বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীররস ও রোমান্টিক সংকল্পের এক অনুপম কবিতা হলো ‘অপরাজিত’। প্রিয়ার আপাত প্রত্যাখ্যান বা বিমুখতার আঘাতে ভেঙে না পড়ে, অটল সাধনা ও আত্মত্যাগের শক্তিতে প্রেমকে অন্তিমে জয় করার অপরাজেয় প্রত্যয় এ কবিতায় নিসর্গের মহীয়ান চিত্রকল্পে রূপায়িত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | অপরাজিত |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া (অনলাইন প্রতিলিপিতে কখনো ‘পুনশ্চ’ হিসেবে উল্লেখিত হলেও মূল পাঠটি ‘মহুয়া’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত) |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | বীররসাত্মক রোমান্টিক লিরিক ও প্রণয়-সংকল্পের কবিতা (Heroic Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
মহুয়া কাব্যগ্রন্থের অপরাজিত (সম্পূর্ণ কবিতা):
ফিরাবে তুমি মুখ
ভেবেছ মনে আমারে দিবে দুখ?
আমি কি করি ভয়।
জীবন দিয়ে তোমারে প্রিয়ে, করিব আমি জয়।
বিঘ্নভাঙা যৌবনের ভাষা,
অসীম তার আশা,
বিপুল তার বল,
তোমার আঁখি-বিজুলি-ঘাতে হবে না নিষ্ফল।
বিমুখ মেঘ ফিরিয়া যায় বৈশাখের দিনে,
অরণ্যেরে যেন সে নাহি চিনে
ধরে না কুঁড়ি কানন জুড়ি, ফোটে না বটে ফুল,
মাটির তলে তৃষিত তরুমূল;
ঝরিয়া পড়ে পাতা,
বনস্পতি তবুও তুলি মাথা
নিঠুর তপে মন্ত্র জপে নীরব অনিমেষে
দহনজয়ী সন্ন্যাসীর বেশে।
দিনের পরে যায় রে দিন, রাতের পরে রাতি,
শ্রবণ রহে পাতি।
কঠিনতর যবে সে পণ দারুণ উপবাসে
এমনকালে হঠাৎ কবে আসে
উদার অকৃপণ
আষাঢ় মাসে সজল শুভখন;
পূর্বগিরি-আড়াল হতে বাড়ায় তার পাণি,
করিয়ো ক্ষমা, করিয়ো ক্ষমা, গুমরি উঠে বাণী,
নমিয়া পড়ে নিবিড় মেঘরাশি,
অশ্রুবারিবন্যা নামে ধরণী যায় ভাসি।
ফিরালে মোরে মুখ!
এ শুধু মোরে ভাগ্য করে ক্ষণিক কৌতুক।
তোমার প্রেমে আমার অধিকার
অতীত যুগ হতে সে জেনো লিখন বিধাতার।
অচল গিরিশিখর-‘পরে সাগর করে দাবি,
ঝর্না পড়ে নাবি;
সুদূর দিক্রেখার পানে চায়,
অকূল অজানায়
শঙ্কাভরে তরল স্বরে কহে,
নহে গো, নহে নহে;
এড়ায়ে যাবে বলি
কত-না আঁকাবাঁকার পথে চলে সে ছলছলি;
বিপুলতর হয় সে ধারা, গভীরতর সুরে,
যতই আসে দূরে;
উদারহাসি সাগর সহে অবুঝ অবহেলা–
একদা শেষে পলাতকার খেলা
বক্ষে তার মিলায় কবে, মিলনে হয় সারা–
পূর্ণ হয় নিবেদনের ধারা।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Phirale more mukh!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বিমুখতার মুখে বীরোচিত সংকল্প:“ফিরাবে তুমি মুখ / ভেবেছ মনে আমারে দিবে দুখ? / আমি কি করি ভয়। / জীবন দিয়ে তোমারে প্রিয়ে, করিব আমি জয়।”— প্রেম এখানে কোনো দুর্বল আত্মসমর্পণ নয়; তা জীবন পণ করে জয় করার এক মহৎ সংকল্প। প্রিয়ার চাহনির বিদ্যুতাঘাত যৌবনের উদ্দাম শক্তি ও আশাকে স্তব্ধ করতে পারে না, বরং প্রেমিককে করে তোলে আরও সংকল্পবদ্ধ।
- তপস্বী বনস্পতি ও আষাঢ়ের ক্ষমাভিক্ষা:“বনস্পতি তবুও তুলি মাথা / নিঠুর তপে মন্ত্র জপে নীরব অনিমেষে / দহনজয়ী সন্ন্যাসীর বেশে। / … করিয়ো ক্ষমা, করিয়ো ক্ষমা, গুমরি উঠে বাণী, / নমিয়া পড়ে নিবিড় মেঘরাশি,”— বৈশাখের খররৌদ্রে পাতা ঝরে গেলেও বনস্পতি মাথা উঁচু করে সন্ন্যাসীর মতো তপস্যায় মগ্ন থাকে। সেই নীরব ত্যাগের শক্তির কাছে অবশেষে আষাঢ়ের অহংকারী মেঘকে নতিস্বীকার করতে হয় এবং ক্ষমা চেয়ে সে অঝোর ধারায় নেমে আসে। প্রেমের তপস্যাও একইভাবে একদা নিষ্ঠুর হৃদয়কে বিগলিত করে।
- পলাতকা ঝরনা ও সাগরের মিলন-নিয়তি:“এড়ায়ে যাবে বলি / কত-না আঁকাবাঁকার পথে চলে সে ছলছলি; / … উদারহাসি সাগর সহে অবুঝ অবহেলা– / একদা শেষে পলাতকার খেলা / বক্ষে তার মিলায় কবে, মিলনে হয় সারা–“— পর্বতের ঝরনা সাগরের ডাক এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথে পালিয়ে যেতে চায়; কিন্তু সাগর শান্ত উদারতায় তার সমস্ত অবহেলা সহ্য করে। পথ যতই দীর্ঘ হোক, নদীর চরম পরিণতি যেমন মহাসাগরের বুকে বিলীন হওয়া, তেমনি প্রিয়ার পলায়নপর চঞ্চলতাও একদিন প্রেমিকের উদার হৃদয়ে এসে পরম সমর্পণে শান্ত হবে—এই শাশ্বত মিলনের আত্মবিশ্বাসই কবিতাটিকে অপরাজেয় রূপ দিয়েছে।


![উদাসীন udasin [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উদাসীন udasin [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/উদাসীন-udasin-কবিতা--1024x536.gif)

![মহুয়া কাব্যগ্রন্থের অপরাজিত কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 অপরাজিত oporajito [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অপরাজিত-oporajito-কবিতা--1024x536.gif)



![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের ‘আদরিণী’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদরিণী adarinee [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/আদরিণী-adarinee-কবিতা--1024x536.gif)