বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর নীতিগর্ভ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপকপ্রধান প্রেমের কবিতা হলো ‘দর্পণ’। বাহ্যিক রূপলাবণ্যের ক্ষণস্থায়ী মায়া দিয়ে নয়, বরং আত্মনিবেদনের চিরন্তন আত্মিক মহিমাতেই যে প্রেমে নারীর শাশ্বত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়—তিলোত্তমা ও শচীর পৌরাণিক বৈপরীত্যের মাধ্যমে এ কবিতায় তা অপরূপ প্রাঞ্জলতায় ব্যক্ত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | দর্পণ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক নীতিগর্ভ ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক (Reflective Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
দ-র্পণ লইয়া তারে কী প্রশ্ন শুধাও একমনে
হে সুন্দরী, কী সংশয় জাগে তব উদ্বিগ্ন নয়নে।
নিজেরে দেখিতে চাও বাহিরে রাখিয়া আপনারে
যেন আর কারো চোখে; আর কারো জীবনের দ্বারে
খুঁজিছ আপন স্থান। প্রেমের অর্ঘ্যের কোনো ত্রুটি
দেখ কি মুখের কোনোখানে। তাই তব আঁখিদুটি
নিজেরে কি করিছে ভর্ৎসনা। সাজায়ে লইয়া সর্বদেহে
স্বর্গের গর্বের ধন, তবে যেতে চাও তার গেহে?
জান না কি হে রমণী, দ-র্পণে যা দেখিছ তা ছায়া,
পার না রচিতে কভু তাই দিয়ে চিরস্থায়ী মায়া।
তিলোত্তমা অনুপমা সুরেন্দ্রের প্রমোদপ্রাঙ্গণে
কঙ্কণঝংকারে আর নৃত্যলোল নূপুরনিক্বণে
নাচিয়া বাহিরে চলে যায়। লয়ে আত্মনিবেদন
গৌরবে জিনিলা শচী ইন্দ্রলোকে নন্দন-আসন।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- রূপের সংশয় ও দর্পণের ছায়া:“জান না কি হে রমণী, দর্পণে যা দেখিছ তা ছায়া, / পার না রচিতে কভু তাই দিয়ে চিরস্থায়ী মায়া।”— প্রেমাস্পদের চোখে নিজেকে সুন্দর দেখানোর ব্যাকুলতায় নারী যখন আয়নায় খুঁত খুঁজতে থাকে, কবি তখন তাকে সচেতন করেন। কাচের দর্পণে ধরা পড়া সৌন্দর্য নিতান্তই বাহ্যিক এক ক্ষণভঙ্গুর ছায়া, যা দিয়ে প্রেমের অক্ষয় বন্ধন সৃষ্টি করা যায় না।
- তিলোত্তমার চপলতা বনাম শচীর স্থির মহিমা:“তিলোত্তমা অনুপমা সুরেন্দ্রের প্রমোদপ্রাঙ্গণে / কঙ্কণঝংকারে আর নৃত্যলোল নূপুরনিক্বণে / নাচিয়া বাহিরে চলে যায়। লয়ে আত্মনিবেদন / গৌরবে জিনিলা শচী ইন্দ্রলোকে নন্দন-আসন।”— অপ্সরা তিলোত্তমার রূপ ও নৃত্য কেবল ক্ষণিক চিত্তবিনোদনের উপকরণ হয়ে বাইরের প্রাঙ্গণেই হারিয়ে যায়। কিন্তু ইন্দ্রের মহিষী শচী কোনো বাহ্যিক নৃত্যের মোহে নয়, বরং গভীর পাতিব্রত্য ও পরিপূর্ণ আত্মনিবেদনের শক্তিতে স্বর্গের প্রধান আসনের চিরস্থায়ী মর্যাদা অধিকার করেন।
- প্রেমের প্রকৃত উপাচার:— কবিতাটি রূপসর্বস্বতার বিরুদ্ধে অন্তরের শুদ্ধ ভালোবাসার জয়গান। প্রেম কোনো বাহ্যিক সাজের প্রতিযোগিতা নয়; তা নিজেকে অকৃত্রিমভাবে সমর্পণ করার মধ্য দিয়েই নিজের স্থান চিরস্থায়ী করে তোলে।