আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বৈশাখে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । খেয়া [ ১৯০৬ ]

Table of Content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ শান্ত, মায়াবী ও প্রকৃতিপ্রেমের কবিতা হলো এই ‘বৈশাখে’। সাধারণত বৈশাখ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ঝড়-তুফান আর রুদ্ররূপ। কিন্তু এই কবিতায় কবিগুরু বৈশাখের এক্কেবারে ভিন্ন এক রূপ আমাদের দেখিয়েছেন—যা ভীষণ অলস, উদাসীন অথচ এক অদ্ভুত একাকীত্বের সুন্দরে ঘেরা।

এক্কেবারে খাঁটি গ্রামীণ দুপুরের পটভূমিতে কবিতাটি শুরু হয়। খা-খা রোদ্দুরে আমগাছের কচি পাতায় তপ্ত হাওয়া বইছে, বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে নিমের ফুলের মাতাল করা মিষ্টি গন্ধ। চারপাশের মাঠ-ঘাট খাঁ-খাঁ করছে, কোথাও কেউ নেই। এমন এক নিঝুম নিস্তব্ধ দুপুরের মাঝে কবি এক অলৌকিক সুর শুনতে পান। মৌমাছিদের গুঞ্জন আর তালের বনের পাতার মর্মর ধ্বনির মাঝে কবির মনে হয়, কার যেন পায়ের রিমিঝিমি নূপুরধ্বনি তাঁর মনের ভেতর এবং রক্তে তালে তালে বেজে উঠছে।

রোদ আর গরমের এই অলস দুপুরে কবি কোনো কাজ না করে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। বাঁধের জলে রোদের আলো কাঁপছে, দূরে ধেনু বা গরুগুলো অলস ভঙ্গিতে চরে বেড়াচ্ছে, আর কবি কোনো লক্ষ্য ছাড়াই দূরের আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মনের নানা ভাবনা বুনে চলেছেন। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে যখন গ্রামের ঘাটের পথে বিকেল আর সন্ধ্যার শান্ত ছায়া নেমে আসে, তখন চারপাশ আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। শালবনে আঁচল মেলে সন্ধ্যা নামে, আর গ্রামের বধূরা দিঘির ঘাট থেকে কলস ভরে বাড়ি ফিরে যায়।

দিনের শেষে কবির মনে এক অদ্ভুত ও সুন্দর প্রশ্ন জাগে। সারাটা দিন তো তিনি কোনো ‘আসল’ কাজ বা জাগতিক ব্যস্ততার মাঝে কাটাননি, কেবল অলসভাবেই প্রকৃতির রূপ দেখে কাটিয়ে দিলেন। তাহলে কি তাঁর এই দিনটি একদম বৃথাই গেল? মন কি আসলেই শূন্য রয়ে গেল? কবি নিজেই অনুভব করেন—না, তা নয়। গ্রামীণ বধূর কলস যেমন দিঘির জলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে, তেমনি প্রকৃতির এই রূপ, গন্ধ আর নিস্তব্ধতার মায়া কবির মনকেও এক অদৃশ্য শান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। একলা থাকার এবং অলস সময় কাটানোর মাঝেও যে কত বড় মনের খোরাক লুকিয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় সেই মুগ্ধতাই প্রকাশ করেছেন।

 

বৈশাখে কবিতা [ Boishakhe Kobita ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । খেয়া [ ১৯০৬ ]

তপ্ত হাওয়া দিয়েছে আজ

              আমলাগাছের কচি পাতায়,

   কোথা থেকে ক্ষণে ক্ষণে

              নিমের ফুলে গন্ধে মাতায়।

   কেউ কোথা নেই মাঠের ‘পরে,

   কেউ কোথা নেই শূন্য ঘরে,

   আজ দুপুরে আকাশতলে

              রিমিঝিমি নূপুর বাজে।

   বারে বারে ঘুরে ঘুরে

   মৌমাছিদের গুঞ্জসুরে

   কার চরণের নৃত্য যেন

              ফিরে আমার বুকের মাঝে।

   রক্তে আমার তালে তালে

              রিমিঝিমি নূপুর বাজে।

   ঘন মহুল-শাখার মতো

              নিশ্বসিয়া উঠিছে প্রাণ,

   গায়ে আমার লেগেছে কার

              এলোচুলের সুদূর ঘ্রাণ।

আজি রোদের প্রখর তাপে

   বাঁধের জলে আলো কাঁপে,

   বাতাস বাজে মর্মরিয়া

              সারি-বাঁধা তালের বনে।

   আমার মনের মরীচিকা

   আকাশপারে পড়ল লিখা,

   লক্ষ্যবিহীন দূরের ‘পরে

              চেয়ে আছি আপন-মনে।

   অলস ধেনু চরে বেড়ায়

              সারি-বাঁধা তালের বনে।

 

   আজিকার এই তপ্ত দিনে

              কাটল বেলা এমনি করে,

   গ্রামের ধারে ঘাটের পথে

              এল গভীর ছায়া পড়ে।

   সন্ধ্যা এখন পড়ছে হেলে

   শালবনেতে আঁচল মেলে,

   আঁধার-ঢালা দিঘির ঘাটে

              হয়েছে শেষ কলস ভরা।

   মনের কথা কুড়িয়ে নিয়ে

   ভাবি মাঠের মধ্যে গিয়ে–

   সারা দিনের অকাজে আজ

              কেউ কি মোরে দেয় নি ধরা।

   আমার কি মন শূন্য, যখন

              হল বধূর কলস ভরা।

Amar Rabindranath Logo

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত