বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি মরমিয়া, স্মৃতিকাতর ও রোমান্টিক সৃষ্টি হলো ‘বাপী’। এই কবিতায় মরুভূমি বা শুষ্ক প্রান্তরের পটভূমিতে অতীতে কোনো এক পিরিয়ডের ক্ষণিকের মিলন, কূপের জল তোলার স্মৃতি এবং দীর্ঘকাল পরে সেই একই জায়গায় ফিরে এসে প্রিয়জনকে না পাওয়ার এক গভীর বেদনা ও নস্টালজিয়ার রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বাপী (কূপ বা জলাশয়) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | স্মৃতিচারণমূলক ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা (Nostalgic / Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিক ভাবনার এক অত্যন্ত পরিণত ও উজ্জ্বল নিদর্শন। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে মানবপ্রেম, নিসর্গ এবং স্মৃতির চিরন্তন রূপ অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বাপী’ (যার অর্থ কূপ বা জলাশয়) কবিতায় কবি এমন এক সুদূর অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করেছেন, যেখানে মরুভূমির বুকে যুগল তরুর মূলে কোনো এক প্রিয়জন তৃষ্ণার জল তুলে দিয়েছিলেন। সেই প্রাচীন রাজবংশ বা জনপদের ইতিহাস হারিয়ে গেছে, বালুকার গ্রাসে সব জীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই কূপ ও যুগলতরু আজও বেঁচে আছে। বহু বছর পর কবি যখন একা সেই চেনা পথে ফিরে আসেন, তখন সেই প্রিয়জনকে আর দেখতে পান না—কেবল তৃষিত স্মৃতির মরুভূমি পড়ে থাকে। অতীতের সেই দুর্লভ ক্ষণটি কবির মনে যক্ষের ধনের মতো চিরকাল সঞ্চিত হয়ে রয়েছে—এই গভীর বিয়োগান্তক ও স্মৃতিকাতর সুরই কবিতার মূল প্রাণ।
বাপী কবিতা (সম্পূর্ণ)
একদা বিজনে যুগল তরুর মূলে
তৃষ্ণার জল তুমি দিয়েছিলে তুলে।
আর কোনোখানে ছায়া নাহি দেখি,
শুধালেম, কাছে বসিতে দিবে কি।
সেদিন তোমার ঘরে ফিরিবার বেলা
বহে গেল বুঝি, কাজে হয়ে গেল হেলা।
অদূরে হোথায় ভাঙা দেউলের ধারে
পূর্ব যুগের পূজাহীন দেবতারে
প্রভাত-অরুণ প্রতিদিন খোঁজে,
শূন্য বেদির অর্থ না বোঝে,
দিন শেষ হলে সন্ধ্যাতারার আলো
যে পূজারী নাই তারে বলে, দীপ জ্বালো।
একদিন বুঝি দূরে কোন্ রাজধানী
রচনা করেছে দীর্ঘ এ পথখানি।
আজি তার নাম নাই ইতিহাসে;
জীর্ণ হয়েছে বালুকার গ্রাসে,
প্রান্তরশেষে শীর্ণ বনের কোলে
জনপদবধূ জল নিয়ে যায় চলে।
লুপ্তকালের শুষ্ক সাগরধারে
বহু বিস্মৃতি যেথা রয় স্তূপাকারে,
অতি পুরাতন কাহিনী যেথায়
রুদ্ধ কণ্ঠে শূন্যে তাকায়,
হারানো ভাষার নিশার স্বপ্নছায়ে
হেরিনু তোমায়, আসিনু ক্লান্ত পায়ে।
শুধু দুটি তরু মরুর প্রাণের কথা,
লুকানো কী রসে বাঁচে তার শ্যামলতা।
সেদিন তাহারি মর্মর-সনে
কী ব্যথা মিশানু, জানে দুইজনে;
মাথার উপরে উড়ে গেল কোন্ পাখি
হতাশ পাখার হাহাকাররেখা আঁকি।
তপ্ত বালুর ভর্ৎসিয়া মুহু মুহু
তাপিত বাতাস চিৎকারি উঠে হুহু;
ধূলির ঘূর্ণি, যেন বেঁকে বেঁকে
শাপ-লাগা প্রেত নাচে থেকে থেকে;
রূঢ় রুদ্র রিক্তের মাঝখানে
দুইটি প্রহর ভরেছিনু প্রাণে গানে।
দিন শেষ হল, চলে যেতে হল একা,
বলিনু তোমারে, আরবার হবে দেখা।
শুনে হেসেছিলে হাসিখানি ম্লান,
তরুণ হৃদয়ে যেন তুমি জান
অসীমের বুকে অনাদি বিষাদখানি
আছে সারাখন মুখে আবরণ টানি।
তার পরে কত দিন চলে গেল মিছে
একটি দিনেরে দলিয়া পায়ের নীচে।
বহু পরে যবে ফিরিলাম প্রিয়ে,
এ পথে আসিতে দেখি চমকিয়ে
আছে সেই কূপ, আছে সে যুগলতরু।
তুমি নাই, আছে তৃষিত স্মৃতির মরু।
এ কূপের তলে মোর যক্ষের ধন
একটি দিনের দুর্লভ সেইখন
চিরকাল ভরি রহিল লুকানো,
ওগো অগোচরা জান নাহি জান;
আর কোনো দিনে অন্য যুগের প্রিয়া
তারে আর-কারে দিবে কি উদ্ধারিয়া।

বাপী কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- অতীতে হারিয়ে যাওয়া প্রেম: মরুভূমির বুকে কূপ ও যুগল তরুর পটভূমিতে অতীতের সেই মিলনমাখা দিন এবং বর্তমানের নিঃসঙ্গতার এক গভীর সুর এই কবিতার মূল ভিত্তি।
- স্মৃতির অমরত্ব: মানুষ বা পারিপার্শ্বিকতা হারিয়ে গেলেও অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রিয় স্মৃতির ভাণ্ডার বা ‘যক্ষের ধন’ চিরকাল অম্লান ও অক্ষয় হয়ে থাকে—এই শাশ্বত সত্যই কবিতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![সাত ভাই চম্পা sat bhai chompa [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাত ভাই চম্পা sat bhai chompa [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/সাত-ভাই-চম্পা-sat-bhai-chompa-কবিতা-1-1-1024x536.gif)


![মহুয়া কাব্যগ্রন্থের 'বাপী' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 বাপী bapi [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বাপী-bapi-কবিতা--1024x536.gif)




