বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর রোমান্টিক, রূপকধর্মী এবং অজানার উদ্দেশ্যে দুঃসাহসিক যাত্রার কবিতা হলো ‘সমুদ্রে’। এই কবিতায় জীবন-নদী পার হয়ে অসীম মহাসাগরের দিকে বা অনন্তের দিকে মানুষের যে অপরিহার্য যাত্রা, তার এক অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | সমুদ্রে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী, দুঃসাহসিক যাত্রা ও জীবন-দর্শনমূলক গীতি-কবিতা (Allegorical, Adventurous and Philosophical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
সমুদ্রে – সম্পূর্ণ কবিতা
সকালবেলায় ঘাটে যেদিন
ভাসিয়ে দিলেম নৌকাখানি
কোথায় আমার যেতে হবে
সে কথা কি কিছুই জানি।
শুধু শিকল দিলেম খুলে,
শুধু নিশান দিলেম তুলে–
টানি নি দাঁড়, ধরি নি হাল–
ভেসে গেলেম স্রোতের মুখে।
তীরে তরুর ডালে ডালে
ডাকল পাখি প্রভাত-কালে,
তীরে তরুর ছায়ায় রাখাল
বাজায় বাঁশি মনের সুখে।
তখন আমি ভাবি নাইকো
সূর্য যাবে অস্তাচলে,
নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
পড়ব এসে সাগর-জলে–
ঘাটে ঘাটে তীরে তীরে
যে তরী ধায় ধীরে ধীরে
বাইতে হবে নিয়ে তারে
নীল পাথারে একলা-প্রাণে।
তারাগুলি আকাশ ছেয়ে
মুখে আমার রইল চেয়ে,
সিন্ধু-শকুন উড়ে গেল
কূলে আপন কুলায়-পানে।
দুলুক তরী ঢেউয়ের ‘পরে
ওরে আমার জাগ্রত প্রাণ।
গাও রে আজি নিশীথ-রাতে
অকূল-পাড়ির আনন্দগান।
যাক-না মুছে তটের রেখা,
নাই-বা কিছু গেল দেখা,
অতল বারি দিক-না সাড়া
বাঁধন-হারা হাওয়ার ডাকে।
দোসর-ছাড়া একার দেশে
একেবারে এক নিমেষে
লও রে বুকে দু হাত মেলি
অন্তবিহীন অজানাকে।
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- অজান্তেই জীবনের যাত্রা শুরু:
“সকালবেলায় ঘাটে যেদিন / ভাসিয়ে দিলেম নৌকাখানি / কোথায় আমার যেতে হবে / সে কথা কি কিছুই জানি… ভেসে গেলেম স্রোতের মুখে।”— এটি মূলত মানুষের জন্ম ও যৌবনের প্রতীক। জীবনের শুরুতে কেউ তার শেষ গন্তব্য জানে না। যৌবনের স্রোতে গা ভাসিয়ে মানুষ কেবল আনন্দ, গান ও প্রকৃতির মোহে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
- সমুদ্রের বিশালতা ও একাকিত্ব:
“তখন আমি ভাবি নাইকো / সূর্য যাবে অস্তাচলে, / নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে / পড়ব এসে সাগর-জলে– … বাইতে হবে নিয়ে তারে / নীল পাথারে একলা-প্রাণে।”— জীবনের সায়াহ্নে (সূর্য যখন অস্তাচলে যায়) এসে মানুষ হঠাৎ খেয়াল করে সে তার চেনা নদীর তীর ছাড়িয়ে এক সীমাহীন সমুদ্রে এসে পড়েছে। তখন আর চেনা কোনো ঘাট নেই, নদীর তীরের সেই পরিচিত কোলাহল বা আশ্রয় নেই। এই অসীম পাথারে তাকে এখন সম্পূর্ণ একাকী নিজের তরী বাইতে হবে।
- ভয়হীনভাবে অজানাকে আলিঙ্গন:
“যাক-না মুছে তটের রেখা, / নাই-বা কিছু গেল দেখা… দোসর-ছাড়া একার দেশে / একেবারে এক নিমেষে / লও রে বুকে দু হাত মেলি / অন্তবিহীন অজানাকে।”— চেনা পৃথিবীর তটরেখা মুছে যাক, চারপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলো হারিয়ে যাক—তাতে কবির কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি তাঁর জাগ্রত প্রাণকে এই অকূল পাথারে আনন্দগান গাইতে বলেছেন। এই দোসর-ছাড়া নিঃসঙ্গ জায়গায় কোনো ভয় না পেয়ে, দুই হাত বাড়িয়ে সেই অন্তবিহীন অজানাকে (মৃত্যু বা অনন্তকাল) সাহসের সাথে আলিঙ্গন করার উদাত্ত আহ্বানই এই কবিতার শ্রেষ্ঠ দর্শন।
