বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রভাত সংগীত’ (১৮৮৩) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী কবিতা হলো ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। এই কবিতায় একটি অবরুদ্ধ ঝরনার অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তি পেয়ে মহাসাগরের দিকে ছুটে চলার রূপকের আড়ালে, কবির নিজের অন্তরের আধ্যাত্মিক জাগরণ ও বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা অসাধারণ ছন্দে ও আবেগে ফুটে উঠেছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | প্রভাত সংগীত |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৩ (১২৯০ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী, আধ্যাত্মিক ও আত্মজাগরণের কবিতা (Allegorical, Spiritual and Awakening Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের ভাষ্যমতে, তাঁর জীবনে এক গভীর আধ্যাত্মিক জাগরণের মুহূর্ত এসেছিল কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার সময় হঠাৎ করেই তাঁর মনে হলো যেন বিশ্বপ্রকৃতির ওপর থেকে এক পর্দা সরে গেছে এবং তিনি বিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুর সাথে এক গভীর আনন্দময় আত্মীয়তা অনুভব করছেন। এই মহাজাগতিক উপলব্ধি ও আনন্দ থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি। এই কবিতায় একটি গুহায় বন্দী ঝরনা (নির্ঝর) যেমন সূর্যের আলো ও পাখির গানে হঠাৎ জেগে উঠে সমস্ত বাধা ভেঙে মহাসাগরের দিকে ছুটে যেতে চায়, ঠিক তেমনি কবির অন্তরাত্মাও নিজের অহং ও অন্ধকারের গণ্ডি ভেঙে সমগ্র বিশ্বমানবের সাথে মহামিলনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ – সম্পূর্ণ কবিতা
আজি এ প্রভাতে প্রভাতবিহগ
কী গান গাইল রে!
অতি দূর দূর আকাশ হইতে
ভাসিয়া আইল রে!
না জানি কেমনে পশিল হেথায়
পথহারা তার একটি তান,
আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া
গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া
আকুল হইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া
ছুঁয়েছে আমার প্রাণ।
আজি এ প্রভাতে সহসা কেন রে
পথহারা রবিকর
আলয় না পেয়ে পড়েছে আসিয়ে
আমার প্রাণের ‘পর!
বহুদিন পরে একটি কিরণ
গুহায় দিয়েছে দেখা,
পড়েছে আমার আঁধার সলিলে
একটি কনকরেখা।
প্রাণের আবেগ রাখিতে নারি
থর থর করি কাঁপিছে বারি,
টলমল জল করে থল থল,
কল কল করি ধরেছে তান।
আজি এ প্রভাতে কী জানি কেন রে
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।
জাগিয়া দেখিনু, চারিদিকে মোর
পাষাণে রচিত কারাগার ঘোর,
বুকের উপরে আঁধার বসিয়া
করিছে নিজের ধ্যান।
না জানি কেন রে এতদিন পরে
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।
জাগিয়া দেখিনু আমি আঁধারে রয়েছি আঁধা,
আপনারি মাঝে আমি আপনি রয়েছি বাঁধা।
রয়েছি মগন হয়ে আপনারি কলস্বরে,
ফিরে আসে প্রতিধ্বনি নিজেরি শ্রবণ-‘পরে।
দূর দূর দূর হতে ভেদিয়া আঁধার কারা
মাঝে মাঝে দেখা দেয় একটি সন্ধ্যার তারা।
তারি মুখ দেখে দেখে আঁধার হাঁসিতে শেখে,
তারি মুখ চেয়ে চেয়ে করে নিশি অবসান।
শিহরি উঠে রে বারি,দোলে রে দোলে রে প্রাণ,
প্রাণের মাঝারে ভাসি দোলে রে দোলে রে হাসি,
দোলে রে প্রাণের ‘পরে আশার স্বপন মম,
দোলে রে তারার ছায়া সুখের আভাস-সম।
মাঝে মাঝে একদিন আকাশেতে নাই আলো,
পড়িয়া মেঘের ছায়া কালো জল হয় কালো।
আঁধার সলিল ‘পরে ঝর ঝর বারি ঝরে
ঝর ঝর ঝর ঝর,দিবানিশি অবিরল–
বরষার দুখ-কথা,বরষার আঁখিজল।
শুয়ে শুয়ে আনমনে দিবানিশি তাই শুনি
একটি একটি ক’রে দিবানিশি তাই গুনি,
তারি সাথে মিলাইয়া কল কল গান গাই–
ঝর ঝর কল কল–দিন নাই, রাত নাই।
এমনি নিজেরে লয়ে রয়েছি নিজের কাছে,
আঁধার সলিল ‘পরে আঁধার জাগিয়া আছে।
এমনি নিজের কাছে খুলেছি নিজের প্রাণ,
এমনি পরের কাছে শুনেছি নিজের গান।
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাত-পাখির গান।
না জানি কেন রে এতদিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ
রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়,
বাহিরিতে চায়, দেখিতে না পায়
কোথায় কারার দ্বার।
প্রভাতেরে যেন লইতে কাড়িয়া
আকাশেরে যেন ফেলিতে ছিঁড়িয়া
উঠে শূন্যপানে–পড়ে আছাড়িয়া
করে শেষে হাহাকার।
প্রাণের উল্লাসে ছুটিতে চায়
ভূধরের হিয়া টুটিতে চায়,
আলিঙ্গন তরে ঊর্ধ্বে বাহু তুলি
আকাশের পানে উঠিতে চায়।
প্রভাতকিরণে পাগল হইয়া
জগৎ-মাঝারে লুটিতে চায়।
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারিদিকে তার বাঁধন কেন?
ভাঙ্ রে হৃদয় ভাঙ্ রে বাঁধন,
সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পর আঘাত কর্।
মাতিয়া যখন উঠিছে পরান,
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠিছে বাসনা,
জগতে তখন কিসের ডর!
সহসা আজি এ জগতের মুখ
নূতন করিয়া দেখিনু কেন?
একটি পাখির আধখানি তান
জগতের গান গাহিল যেন!
জগৎ দেখিতে হইব বাহির,
আজিকে করেছি মনে,
দেখিব না আর নিজেরি স্বপন
বসিয়া গুহার কোণে।
আমি ঢালিব করুণাধারা,
আমি ভাঙিব পাষাণকারা,
আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল-পারা;
কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া,
দিব রে পরান ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব
হেসে খলখল গেয়ে কলকল
তালে তালে দিব তালি।
তটিনী হইয়া যাইব বহিয়া–
যাইব বহিয়া–যাইব বহিয়া–
হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া
গাহিয়া গাহিয়া গান,
যত দেব প্রাণ বহে যাবে প্রাণ
ফুরাবে না আর প্রাণ।
এত কথা আছে এত গান আছে
এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে এত সাধ আছে
প্রাণ হয়ে আছে ভোর।
এত সুখ কোথা এত রূপ কোথা
এত খেলা কোথা আছে!
যৌবনের বেগে বহিয়া যাইব
কে জানে কাহার কাছে!
অগাধ বাসনা অসীম আশা
জগৎ দেখিতে চাই!
জাগিয়াছে সাধ চরাচরময়
প্লাবিয়া বহিয়া যাই।
যত প্রাণ আছে ঢালিতে পারি,
যত কাল আছে বহিতে পারি,
যত দেশ আছে ডুবাতে পারি,
তবে আর কিবা চাই!
পরানের সাধ তাই।
কী জানি কী হল আজি জাগিয়া উঠিল প্রাণ,
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান–
“পাষাণ-বাঁধন টুটি, ভিজায়ে কঠিন ধরা,
বনেরে শ্যামল করি, ফুলেরে ফুটায়ে ত্বরা
সারাপ্রাণ ঢালি দিয়া,
জুড়ায়ে জগৎ-হিয়া–
আমার প্রাণের মাঝে কে আসিবি আয় তোরা!’
আমি যাব, আমি যাব, কোথায় সে, কোন্ দেশ–
জগতে ঢালিব প্রাণ,
গাহিব করুণাগান,
উদ্বেগ-অধীর হিয়া
সুদূর সমুদ্রে গিয়া
সে প্রাণ মিশাব আর সে গান করিব শেষ।
ওরে, চারিদিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর!
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্!
ওরে,আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এয়েছে রবির কর!

Romanized Version

- আত্মজাগরণ ও মুক্তির ডাক:“আজি এ প্রভাতে রবির কর / কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর… জাগিয়া দেখিনু আমি আঁধারে রয়েছি আঁধা,”— ঝরনাটি এতদিন অন্ধকার পাহাড়ের গুহায় নিজের অহং ও সংকীর্ণতার মাঝে বন্দি ছিল। হঠাৎ একদিন সকালে সূর্যের আলো ও পাখির গান সেই অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করে। এটি মূলত কবির নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া আকস্মিক আধ্যাত্মিক জাগরণেরই রূপক, যেখানে আলো ও সুর হলো বিশ্বপ্রকৃতির মুক্তির ডাক।
- বাঁধন ছেঁড়ার উদ্দাম আকাঙ্ক্ষা:“ভাঙ্ রে হৃদয় ভাঙ্ রে বাঁধন… মাতিয়া যখন উঠিছে পরান, / কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!”— প্রাণ যখন জেগে ওঠে, তখন তাকে আর পাথর বা অন্ধকারের প্রাচীর দিয়ে আটকে রাখা যায় না। ঝরনাটি পাগলপারা হয়ে পাথরের বাঁধন ভেঙে মহাসাগরের দিকে ছুটে যেতে চায়। অহংবোধ থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বমানবের সাথে একাত্ম হওয়ার এই উদ্দাম আকাঙ্ক্ষাই এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
- বিশ্বপ্রেম ও মহামিলন:“আমি ঢালিব করুণাধারা… দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান… সে প্রাণ মিশাব আর সে গান করিব শেষ।”— মুক্ত ঝরনা তার যাত্রাপথে চারপাশের প্রকৃতিকে সজীব করে তুলতে তুলতে এগিয়ে যায়। এটি হলো নিঃস্বার্থ বিশ্বপ্রেম। অবশেষে ঝরনাটি যখন মহাসমুদ্রে গিয়ে মিশবে, তখনই তার জীবনের পরম সার্থকতা অর্জিত হবে। অর্থাৎ, মানুষের ক্ষুদ্র সত্তা বা অহং যখন বিশ্বসত্তার (মহাসাগর) সাথে মিশে যায়, তখনই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়।
উৎস

![পূরবী কাব্যগ্রন্থের ক্ষণিকা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষণিকা khonika [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ক্ষণিকা-khonika-কবিতা--1024x536.gif)

![প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ nirjharer swapnabhanga [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/নির্ঝরের-স্বপ্নভঙ্গ-nirjharer-swapnabhanga-কবিতা--1024x536.gif)

![গোলাপবালা golapbala [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 4 গোলাপবালা golapbala [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/গোলাপবালা-golapbala-কবিতা--1024x536.gif)
![প্রভাত-উৎসব prabhaat-utsab [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 5 প্রভাত-উৎসব prabhaat-utsab [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/প্রভাত-উৎসব-prabhaat-utsab-কবিতা--1024x536.gif)
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘ওরা অন্ত্যজ, ওরা মন্ত্রবর্জিত’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরা অন্ত্যজ, ওরা মন্ত্রবর্জিত [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/ওরা-অন্ত্যজ-ওরা-মন্ত্রবর্জিত-1024x576.gif)
![কল্পনার সাথি kolponar sathi [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কল্পনার সাথি kolponar sathi [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/কল্পনার-সাথি-kolponar-sathi-কবিতা--1024x536.gif)

