বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সায়াহ্নকালের অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ‘সেঁজুতি’-র একটি ভাবগম্ভীর, পৌরাণিক ও দার্শনিক কবিতা হলো ‘ভাগীরথী’। গঙ্গা তথা ভাগীরথীর অবতরণ ও প্রবহমানতাকে কবি কেবল একটি ভৌগোলিক নদী হিসেবে দেখেননি; বরং তাকে দেখেছেন শুষ্কতা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে শাশ্বত চৈতন্য, নবজীবন এবং মরণজয়ী অম্লান সৃষ্টির এক দিব্য প্রবাহরূপে।
Table of Contents
সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থের ভাগীরথী কবিতা
ভাগীরথী কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ভাগীরথী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সেঁজুতি |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৮ (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | পৌরাণিক রূপকাশ্রিত ও দার্শনিক লিরিক (Philosophical & Mythological Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
ভাগীরথী (সম্পূর্ণ কবিতা):
পূর্বযুগে, ভাগীরথী, তোমার চরণে দিল আনি
মর্তের ক্রন্দনবাণী;
সঞ্জীবনীতপস্যায় ভগীরথ
উত্তরিল দুর্গম পর্বত,
নিয়ে গেল তোমা-কাছে মৃত্যুবন্দী প্রেতের আহ্বান–
ডাক দিল, আনো আনো প্রাণ–
নিবেদিল, হে চৈতন্যস্বরূপিণী তুমি,
গৈরিক অঞ্চল তব চুমি
তৃণে শষ্পে রোমাঞ্চিত হোক মরুতল,
ফলহীনে দাও ফল,
পুষ্পবন্ধ্যালতিকার ঘুচাও ব্যর্থতা,
নির্বাক্ ভূমির মুখে দাও কথা।
তুমি যে প্রাণের ছবি,
হে জাহ্নবী–
ধরণীর আদিসুপ্তি ভেঙে দিয়ে যেথা যাও চলে
জাগ্রত কল্লোলে
গানে মুখরিয়া উঠে মাটির প্রাঙ্গণ,
দুই তীরে জেগে ওঠে বন;
তট বেয়ে মাথা তোলে নগরনগরী
জীবনের আয়োজনে ভাণ্ডার ঐশ্বর্যে ভরি ভরি।
মানুষের মুখ্যভয় মৃত্যুভয়,
কেমনে করিবে তারে জয়
নাহি জানে;
তাই সে হেরিছে ধ্যানে,
মৃত্যুবিজয়ীর জটা হতে
অক্ষয় অমৃতস্রোতে
প্রতিক্ষণে নামিছ ধরায়।
পুণ্যতীর্থতটে সে যে তোমার প্রসাদ পেতে চায়।
সে ডাকিছে– মিথ্যাশঙ্কা-নাগপাশে ঘুচাও ঘুচাও,
মরণেরে যে কালিমা লেপিয়াছি সে তুমি মুছাও;
গম্ভীর অভয়মূর্তি মরণের
তব কলধ্বনিমাঝে গান ঢেলে দিক তরণের
এ জন্মের শেষ ঘাটে;
নিরুদ্দেশ যাত্রীর ললাটে
স্পর্শ দিক আশীর্বাদ তব,
নিক সে নূতন পথে যাত্রার পাথেয় অভিনব;
শেষ দণ্ডে ভরে দিক তার কান
অজানা সমুদ্রপথে তব নিত্য-অভিসার-গান।

ভাগীরথী সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Manusher mukkhobhoy mrittyubhoy,
Kemone koribe tare joy
Nahi jane;
Tai she heriche dhyane,
Mrittyubijoyir jota hote
Okkoy omritosrote
Protikkhone namichho dhoray.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রাণের আবাহন ও প্রকৃতির জাগরণ:“তৃণে শষ্পে রোমাঞ্চিত হোক মরুতল, / ফলহীনে দাও ফল, / পুষ্পবন্ধ্যালতিকার ঘুচাও ব্যর্থতা, / নির্বাক্ ভূমির মুখে দাও কথা।”— ভাগীরথী কেবল একটি জলধারা নয়, সে মূলত চৈতন্যময়ী প্রাণশক্তি। তার স্পর্শে শুষ্ক মরুপ্রান্তর শস্যশ্যামল হয়ে ওঠে, বন্ধ্যা বৃক্ষ ফলবতী হয় এবং ধরণীর আদিম সুপ্তি ভেঙে দুকূলে সভ্যতার সমৃদ্ধি মাথা তুলে দাঁড়ায়।
- মৃত্যুভয় জয় ও অমৃতের সন্ধান:“মানুষের মুখ্যভয় মৃত্যুভয়, … মৃত্যুবিজয়ীর জটা হতে / অক্ষয় অমৃতস্রোতে / প্রতিক্ষণে নামিছ ধরায়।”— মানুষের সবচেয়ে বড় আদিম শঙ্কা হলো মৃত্যুর ভয়। মহাদেবের জটাজাল থেকে নেমে আসা গঙ্গার পুণ্যধারা সেই ভয়কে মোচন করে অমরত্বের আস্বাদ এনে দেয়। গঙ্গার তীরে মানুষ তাই মৃত্যুর বিরুদ্ধে অমৃতের সন্ধান করে।
- মৃত্যুর শান্ত ও অভয় রূপ:“মরণেরে যে কালিমা লেপিয়াছি সে তুমি মুছাও; / গম্ভীর অভয়মূর্তি মরণের / তব কলধ্বনিমাঝে গান ঢেলে দিক তরণের”— শেষ জীবনে দাঁড়িয়ে কবি মৃত্যুকে কোনো ভয়াবহ বা অন্ধকার পরিণতি হিসেবে না দেখে, তাকে এক নবযাত্রার সূচনা হিসেবে দেখেছেন। ভাগীরথীর শান্ত জলকল্লোলে যেন মৃত্যুর সমস্ত ভয় দূর হয়ে যায় এবং নিরুদ্দেশ যাত্রীর কানে তা অনন্ত সমুদ্রযাত্রার অভয়গান শুনিয়ে দেয়।
