শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থের রৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের অন্তিম পর্বের এক অতলস্পর্শী শূন্যতাবোধ, নিঃসঙ্গতা ও শোকস্তব্ধ অনুভূতির অনন্য লিরিক কবিতা হলো ‘রৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে’। প্রিয়জনহারা শূন্য ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা একটি জড় কাষ্ঠাসনের (চৌকি) নিঃশব্দ হাহাকার এবং মনিবহারা অবোধ্য অবলা কুকুরের ব্যথাতুর দৃষ্টির সমান্তরালে অনুপস্থিতির যে মূক আর্তি এ কবিতায় রূপ পেয়েছে, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামরৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে (শেষ লেখা কাব্যের ৮ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ লেখা
রচনাকাল১৯৪০-৪১ (শান্তিনিকেতন)
প্রকাশের বছর১৯৪১ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রয়াণচেতনার শোক-লিরিক ও নিঃসঙ্গতার কবিতা (Elegy / Lyric of Bereavement)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

কবির জীবনের সায়াহ্নে শান্তিনিকেতনের উদয়ন বা শ্যামলীর নির্জন প্রকোষ্ঠে রচিত এই কবিতাটি প্রিয় মানুষের চিরবিদায়ের শূন্যতাকে রূপায়িত করেছে। কবির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সেবিকা ও স্নেহধন্যা পুত্রবধূ বা কোনো নিকটজনের প্রয়াণ/অনুপস্থিতি শান্তিনিকেতনের দুপুরের খাঁ-খাঁ নির্জনতায় এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করেছিল। দ্বিপ্রহরের প্রখর রৌদ্রতাপে যখন চরাচর স্তব্ধ, তখন ঘরের সেই শূন্য চৌকিটি যেন এক জীবন্ত ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে। মনিবকে হারিয়ে একটি অবুঝ কুকুর যেমন কিছু না বুঝে কেবল ব্যর্থ ও করুণ চোখে শূন্য ভিটেয় ঘুরে মরে, কবির দৃষ্টিতে সেই কাঠের চৌকিটির বোবা হাহাকার যেন তার চেয়েও বেশি কাতর। একটি জড় বস্তুর মধ্য দিয়ে বিচ্ছেদের এই সর্বগ্রাসী বেদনাকে রবীন্দ্রনাথ এক চিরন্তন সংবেদনশীলতায় পৌঁছে দিয়েছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

রৌদ্র-তাপ ঝাঁঝাঁ করে

জনহীন বেলা দুপহরে।

শূন্য চৌকির পানে চাহি,

সেথায় সান্ত্বনালেশ নাহি।

বুক ভরা তার

হতাশের ভাষা যেন করে হাহাকার।

শূন্যতার বাণী ওঠে করুণায় ভরা,

মর্ম তার নাহি যায় ধরা।

কুকুর মনিবহারা যেমন করুণ চোখে চায়

অবুঝ মনের ব্যথা করে হায় হায়;

কী হল যে, কেন হল, কিছু নাহি বোঝে–

দিনরাত ব্যর্থ চোখে চারি দিকে খোঁজে।

চৌকির ভাষা যেন আরো বেশি করুণ কাতর,

শূন্যতার মূক ব্যথা ব্যাপ্ত করে প্রিয়হীন ঘর।

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Roudrotap jhanjhan kore
Jonohin bela dupohore.
Shunno choukir pane chahi,
Sethay shantwonalesh nahi.
Buk bhora tar
Hotasher bhasha jeno kore hahakar.
Shunnotar bani othe korunay bhora,
Mormo tar nahi jay dhora.
Kukur monibhara jemon koruno chokhe chay
Obujh moner byatha kore hay hay;
Ki holo je, keno holo, kichhu nahi bojhe–
Dinrat byarttho chokhe chari dike khoje.
Choukir bhasha jeno aro beshi koruno kator,
Shunnotar muk byatha byapto kore priyohin ghor.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • জনহীন মধ্যাহ্ন ও শূন্যতার হাহাকার:
    “রৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে / জনহীন বেলা দুপহরে। / শূন্য চৌকির পানে চাহি, / সেথায় সান্ত্বনালেশ নাহি। / বুক ভরা তার / হতাশের ভাষা যেন করে হাহাকার।”
    — ঝিমঝিম করা গ্রীষ্মের দুপুরের নীরবতা মানুষের একাকীত্ব ও শোককে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। শূন্য চৌকিটিতে একদা যিনি বসতেন, তাঁর চিরঅনুপস্থিতি কাঠের আসবাবটিকেও যেন হতাশায় কাতর করে তুলেছে। সেখানে সান্ত্বনার কোনো অবকাশ নেই।
  • মনিবহারা পশুর নির্বাক প্রতীক্ষা:
    “কুকুর মনিবহারা যেমন করুণ চোখে চায় / অবুঝ মনের ব্যথা করে হায় হায়; / কী হল যে, কেন হল, কিছু নাহি বোঝে– / দিনরাত ব্যর্থ চোখে চারি দিকে খোঁজে।”
    — মৃত্যু বা চিরবিচ্ছেদের দার্শনিক তত্ত্ব অবলা প্রাণীর বোধগম্য নয়। সে কেবল বোঝে তার আশ্রয়ের মানুষটি নেই। তার সেই নিষ্ফল অনুসন্ধান ও ব্যথাতুর চাহনি বিচ্ছেদের এক পরম করুণ চিত্রপট তুলে ধরে।
  • জড় বস্তুর মূক সংবেদনশীলতা:
    “চৌকির ভাষা যেন আরো বেশি করুণ কাতর, / শূন্যতার মূক ব্যথা ব্যাপ্ত করে প্রিয়হীন ঘর।”
    — কুকুরের প্রকাশের তবু একটি ভঙ্গি আছে, কিন্তু শূন্য চৌকিটির কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষমতা নেই। তার এই বাক্‌হীন, পাথুরে নীরবতাই ঘরের শূন্যতাকে আরও গাঢ় ও ভারী করে তোলে। প্রিয়হীন ঘরের সমগ্র বায়ুমণ্ডল সেই মূক বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির অতিরিক্ত হাইফেন বর্জনপূর্বক প্রমিত ‘রৌদ্রতাপ’ রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন