মহুয়া কাব্যগ্রন্থের উজ্জীবন কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শক্তিময়, তেজোদৃপ্ত ও দার্শনিক প্রেমের কবিতা হলো ‘উজ্জীবন’। মদনভস্মের পৌরাণিক রূপককে কেন্দ্র করে প্রেমের স্থূল, জৈবিক মোহকে রুদ্রের আগুনে পুড়িয়ে ফেলে বীর্যবান, আত্মত্যাগী ও আধ্যাত্মিক এক মহিমাময় শক্তিতে রূপান্তরিত করার উদাত্ত আহ্বান এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামউজ্জীবন
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনবীররসাত্মক রোমান্টিক লিরিক ও রূপকপ্রধান প্রেমের কবিতা (Heroic Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে দুর্বলতা বা নিছক ভাবালুতার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে বীর্যবত্তার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মদন বা কামদেব মহাদেবের তপস্যা ভঙ্গ করতে গিয়ে তাঁর তৃতীয় নয়নের আগুনে ভস্মীভূত হয়ে ‘অতনু’ বা দেহহীন রূপ লাভ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই পৌরাণিক রূপককে আধুনিক দর্শনে পুনর্নির্মাণ করেছেন। কবি চান—প্রেমের যা-কিছু নশ্বর, স্থূল ও দুর্বল, তা ধ্বংস হয়ে যাক; আর সেই দহনের ভেতর থেকেই জন্ম নিক এমন এক প্রেম, যা কাপুরুষের বিলাসিতা নয়, বরং বীরেদের আত্মত্যাগী হৃদয়ে নতুন অবয়ব পরিগ্রহ করবে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

ভস্ম-অপমানশয্যা ছাড়ো পুষ্পধনু,

রুদ্রবহ্নি হতে লহ জ্বলদর্চি তনু।

                 যাহা মরণীয় যাক মরে,

        জাগো অবিস্মরণীয় ধ্যানমূর্তি ধরে।

                 যাহা রূঢ়, যাহা মূঢ় তব,

        যাহা স্থূল, দগ্ধ হোক, হও নিত্য নব।

                 মৃত্যু হতে জাগো পুষ্পধনু,

        হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু।

মৃত্যুঞ্জয় তব শিরে মৃত্যু দিলা হানি;

অমৃত সে-মৃত্যু হতে দাও তুমি আনি।

                 সেই দিব্য দীপ্যমান দাহ

        উন্মুক্ত করুক অগ্নি-উৎসের প্রবাহ।

                 মিলনেরে করুক প্রখর,

        বিচ্ছেদেরে করে দিক দুঃসহ সুন্দর।

                 মৃত্যু হতে জাগো পুষ্পধনু,

        হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু।

দুঃখে সুখে বেদনায় বন্ধুর যে-পথ

সে দুর্গমে চলুক প্রেমের জয়রথ।

                 তিমিরতোরণে রজনীর

        মন্দ্রিবে সে রথচক্রনির্ঘোষ গম্ভীর।

                 উল্লঙ্ঘিয়া তুচ্ছ লজ্জা ত্রাস

        উচ্ছলিবে আত্মহারা উদ্‌বেল উল্লাস।

                 মৃত্যু হতে ওঠো পুষ্পধনু,

        হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু।

 

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Bhosmo-opomanshojja chharo pushpodhonu,
Rudrobohni hote loho jwolodorchi tonu.
Jaha moroniyo jak more,
Jago obismoroniyo dhyanmurti dhore.
Jaha ruro, jaha muro tobo,
Jaha sthulo, dogdho hok, ho-o nitto nobo.
Mrittyu hote jago pushpodhonu,
He otonu, birer tonute loho tonu.
Mrittyunjoy tobo shire mrittyu dila hani;
Omrito she-mrittyu hote dao tumi ani.
Shei dibbo dippoman daho
Unmukto koruk ogni-utser probaho.
Milonere koruk prokhor,
Bichhedere kore dik duhshoho shundor.
Mrittyu hote jago pushpodhonu,
He otonu, birer tonute loho tonu.
Dukkhe shukhe bedonay bondhur je-poth
She durgome choluk premer joyoroth.
Timirtorone rojonir
Mondribe she rothchokronirghosh gombhir.
Ullonghiya tuchcho lojja trash
Uchchholibe atmohara udbel ullash.
Mrittyu hote otho pushpodhonu,
He otonu, birer tonute loho tonu.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • স্থূলের বিনাশ ও রূপান্তর:
    “ভস্ম-অপমানশয্যা ছাড়ো পুষ্পধনু, / রুদ্রবহ্নি হতে লহ জ্বলদর্চি তনু। / যাহা মরণীয় যাক মরে, / জাগো অবিস্মরণীয় ধ্যানমূর্তি ধরে।”
    — কামদেব কেবল দৈহিক আকর্ষণ নিয়ে জেগেছিলেন বলেই শিবের আগুনে তাঁকে ভস্ম হতে হয়েছিল। কবি সেই ভস্মের অপমানচিহ্ন ত্যাগ করে প্রেমের আদিম জৈব মোহকে পুড়িয়ে ফেলে এক অবিনশ্বর, ধ্যানলব্ধ ও জ্যোতির্ময় রূপে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
  • বীরের তনুতে নবজন্ম:
    “মৃত্যু হতে জাগো পুষ্পধনু, / হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু। / … মিলনেরে করুক প্রখর, / বিচ্ছেদেরে করে দিক দুঃসহ সুন্দর।”
    — দেহহীন প্রেম যেন কোনো দুর্বল চিত্তের আশ্রয় না নেয়; সে যেন স্থান পায় বীরের সবল বক্ষে। এই শোধিত প্রেম মিলনকে করবে তীব্র ও পবিত্র, আর বিরহের যন্ত্রণাকে করে তুলবে মহিমান্বিত ও সুন্দর।
  • দুর্গম পথে জয়যাত্রা:
    “দুঃখে সুখে বেদনায় বন্ধুর যে-পথ / সে দুর্গমে চলুক প্রেমের জয়রথ। / … উল্লঙ্ঘিয়া তুচ্ছ লজ্জা ত্রাস / উচ্ছলিবে আত্মহারা উদ্‌বেল উল্লাস।”
    — প্রেম কোনো আরামের পুষ্পশয্যা নয়; তা সুখ-দুঃখ ও বেদনার বন্ধুর পথে চলা এক অপরাজেয় সংগ্রাম। সমস্ত ভয়, দ্বিধা ও সংকীর্ণ সামাজিক লজ্জাকে পদদলিত করে অন্ধকারের প্রাচীর ভেঙে প্রেমের এই জয়রথ বীরদর্পে এগিয়ে চলে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন