothao nikote gramer majhe
Loke phirichhe nanan kaje.
Kothao badha kichhu nahi pothe,
Nodi cholechhe apon mote.
Pothe boroshar joldhara
Ase chari dik hote tara,
Nodi dekhite dekhite bare,
Ekhon ke rakhe dhoriya tare.
Tahar dui kule othe ghash,
Sethay joto boker bash.
Setha mohisher dol thake,
Tara lutay nodir pãke.
Joto buno bora setha phere
Tara dãt diye mati chere.
Setha sheyal lukaye thake,
Rate huya huya kore dake.
Dekhe eimoto koto desh,
Ke ba goniya koribe shesh.
Kothao kebol balir dãga,
Kothao matigulo rãga rãga,
Kothao dhare dhare othe bet,
Kothao dudhare gomer khet.
Kothao chhotokhato gramkhani,
Kothao matha tole rajdhani–
Sethay nawaber boro kotha,
Tari pathorer tham mota.
Tari ghater sopan joto,
Jole namiyachhe shoto shoto.
Kothao sada pathorer pule
Nodi bãdhiyachhe dui kule.
Kothao lohar sãkoy gari
Chole dhako dhako dak chhari.
Nodi eimoto obosheshe
El norom matir deshe.
Hetha jethay moder bari
Nodi asil duare tari.
Hethay nodi nala bil khale
Desh ghirechhe joler jale.
Koto meyera nahichhe ghate,
Koto chhelera sãtar kate;
Koto jelera phelichhe jal,
Koto majhira dhorechhe hal,
Sukhe sarigan gay dãri,
Koto kheya-tori dey pari.
Kothao puraton shibaloy
Tire sari sari jege roy.
Sethay du-bela sokale sãjhe
Pujar kãsor-ghonta baje.
Koto jotadhari chhaimakha
Ghate bose achhe jeno ãka.
Tire kothao bosechhe hat,
Nouka bhoriya royechhe ghat.
Mathe kolai sorisha dhan,
Tahar ke koribe poriman.
Kothao nibir akher bone
Shalik chorichhe apon mone.
Kothao dhu dhu kore baluchar
Sethay gãgshaliker ghor.
Sethay kãchhim balir tole
Apon dim pere ase chole.
Sethay shitkale buno hãs
Koto jhãke jhãke kore bash.
Sethay dole dole chokhachokhi
Kore saradin bokaboki.
Sethay kãdakhocha tire tire
Kaday khocha diye diye phire.
Kothao dhan-er khete dhare
Ghon kolabon bãshjhãre
Ghon am-kãthaler bone
Gram dekha jay ek kone.
Setha achhe dhan golabhora,
Setha khorgula rash-kora.
Setha goyalete goru bãdha
Koto kalo patkile sada.
Kothao koluder kurekhani,
Sethay kyã kã kore ghore ghani.
Kothao kumarer ghore chak,
Dey saradin dhore pak.
Mudi dokanete sarakhon
Bose poritechhe Ramayan.
Kothao bosi pathshalaghore
Joto chhelera chẽchiye pore,
Boro bethkhani loye kole
Ghume gurumohashoy dhole.
Hethay eke bẽke bhẽge chure
Gramer poth gechhe bohu dure.
Sethay bojhai gorur gari
Dhire choliyachhe dak chhari.
Roga gramer kukurgulo
Khudhay shũkiya beray dhulo.
Jedin purnima rati ase
Chãd akash juriya hãse.
Bone o pare ãdhar kalo,
Jole jhikimiki kore alo.
Bali chikichiki kore chore,
Chhaya jhope bosi thake dore.
Sobai ghumay kutirtale,
Tori ektio nahi chole.
Gachhe patatio nahi nore,
Jole dheu nahi othe pore.
Kobhu ghum jodi jay chhute
Kokil kuhu kuhu geye othe,
Kobhu o pare chorer pakhi
Rate swopne uthichhe daki.
Nodi cholechhe dahin-e bãme,
Kobhu kothao se nahi thame.
Sethay gohon gobhir bon,
Tire nahi lok nahi jon.
Shudhu kumir nodir dhare
Sukhe rod pohaychhe pare.
Bagh phiritechhe jhope jhãpe,
Gharde pore asi ek laph-e.
Kothao dekha jay chitabag,
Tahar gaye chaka chaka dag.
Rate chupichupi ase ghate,
Jol choko choko kori chate.
Hethay jokhon jowar chhote,
Nodi phuliye ghuliye othe.
Tokhon kanay kanay jol,
Koto bhese ase phul phol.
Dheu hese othe kholkhôl,
Tori kori othe tolmol.
Nodi ojogorshom phule
Gile khete chay dui kule.
Abar krôme ase bhãta pore,
Tokhon jol jay sore sore.
Tokhon nodi roga hoye ase,
Kada dekha dey dui pashe.
Beroy ghater sopan joto
Jeno buker hãrer moto.
Nodi chole jay joto dure
Totoi jol othe pure pure.
Sheshe dekha nahi jay kul,
Chokhe dik hoye jay bhul.
Nil hoye ase joldhara,
Mukhe lage jeno nun-para.
Krome niche nahi pai tol,
Krome akashe mishay jol,
Dãga konkhane pore roy–
Shudhu jole jole jolmoy.
Ore eki shuni kolahal,
Heri eki ghon nil jol.
Oi bujhi re sagor hotha,
Uhar kinara ke jane kotha.
Oi lakho lakho dheu othe
Sodai moritechhe matha kute.
Othe sada sada phena joto
Jeno bishom rager moto.
Jol gorji gorji dhay,
Jeno akash kãrite chay.
Bayu kotha hote ase chhute,
Dheuye haha kore pore lute.
Jeno pathshala-chhara chhele
Chhute laphaye beray khele.
Hetha joto dur pane chai
Kothao kichhu nai, kichhu nai.
Shudhu akash batas jol,
Shudhui kolkol kolahal,
Shudhu phena ar shudhu dheu–
Ar nahi kichhu nahi keu.
Hethay phurail sob desh,
Nodir bhromon hoil shesh.
Hetha saradin sarabela
Tahar phurabe na ar khela.
Tahar saradin nach gan
Kobhu hobe nako oboshan.
Ekhon kothao hobe na jete,
Sagor nil tare buk pete.
Tare nil bichhanay thuye
Tahar kadamati dibe dhuye.
Tare phenar kapore dheke,
Tare dheuyer dolay rekhe,
Tar kane kane geye sur
Tar shrom kori dibe dur.
Nodi chirodin chirnishi
Robe atol adore mishi.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
১. নদীকে জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দেখা
কবিতার শুরুতেই নদীকে একটি প্রাণবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
“সদা হেসে করে লুটোপুটি,
চলে কোন্খানে ছুটোছুটি।”
নদী এখানে কেবল জলধারা নয়। তার আনন্দ আছে, কৌতূহল আছে, চলার আকাঙ্ক্ষা আছে। সে যেন একটি শিশুর মতো পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছে।
২. উৎসের রহস্য ও অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা
কবিতার শুরুতে প্রশ্ন ওঠে—নদী কোথা থেকে আসে?
“নদী কোথা হতে এল নাবি।”
এই প্রশ্ন নদীর উৎসের ভৌগোলিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি এক ধরনের অস্তিত্বগত কৌতূহলও তৈরি করে। নদী কোথা থেকে আসে, কোথায় যায় এবং কেন তার এই অবিরাম চলা—এই প্রশ্নগুলো কবিতার অন্তর্গত রহস্যকে এগিয়ে নেয়।
৩. পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা
নদীর জন্মস্থান হিসেবে কবি যে পাহাড়ের ছবি এঁকেছেন, সেটি প্রায় ধ্যানমগ্ন এক সত্তা।
“পাহাড়
বসে আছে মহামুনি।”
বরফে ঢাকা পাহাড়, নীল আকাশ, মেঘ, হিমেল বাতাস এবং রাতের তারা—সব মিলিয়ে উৎসস্থলটি মানুষের জগতের বাইরে এক নিস্তব্ধ, রহস্যময় অঞ্চল।
সেই নিস্তব্ধতার মধ্য থেকেই নদীর যাত্রা শুরু।
৪. নদীর শৈশব
নদী যখন প্রথম বেরিয়ে আসে, তার চলন অত্যন্ত কোমল—
“তাই ঝুরু ঝুরু ঝিরি ঝিরি।
নদী বাহিরিল ধীরি ধীরি।”
এখানে নদীর জন্মকে শিশুর পৃথিবী আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সে ভাবে—
“যা আছে ভবে
সবই দেখিয়া লইতে হবে।”
এই কৌতূহলই নদীর দীর্ঘ যাত্রার চালিকাশক্তি।
৫. অরণ্য ও পাহাড়ি জীবনের সঙ্গে পরিচয়
নদী পাহাড়ি অরণ্যের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে গাছ, শেওলা, পাখি, বুনো ছাগ, হরিণ এবং পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়।
এখানে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন আলাদা নয়। পাহাড়ের মানুষ কাজ করে, কাঠ কাটে, গান গায়, শিকার করে; নদী তাদের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে।
৬. বাধা অতিক্রম করার শক্তি
নদীর সামনে আসে পাথর, শিলা, পাহাড়। কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারে না।
“পাহাড় যদি থাকে পথ জুড়ে
নদী হেসে যায় বেঁকেচুরে।”
এই পঙ্ক্তি কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন বহন করে। পথ বন্ধ হলে নদী পথ বদলায়; কিন্তু যাত্রা বন্ধ করে না।
৭. সঙ্গী সংগ্রহ
নদী যত এগোয়, তত তার সঙ্গে নতুন নতুন স্রোত ও জলধারা যুক্ত হয়।
“নদী যত আগে আগে চলে
ততই সাথি জোটে দলে দলে।”
এটি নদীর স্বাভাবিক ভৌগোলিক বিস্তারের বর্ণনা হলেও কবিতায় এর একটি মানবিক তাৎপর্যও তৈরি হয়েছে। একা শুরু করা যাত্রা ক্রমে বহু সঙ্গীকে সঙ্গে নেয়।
৮. পাহাড় থেকে সমতলে
পাহাড় অতিক্রম করে নদী যখন সমতলে আসে, তখন তার সামনে সম্পূর্ণ নতুন পৃথিবী।
খোলা মাঠ, চাষি, গোরু, রাখাল, গ্রাম, পাখি, মানুষ—সবকিছু নদীর দৃষ্টিতে নতুন।
এই অংশে রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ বাংলার একটি বিস্তৃত জীবন্ত দৃশ্যপট নির্মাণ করেছেন।
৯. নদী ও বাংলার গ্রামীণ জীবন
কবিতার সবচেয়ে দীর্ঘ অংশগুলোর একটি জুড়ে রয়েছে নদীকে ঘিরে বাংলার জীবন।
ঘাটে স্নানরত নারী, সাঁতার কাটা শিশু, জেলে, মাঝি, সারিগান, খেয়াতরী, শিবালয়, হাট, ধান, সরিষা, কলাই, আখ, কলাবন, বাঁশঝাড়, আম-কাঁঠালের বাগান, গোয়ালঘর, কুমারের চাক, মুদি দোকান ও পাঠশালা—সবকিছু নদীর যাত্রাপথে এসে পড়ে।
ফলে নদী এখানে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়; মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, শ্রম, বিনোদন ও দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্র।
১০. রাতের নদী
দিনের কোলাহলের বিপরীতে পূর্ণিমার রাতে নদীর পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়।
“সবাই ঘুমায় কুটিরতলে,
তরী একটিও নাহি চলে।”
গাছের পাতা নড়ে না, জলে ঢেউ নেই; কিন্তু নদী তখনও চলছে।
এই বৈপরীত্যটি গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের জীবন থেমে গেলেও নদীর যাত্রা থামে না।
১১. অরণ্যের বন্যতা
পরবর্তী পর্যায়ে নদী আবার প্রবেশ করে গভীর অরণ্যে। এখানে মানুষের উপস্থিতি কমে যায়। কুমির, বাঘ ও চিতাবাঘের উপস্থিতি প্রকৃতির অন্য এক রূপকে সামনে আনে।
নদী একই সঙ্গে সভ্যতা ও বন্য প্রকৃতির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
১২. জোয়ার-ভাটা ও পরিবর্তন
নদীর চরিত্রও পরিবর্তনশীল।
জোয়ারে নদী ফুলে ওঠে—
“নদী ফুলিয়ে ঘুলিয়ে ওঠে।”
আবার ভাটায়—
“তখন নদী রোগা হয়ে আসে।”
এখানে নদী স্থির কোনো সত্তা নয়। তার শরীর, শক্তি ও চেহারা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়।
১৩. নদীর সাগরযাত্রা
শেষদিকে নদীর দুই কূল হারিয়ে যায়।
“শেষে দেখা নাহি যায় কূল,
চোখে দিক হয়ে যায় ভুল।”
নদী যত এগোয়, ততই তার ব্যক্তিগত পরিচয় যেন ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় শুধু জল, আকাশ, বাতাস ও ঢেউ।
তারপর আসে সাগর—
“ওই বুঝি রে সাগর হোথা,
উহার কিনারা কে জানে কোথা।”
নদীর ব্যক্তিগত যাত্রা এখানে অসীমতার দিকে পৌঁছে যায়।
১৪. নদী ও সাগরের মিলন
কবিতার সমাপ্তি অত্যন্ত কোমল।
সাগর নদীকে নিজের বুকে গ্রহণ করে—
“সাগর নিল তারে বুক পেতে।”
নদীর কাদামাটি ধুয়ে যায়, তাকে ফেনার কাপড়ে ঢেকে দেয়, ঢেউয়ের দোলায় রাখে এবং তার শ্রম দূর করে।
এখানে নদীর সাগরে মিলনকে ধ্বংস হিসেবে নয়, বিশ্রাম ও বৃহত্তর সত্তার সঙ্গে মিলন হিসেবে দেখা হয়েছে।
নদী: একটি জীবনরূপক
‘নদী’ কবিতাকে শুধু নদীর ভৌগোলিক ভ্রমণ হিসেবে পড়লে এর একটি মাত্র স্তর ধরা পড়ে। এর আরও একটি স্তরে নদীর যাত্রা মানুষের জীবনের রূপক।
নদীর জন্ম—মানুষের জন্ম।
পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা—অজানার দিকে প্রথম যাত্রা।
অরণ্য ও পাহাড় অতিক্রম—শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতা।
নতুন নতুন স্রোতের সঙ্গে মিলন—মানুষের সম্পর্ক ও সমাজে প্রবেশ।
সমতলে পৌঁছানো—পরিণত জীবন।
জোয়ার-ভাটা—সাফল্য, পরিবর্তন ও সংকট।
সাগরে মিলন—নিজের সীমিত পরিচয় অতিক্রম করে বৃহত্তর অস্তিত্বে প্রবেশ।
এই পাঠটি কবিতার একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা; কবিতাটি সরাসরি কোনো একক নীতিবাক্য ঘোষণা করে না।
নদী ও বাংলার সভ্যতা
কবিতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বাংলার ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের চিত্রায়ণে। নদীর পথ ধরে কবি দেখিয়েছেন—
- পাহাড়ি প্রকৃতি,
- অরণ্য,
- বন্যপ্রাণী,
- পাহাড়ি মানুষের জীবন,
- কৃষিজীবন,
- গ্রাম,
- হাট,
- নদীর ঘাট,
- নৌকা ও মাঝি,
- জেলে,
- সারিগান,
- শিবালয়,
- পাঠশালা,
- কুমারের চাক,
- কলুর ঘানি,
- ধান ও অন্যান্য ফসল,
- গ্রামীণ পশুপাখি,
- জোয়ার-ভাটা,
- এবং শেষ পর্যন্ত সাগর।
অর্থাৎ নদী যেন একটি চলমান আয়না—যার জলে একটি ভূখণ্ডের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন প্রতিফলিত হয়।
ভাষা ও চিত্রকল্প
এই কবিতার ভাষার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর শ্রুতিময়তা। “চলচল্”, “ছলছল্”, “ঝুরু ঝুরু”, “ঝিরি ঝিরি”, “কলকল”, “ঝরঝর”, “থরথর”, “ঝুপঝাপ”, “খলখল”, “টলমল”—এই শব্দগুলো শুধু অর্থ বহন করে না; নদীর গতিও শ্রুতির মাধ্যমে অনুভব করায়।
ফলে কবিতাটি পড়ার পাশাপাশি আবৃত্তি করলে এর জলধারার ছন্দ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কবিতার শেষের দর্শন
কবিতার শেষ চারটি স্তবক পুরো যাত্রাটিকে একটি বৃহত্তর অর্থ দেয়।
নদী তার সমস্ত ভ্রমণ শেষে সাগরে পৌঁছায়। সেখানে তার আর কোথাও যাওয়ার নেই। সাগর তাকে বুকে গ্রহণ করে, তার কাদামাটি ধুয়ে দেয়, ফেনা ও ঢেউয়ের মধ্যে তাকে বিশ্রাম দেয়।
শেষ পঙ্ক্তি—
“নদী চিরদিন চিরনিশি
রবে অতল আদরে মিশি।”
এই সমাপ্তিতে নদীর স্বতন্ত্রতা বিলীন হলেও তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং বৃহত্তর জলরাশির মধ্যে নতুনভাবে মিশে যায়।
সংক্ষিপ্ত সারাংশ
‘নদী’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ একটি নদীর জন্ম থেকে সাগরে মিলন পর্যন্ত সম্পূর্ণ যাত্রাকে কাব্যিক কাহিনিতে রূপ দিয়েছেন। বরফঢাকা পাহাড়ের নিঃসঙ্গ উৎস থেকে নদী অরণ্য, পাহাড়ি জনপদ, সমতল, কৃষিজীবন, গ্রাম, নগর, বন্য প্রকৃতি এবং জোয়ার-ভাটার মধ্য দিয়ে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত সাগরে পৌঁছায়।
এই যাত্রার মধ্য দিয়ে কবি প্রকৃতির বিপুল বৈচিত্র্যের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও বাংলার গ্রামীণ সভ্যতার একটি বিস্তৃত চিত্র এঁকেছেন। একই সঙ্গে নদীর অবিরাম প্রবাহকে পরিবর্তন, অনুসন্ধান, জীবনযাত্রা এবং বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে মিলনের প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়।
মূল ভাবনা এক নজরে
- নদী কবিতার প্রধান চরিত্র এবং জীবন্ত সত্তা।
- নদীর জন্ম রহস্য থেকে তার পৃথিবী-পরিচয়ের যাত্রা শুরু।
- নদী বাধাকে অতিক্রম করে নিজের পথ তৈরি করে।
- নদীর সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের নতুন নতুন জগতের পরিচয় ঘটে।
- নদী বাংলার গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির একটি চলমান প্রতিচ্ছবি।
- জোয়ার-ভাটা নদীর পরিবর্তনশীল চরিত্রের প্রতীক।
- নদীর যাত্রা কখনো থামে না।
- সাগরে নদীর মিলন তার যাত্রার সমাপ্তি হলেও অস্তিত্বের বিলয় নয়।
- নদী ও সাগরের সম্পর্ককে বৃহত্তর সত্তার সঙ্গে মিলনের রূপক হিসেবেও পাঠ করা যায়।
- কবিতার ধ্বনিময় শব্দচয়ন নদীর প্রবাহকে পাঠের মধ্যেই শ্রুতিগ্রাহ্য করে তোলে।
উৎস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নদী, ১৮৯৬; গ্রন্থের উৎসর্গে বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভপরিণয় উপলক্ষে উপহারের উল্লেখ রয়েছে।
- রবীন্দ্র-রচনাবলী, SNLTR — ‘নদী’ কবিতার পাঠ।
- নদী কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল ১৮৯৬ হিসেবে বিভিন্ন গ্রন্থতালিকাতেও উল্লেখ রয়েছে।
- কবিতাটির পূর্ণ পাঠের সহায়ক পাঠসূত্র: এবাংলা লাইব্রেরি।
