বীথিকা কাব্যগ্রন্থের বাদলসন্ধ্যা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি স্নিগ্ধ, গীতিময় ও আবেগঘন রচনা হলো ‘বাদলসন্ধ্যা’। বৃষ্টির এক সন্ধ্যায় প্রিয়জনের হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিত আগমনকে কবি কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা আড়ম্বর ছাড়া পরম মমতায় বরণ করে নিয়েছেন। ঝরোঝরো বাদল ধারার মাঝে মনের মৌন পারাপার এবং ভালোবাসার সহজ রূপটি এই কবিতায় অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

বীথিকা কাব্যগ্রন্থের বাদলসন্ধ্যা কবিতা

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবাদলসন্ধ্যা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থবীথিকা
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনগীতিধর্মী কবিতা বা গান (Lyrical Song-poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থটিতে রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের স্মৃতি, প্রেম ও প্রকৃতির সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। ‘বাদলসন্ধ্যা’ কবিতাটি গান হিসেবেও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাণ্ডারে অত্যন্ত সমাদৃত। বর্ষার সন্ধ্যায় কোনো প্রস্তুতি ছাড়া কেবল ‘মনের ভুলে’ চলে আসা প্রিয়জনের প্রতি কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ না রেখে, বরং সেই ভুল আগমনকেই পরম প্রাপ্তি জ্ঞান করে অন্তরের দুয়ার খুলে দেওয়ার মানসিকতাই এই কবিতার মূল প্রেক্ষাপট।

সম্পূর্ণ কবিতা:

  গান

      জানি জানি, তুমি এসেছ এ পথে

                মনের ভুলে।

      তাই হোক তবে, তাই হোক, দ্বার

                দিলেম খুলে।

      এসেছ তুমি তো বিনা আভরণে,

      মুখর নূপুর বাজে না চরণে,

      তাই হোক তবে, তাই হোক, এসো

                সহজ মনে।

      ওই তো মালতী ঝরে পড়ে যায়

                মোর আঙিনায়

      শিথিল কবরী সাজাতে তোমার

                লও-না তুলে।

      নাহয় সহসা এসেছ এ পথে

                মনের ভুলে।

      কোনো আয়োজন নাই একেবারে,

      সুর বাঁধা নাই এ বীণার তারে,

      তাই হোক তবে, এসো হৃদয়ের

                মৌনপারে।

      ঝর ঝর বারি ঝরে বনমাঝে,

      আমারি মনের সুর ওই বাজে,

      উতলা হাওয়ার তালে তালে মন

                উঠিছে দুলে।

      নাহয় সহসা এসেছ এ পথে

                মনের ভুলে।

 

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Gan
Jani jani, tumi eshechho e pothe
Moner bhule.
Tai hok tobe, tai hok, dwar
Dilem khule.
Eshechho tumi to bina abhoxone,
Mukhor nupur baje na chorone,
Tai hok tobe, tai hok, esho
Shohoj mone.
Oi to maloti jhore pore jay
Mor anginay
Shithil kobori shajate tomar
Low-na tule.
Nahoy shohosha eshechho e pothe
Moner bhule.
Kono ayojon nai ekebare,
Shur bandha nai e binar tare,
Tai hok tobe, esho hridoyer
Mounopare.
Jhoro jhoro bari jhore bonomajhe,
Amari moner shur oi baje,
Utola hawar tale tale mon
Uthichhe dule.
Nahoy shohosha eshechho e pothe
Moner bhule.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অপ্রত্যাশিত আগমনের সহজ সাদর সম্ভাষণ:
    “জানি জানি, তুমি এসেছ এ পথে / মনের ভুলে। / তাই হোক তবে, তাই হোক, দ্বার / দিলেম খুলে।”
    — প্রিয়জন হয়তো পথ বা উদ্দেশ্য ভুল করে এসে পড়েছে, কিন্তু কবি সেই অনিচ্ছাকৃত আসাকেও দ্বিধাহীনভাবে বরণ করে নিচ্ছেন। ভালোবাসায় আনুষ্ঠানিকতার কোনো স্থান নেই, হৃদয়ের উদারতাই এখানে মুখ্য।
  • আড়ম্বরহীন সৌন্দর্যের আহ্বান:
    “এসেছ তুমি তো বিনা আভরণে, / মুখর নূপুর বাজে না চরণে, / তাই হোক তবে, তাই হোক, এসো / সহজ মনে।”
    — কোনো গহনা বা রূপসজ্জা ছাড়া প্রিয়জনের এই অতি সাধারণ রূপটিই কবির চোখে অকৃত্রিম। তাকে কোনো কুণ্ঠা ছাড়াই ‘সহজ মনে’ ঘরে প্রবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
  • প্রকৃতি ও অন্তরের একাত্মতা:
    “ঝর ঝর বারি ঝরে বনমাঝে, / আমারি মনের সুর ওই বাজে, / উতলা হাওয়ার তালে তালে মন / উঠিছে দুলে।”
    — ঘরের বীণায় সুর বাঁধা না থাকলেও বাইরের অরণ্যে যে বৃষ্টির ধারা ঝরে পড়ছে, কবি অনুভব করছেন সেটিই তাঁর হৃদয়ের সুর। বাইরের বর্ষার উতলা হাওয়া আর মনের দোলাচল একাকার হয়ে গেছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (বীথিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন