বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের অন্তিম পর্যায়ের একটি পরম স্নিগ্ধ, প্রাণোদ্দীপক ও ভোরের জাগরণ-চেতনার লিরিক কবিতা হলো ‘ওরে পাখি’। রোগশয্যায় শায়িত কবির ক্লান্ত রজনী অবসানে ভোরের পাখির কাছে সুরের আবাহন এবং নতুন প্রাণের গীতা দিয়ে প্রভাতের আলোকে সার্থক করে তোলার আকুল অনুরোধ এ কবিতায় ঝংকৃত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ওরে পাখি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ লেখা (অনলাইন অনুলিপিতে ‘শেষ লেখা’ নির্দেশিত হলেও কবিতাটি মূলত অন্ত্যমিলযুক্ত লিরিক গান হিসেবেও রবীন্দ্র-গীতিসংকলনে অত্যন্ত পরিচিত) |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪১ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | ভোরের গান ও নবপ্রাণের জাগরণ-লিরিক (Matins / Song of Dawn) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
জীবনের শেষভাগে শারীরিক অসুস্থতা ও যন্ত্রণার দীর্ঘ রাত্রির পর প্রভাতের উন্মেষ কবির কাছে এক পরম আশ্বাসের রূপ নিয়ে আসত। এই কবিতায় ভোরের বিহঙ্গ কেবল একটি প্রাকৃতিক সত্তা নয়; সে অন্ধকারের ওপারে আলো ও প্রাণের প্রথম অগ্রদূত। পাখি যদি তার সুর ভুলে গিয়ে ডাকতে ইতস্তত করে, তবে সমগ্র প্রভাতের আগমনই যেন অর্থহীন ও বাণীহারা হয়ে যায়। কবি তাকে মনে করিয়ে দেন যে সে ভোরের অরুণালোকের পরম সখা। দীর্ঘ দুঃখের রজনী শেষে কবির শিয়রে যে জাগরণের লক্ষ্মী নতুন আশার অঞ্জলি পেতে দাঁড়িয়ে আছেন, পাখি যেন তার অমিয় গানের দান থেকে তাঁকে বঞ্চিত না করে। পাখীর সুরের মধ্য দিয়েই ঘোষিত হয় নবীন প্রাণের অপরাজিত আশাবাদ।
সম্পূর্ণ কবিতা:
ওরে পাখি,
থেকে থেকে ভুলিস কেন সুর,
যাস নে কেন ডাকি–
বাণীহারা প্রভাত হয় যে বৃথা
জানিস নে তুই কি তা।
অরুণ-আলোর প্রথম পরশ
গাছে গাছে লাগে,
কাঁপনে তার তোরই যে সুর
পাতায় পাতায় জাগে–
তুই যে ভোরের আলোর মিতা
জানিস নে তুই কি তা।
জাগরণের লক্ষ্মী যে ওই
আমার শিয়রেতে
আছে আঁচল পেতে,
জানিস নে তুই কি তা।
গানের দানে উহারে তুই
করিস নে বঞ্চিতা।
দুঃখরাতের স্বপনতলে
প্রভাতী তোর কী যে বলে
নবীন প্রাণের গীতা,
জানিস নে তুই কি তা।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ore pakhi,
Theke theke bhulish keno shur,
Jash ne keno daki–
Banihara probhat hoy je britha
Janish ne tui ki ta.
Orun-alor prothom porosh
Gachhe gachhe lage,
Kanyone tar tori je shur
Patay patay jage–
Tui je bhorer alor mita
Janish ne tui ki ta.
Jagoroner lokkhi je oi
Amar shiyorete
Achhe anchol pete,
Janish ne tui ki ta.
Ganer dane uhare tui
Korish ne bonchita.
Dukkhorater swoponotole
Probhati tor ki je bole
Nobin praner gita,
Janish ne tui ki ta.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বাণীহারা ভোরের শূন্যতা:“ওরে পাখি, / থেকে থেকে ভুলিস কেন সুর, / যাস নে কেন ডাকি– / বাণীহারা প্রভাত হয় যে বৃথা / জানিস নে তুই কি তা।”— ভোরের প্রথম আলো পাখীর কূজন ছাড়া অসম্পূর্ণ। আলো যদি চোখকে জাগায়, তবে পাখীর সুর জাগায় আত্মাকে। পাখী স্তব্ধ হয়ে গেলে সেই প্রভাত তার প্রাণময় বাণী হারিয়ে রিক্ত হয়ে পড়ে।
- আলো ও গানের মৈত্রী:“অরুণ-আলোর প্রথম পরশ / গাছে গাছে লাগে, / কাঁপনে তার তোরই যে সুর / পাতায় পাতায় জাগে– / তুই যে ভোরের আলোর মিতা / জানিস নে তুই কি তা।”— সূর্যের অরুণ আভা এবং বিহঙ্গের কাকলি পরস্পরের পরিপূরক। সূর্যের স্পর্শে গাছের পাতায় পাতায় যে শিহরণ জাগে, তা পাখির সুরেরই প্রতিধ্বনি। আলো ও গানের এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বই সৃষ্টির আনন্দকে জীবন্ত রাখে।
- জাগরণের লক্ষ্মী ও নবীন প্রাণের গীতা:“জাগরণের লক্ষ্মী যে ওই / আমার শিয়রেতে / আছে আঁচল পেতে, / … দুঃখরাতের স্বপনতলে / প্রভাতী তোর কী যে বলে / নবীন প্রাণের গীতা,”— ব্যথাতুর দীর্ঘ রাত্রির দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে কবির শিয়রে উপস্থিত হয়েছেন নবজাগরণের শুভদেবী। তিনি অপেক্ষা করছেন ভোরের অমৃত বাণীর জন্য। পাখির কণ্ঠে গীত প্রভাতী সুর আসলে কোনো সাধারণ গান নয়, তা দুঃখের কালো মেঘ কাটিয়ে নতুন করে বেঁচে ওঠার এক শাশ্বত জীবনগীতা।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির মুদ্রণপ্রমাদ শোধনপূর্বক প্রমিত ‘বাণীহারা’ ও ‘দুঃখরাতের’ রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।