মহুয়া কাব্যগ্রন্থের সৃষ্টি-রহস্য কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর, দার্শনিক ও মহাজাগতিক প্রণয়-ভাবনার লিরিক কবিতা হলো ‘সৃষ্টি-রহস্য’। অসীম কাল, মহাশূন্যের নিদ্রাহীন আলো এবং সৃষ্টির কোটি বছরের অগ্নিময় তপস্যা কীভাবে একটিমাত্র মানবী-মূর্তিতে রূপ পরিগ্রহ করে ধন্য হয়েছে—প্রেমাস্পদের চোখে চোখ রেখে মহাবিশ্বের সেই পরম অস্তিত্বগৌরব ও রহস্যকে প্রত্যক্ষ করার অপরিসীম বিস্ময় এ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামসৃষ্টি-রহস্য
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনমহাজাগতিক ও দার্শনিক রোমান্টিক লিরিক (Cosmic Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ পার্থিব প্রেম ও সৌন্দর্যকে কেবল ক্ষণভঙ্গুর জৈবিক আকর্ষণে আবদ্ধ রাখেননি; বরং তাকে সমগ্র মহাবিশ্বের বিবর্তন ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য হিসেবে দেখেছেন। বিশ্বসৃষ্টির আদি থেকে কোটি কোটি বছর ধরে চলা গ্রহ-নক্ষত্রের আলোড়ন, যুগ-যুগান্তরের অগ্নিময় বেদনা ও মহাশূন্যের অফুরান আলো কোন পরম উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হচ্ছিল? কবির উপলব্ধি—সেই বিপুল শক্তির মহিমা পরম সার্থকতা লাভ করেছে প্রিয়তমার একটি সীমিত ও সুন্দর রূপের ভেতর এসে। অসীম যখন মানবী-রূপের সুন্দর মুখ, চোখ আর এক চিলতে হাসির সীমায় ধরা দেয়, তখনই নিখিলের অস্তিত্বগৌরব পূর্ণতা পায়। প্রেমিকার সম্মুখে বসে সেই রূপ প্রত্যক্ষ করাই কবির কাছে সমগ্র সৃষ্টিতপস্যার পরম আনন্দকে স্পর্শ করার সমান।

সম্পূর্ণ কবিতা:

সৃষ্টির রহস্য  আমি তোমাতে করেছি অনুভব,

          নিখিলের অস্তিত্বগৌরব।

                 তুমি আছ, তুমি এলে,

এ বিস্ময় মোর পানে আপনারে নিত্য আছে মেলে

          অলৌকিক পদ্মের মতন।

                 অন্তহীন কাল আর অসীম গগন

                        নিদ্রাহীন আলো

কী অনাদি মন্ত্রে তারা অঙ্গ ধরি তোমাতে মিলালো।

          যুগে যুগে কী অক্লান্ত সাধনায়,

                 অগ্নিময়ী বেদনায়,

          নিমেষে হয়েছে ধন্য শক্তির মহিমা

                        পেয়ে আপনার সীমা

ওই মুখে, ওই চক্ষে, ওই হাসিটিতে।

সেই সৃষ্টিতপস্যার সার্থক আনন্দ মোর চিতে

          স্পর্শ করে, যবে তব মুখে মেলি আঁখি

                 সম্মুখে তোমার বসে থাকি।

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Srishtir rohosyo ami tomate korechhi onubhob,
Nikhiler ostitwogowrob.
Tumi achho, tumi ele,
E bissmoy mor pane aponare nitto achhe mele
Oloukik podmer moton.
Ontohin kal ar oshim gogon
Nidrahin alo
Ki onadi montre tara onggo dhori tomate milalo.
Juge juge ki oklanto sadhonay,
Ognimoyi bedonay,
Nimeshe hoyechhe dhonno shoktir mohima
Peye aponar shima
Oi mukhe, oi chokkhe, oi hashitite.
Shei srishtitopossyar shartthok anondo mor chite
Sporsho kore, jobe tobo mukhe meli ankhi
Shommukhe tomar boshe thaki.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • মানবরূপে নিখিলের অস্তিত্বগৌরব:
    “সৃষ্টির রহস্য আমি তোমাতে করেছি অনুভব, / নিখিলের অস্তিত্বগৌরব। / তুমি আছ, তুমি এলে, / এ বিস্ময় মোর পানে আপনারে নিত্য আছে মেলে / অলৌকিক পদ্মের মতন।”
    — মহাবিশ্বের অস্তিত্ব যে নিছক শূন্যতা নয়, তা অর্থপূর্ণ ও গৌরবময়—এই বোধ কবি প্রিয়তমার উপস্থিতিতেই প্রথম প্রত্যক্ষ করেন। প্রিয়ের থাকা এবং আগমন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, তা চিরন্তন বিস্ময়ের শতদল মেলে ধরার মতো এক অলৌকিক অনুভূতি।
  • অসীমের সসীম রূপ পরিগ্রহ:
    “অন্তহীন কাল আর অসীম গগন / নিদ্রাহীন আলো / কী অনাদি মন্ত্রে তারা অঙ্গ ধরি তোমাতে মিলালো।”
    — সময় যার শেষ নেই, আকাশ যার সীমা নেই, এবং আলো যা অবিরত বয়ে চলেছে—তারা যেন সৃষ্টির কোনো গোপন মন্ত্রবলে মূর্ত শরীর ধারণ করে এই একটিমাত্র মানুষের অস্তিত্বে এসে মিশেছে। অমূর্ত মহাবিশ্ব প্রেমিকার অবয়বে এসে সাকার রূপ লাভ করেছে।
  • অগ্নিময় তপস্যার সার্থকতা:
    “যুগে যুগে কী অক্লান্ত সাধনায়, / অগ্নিময়ী বেদনায়, / নিমেষে হয়েছে ধন্য শক্তির মহিমা / পেয়ে আপনার সীমা / ওই মুখে, ওই চক্ষে, ওই হাসিটিতে।”
    — সৃষ্টির ইতিহাস ভয়াল তাপ, আলোড়ন ও তীব্র বেদনার ইতিহাস। এই মহাজাগতিক শক্তির অন্ধ প্রবাহ কেবল তখনই ধন্য হয়, যখন সে প্রেমাস্পদের মুখশ্রী, চোখ এবং একটি স্নিগ্ধ হাসির মধুর সীমায় নিজেকে আবিষ্কার করে। এই সীমাবদ্ধতার স্পর্শেই অসীমের অনন্ত ব্যাকুলতা শান্ত হয়। প্রিয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা তাই কেবল রোমান্টিক প্রণয় নয়, সমগ্র সৃষ্টিতপস্যার অন্তিম আনন্দকে অন্তরে আস্বাদন করার এক অপার্থিব ধ্যান।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন