বীথিকা কাব্যগ্রন্থের কাঠবিড়ালি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ‘বীথিকা’-এর একটি স্নিগ্ধ, মনোরম ও ভাবগভীর রচনা হলো ‘কাঠবিড়ালি’। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটিতে কবি জীবনের প্রবহমান ধারায় লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট সৌন্দর্য ও আনন্দকে নতুন দৃষ্টিতে দেখেছেন। ‘কাঠবিড়ালি’ কবিতায় অত্যন্ত সাধারণ একটি দৃশ্য—একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে পরম মমতায় আঁচলতলায় ঢেকে রাখা—কবির মনে যে গভীর অনুভূতি ও শিল্পের সুর জাগিয়েছে, তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকাঠবিড়ালি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থবীথিকা
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনগীতিময় ও প্রকৃতি-প্রেমের কবিতা (Lyrical and Nature-centric Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক শান্ত ও অন্তর্ভেদী পর্বের পরিচয় বহন করে। এই পর্যায়ে এসে কবি জীবনের বড় বড় ঘটনা বা প্রবল আবেগের বদলে দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ, সাধারণ এবং অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোর মাঝে পরম সত্য ও সৌন্দর্যকে খুঁজে পেয়েছেন। ‘কাঠবিড়ালি’ কবিতায় পথের ধারের একটি ছোট্ট দৃশ্য কীভাবে কবির মনে দীর্ঘস্থায়ী সুরের অনুরণন তোলে এবং জীবনের ছিন্ন ও লুকায়িত রত্নগুলোকে চেনার দৃষ্টি দেয়, তারই এক অপূর্ব প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে।

‘কাঠবিড়ালি’ – সম্পূর্ণ কবিতা

কাঠবিড়ালির ছানাদুটি
আঁচলতলায় ঢাকা,
পায় সে কোমল করুণ হাতে
পরশ সুধামাখা।
এই দেখাটি দেখে এলেম
ক্ষণকালের মাঝে,
সেই থেকে আজ আমার মনে
সুরের মতো বাজে।
চাঁপাগাছের আড়াল থেকে
একলা সাঁঝের তারা
একটুখানি ক্ষীণ মাধুরী
জাগায় যেমনধারা,
তরল কলধ্বনি যেমন
বাজে জলের পাকে
গ্রামের ধারে বিজন ঘাটে
ছোটো নদীর বাঁকে,
লেবুর ডালে খুশি যেমন
প্রথম জেগে ওঠে
একটু যখন গন্ধ নিয়ে
একটি কুঁড়ি ফোটে,
দুপুর বেলায় পাখি যেমন–
দেখতে না পাই যাকে–
ঘন ছায়ায় সমস্ত দিন
মৃদুল সুরে ডাকে,
তেমনিতরো ওই ছবিটির
মধুরসের কণা
ক্ষণকালের তরে আমায়
করেছে আনমনা।
দুঃখসুখের বোঝা নিয়ে
চলি আপন মনে,
তখন জীবন-পথের ধারে
গোপন কোণে কোণে
হঠাৎ দেখি চিরাভ্যাসের
অন্তরালের কাছে
লক্ষ্মীদেবীর মালার থেকে
ছিন্ন পড়ে আছে
ধূলির সঙ্গে মিলিয়ে গিয়ে
টুকরো রতন কত–
আজকে আমার এই দেখাটি
দেখি তারির মতো।

‘কাঠবিড়ালি’ Romanized Version

Kathbiralir chhanaduti
Ancholtolay dhaka,
Pay she komol korun hate
Porosh shudhamakha.
Ei dekhati dekhe elem
Khonokaler majhe,
Shei theke aj amar mone
Shurer moto baje.
Chapagachher aral theke
Ekla shajher tara
Ektukhani kheen madhuri
Jagay jamondhara,
Torol kolodhoni jemon
Baje joler pake
Gramer dhare bijon ghate
Chhoto nodir banke,
Lebur dale khushi jemon
Prothom jege othe
Ektu jokhon gondho niye
Ekti kuri phote,
Dupur belay pakhi jemon–
Dekhte na pai jake–
Ghono chhayay shomosto din
Mridul shure dake,
Temonitoro oi chhabitir
Modhuroshwer kona
Khonokaler tore amay
Koreche anmona.
Dukkhoshukher bojha niye
Choli apon mone,
Tokhon jibon-pother dhare
Gopon kone kone
Hothat dekhi chirabhyasher
Ontoraler kachhe
Lokkhidebir malar theke
Chhinno pore achhe
Dhulir shonge miliye giye
Tukro roton koto–
Ajke amar ei dekhati
Dekhi tarir moto.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

স্নেহ ও মমতার স্নিগ্ধ চিত্র:
“কাঠবিড়ালির ছানাদুটি / আঁচলতলায় ঢাকা, / পায় সে কোমল করুণ হাতে / পরশ সুধামাখা।”
— কবিতার শুরুতেই অত্যন্ত সাধারণ অথচ হৃদয়স্পর্শী একটি দৃশ্য আঁকা হয়েছে। সামান্য একটি কাঠবিড়ালির ছানাকে আঁচলের তলায় পরম মমতায় লুকিয়ে রাখার এই দৃশ্য কবির মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
প্রকৃতির সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের উপমা:
“চাঁপাগাছের আড়াল থেকে / একলা সাঁঝের তারা… / দুপুর বেলায় পাখি যেমন– / দেখতে না পাই যাকে– / ঘন ছায়ায় সমস্ত দিন / মৃদুল সুরে ডাকে,”
— ক্ষণিকের একটি দৃশ্য কীভাবে হৃদয়ে স্থায়ী সুর তৈরি করে, তা বোঝাতে কবি প্রকৃতির একাধিক সূক্ষ্ম ও শান্ত রূপের উপমা টেনেছেন—যেমন সাঁঝের তারা, নদীর বাঁকের কলধ্বনি কিংবা না-দেখা পাখির মৃদুল ডাক।
জীবনের পথে অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি:
“হঠাৎ দেখি চিরাভ্যাসের / অন্তরালের কাছে / লক্ষ্মীদেবীর মালার থেকে / ছিন্ন পড়ে আছে / ধূলির সঙ্গে মিলিয়ে গিয়ে / টুকরো রতন কত–“
— কবি এখানে জীবনের এক গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন। মানুষ যখন দুঃখ-সুখের বোঝা নিয়ে অভ্যস্ত জীবন পার করে, তখন সেই পরিচিত জীবনের অন্তরালেই ধুলোয় মিশে থাকে ছোট ছোট আনন্দ ও সৌন্দর্যের রত্ন। কাঠবিড়ালির ছানাকে মমতায় ঢেকে রাখার সেই সাধারণ দৃশ্যটি কবির কাছে ধুলোয় পড়ে থাকা লক্ষ্মীদেবীর মালার ছিঁড়ে যাওয়া এমন এক টুকরো রত্নের মতোই অমূল্য মনে হয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (বীথিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন