আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

মানসী কাব্যগ্রন্থের ‘গুপ্ত প্রেম’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামগুপ্ত প্রেম
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমানসী
প্রকাশের বছর১৮৯০ (১২৯৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনমনস্তাত্ত্বিক ও আত্মপ্রবেদনমূলক লিরিক কবিতা (Psychological / Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯০ সালে প্রকাশিত ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিণত সৃষ্টির পর্যায়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে মানবমনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রেম এবং আবেগের গভীর প্রকাশ দেখা যায়। ‘গুপ্ত প্রেম’ কবিতায় কবি এক অপরূপ বেদনাদায়ক ভাবনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। কবির মনে ব্যাকুল ভালোবাসা ও পূজার আকুতি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রশ্ন করেন—যদি বিধি তাঁকে রূপ দেননি, তবে সে কি করে তার ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাবে? রূপসী না হওয়ার কারণে এবং নিজের তনু-আবরণ শ্রীহীন ও ম্লান মনে করে, তিনি তাঁর পবিত্র ও মহীয়ান প্রেমকে লোকচক্ষুর আড়ালে মনের অন্ধকূপে রুদ্ধ করে রাখেন। পাছে সেই প্রিয় মানুষটি বাহ্যিক রূপ দেখে অবহেলা করে বা অপমান করে, সেই ভয়ে তিনি দূরে পালিয়ে যান—এই সুগভীর আত্মগোপন ও নিঃশব্দ কান্নার সুরই কবিতার মূল প্রাণ।

গুপ্ত প্রেম কবিতা (সম্পূর্ণ)

তবে  পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে

                রূপ না দিলে যদি বিধি হে!

         পূজার তরে হিয়া            উঠে যে ব্যাকুলিয়া,

                পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে!

       মনে    গোপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা,

                কুসুম দেয় তাই দেবতায়।

         দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে,         চাহিয়া দেখি তারে,

                কী ব’লে আপনারে দিব তায়?

       ভালো  বাসিলে ভালো যারে দেখিতে হয়

                সে যেন পারে ভালো বাসিতে।

         মধুর হাসি তার             দিক সে উপহার

                মাধুরী ফুটে যার হাসিতে।

       যার   নবনীসুকুমার কপোলতল

                কী শোভা পায় প্রেমলাজে গো!

         যাহার ঢলঢল                 নয়নশতদল

                তারেই আঁখিজল সাজে গো।

       তাই    লুকায়ে থাকি সদা পাছে সে দেখে,

                ভালোবাসিতে মরি শরমে।

         রুধিয়া মনোদ্বার          প্রেমের কারাগার

                রচেছি আপনার মরমে।

       আহা    এ তনু-আবরণ শ্রীহীন ম্লান

                ঝরিয়া পড়ে যদি শুকায়ে,

         হৃদয়মাঝে মম           দেবতা মনোরম

                মাধুরী নিরুপম লুকায়ে।

যত   গোপনে ভালোবাসি পরান ভরি

                পরান ভরি উঠে শোভাতে–

         যেমন কালো মেঘে         অরুণ-আলো লেগে

                মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে।

       আমি    সে শোভা কাহারে তো দেখাতে নারি,

                এ পোড়া দেহ সবে দেখে যায়–

         প্রেম যে চুপে চুপে           ফুটিতে চাহে রূপে,

                মনেরই অন্ধকূপে থেকে যায়।

       দেখো  বনের ভালোবাসা আঁধারে বসি

                কুসুমে আপনারে বিকাশে,

         তারকা নিজ হিয়া           তুলিছে উজলিয়া

                আপন আলো দিয়া লিখা সে।

       ভবে    প্রেমের আঁখি প্রেম কাড়িতে চাহে,

                মোহন রূপ তাই ধরিছে।

         আমি  যে আপনায়          ফুটাতে পারি নাই,

                পরান কেঁদে তাই মরিছে।

       আমি    আপন মধুরতা আপনি জানি

                পরানে আছে যাহা জাগিয়া,

         তাহারে লয়ে সেথা        দেখাতে পারিলে তা

                যেত এ ব্যাকুলতা ভাগিয়া।

       আমি    রূপসী নহি, তবু আমারো মনে

                প্রেমের রূপ সে তো সুমধুর।

         ধন সে যতনের                 শয়ন-স্বপনের,

                করে সে জীবনের তমোদূর।

আমি    আমার অপমান সহিতে পারি

                প্রেমের সহে না তো অপমান।

         অমরাবতী ত্যেজে          হৃদয়ে এসেছে যে,

                তাহারো চেয়ে সে যে মহীয়ান।

       পাছে    কুরূপ কভু তারে দেখিতে হয়

                কুরূপ দেহ-মাঝে উদিয়া,

         প্রাণের এক ধারে             দেহের পরপারে

                তাই তো রাখি তারে রুধিয়া।

       তাই    আঁখিতে প্রকাশিতে চাহি নে তারে,

                নীরবে থাকে তাই রসনা।

         মুখে সে চাহে যত             নয়ন করি নত,

                গোপনে মরে কত বাসনা।

       তাই    যদি সে কাছে আসে পালাই দূরে,

                আপন মনো-আশা দলে যাই,

         পাছে সে মোরে দেখে         থমকি বলে “এ কে!”

                দু-হাতে মুখ ঢেকে চলে যাই।

       পাছে    নয়নে বচনে সে বুঝিতে পারে

                আমার জীবনের কাহিনী–

         পাছে সে মনে ভানে,        “এও কি প্রেম জানে!

                আমি তো এর পানে চাহি নি!”

       তবে    পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে

                রূপ না দিলে যদি বিধি হে!

         পূজার তরে হিয়া          উঠে যে ব্যাকুলিয়া,

                পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে!

গুপ্ত প্রেম কবিতার Romanized Version:

Tobe porane bhalobasha keno go dile
Rup na dile jodi bidhi he!
Pujar tore hiya uthe je byakuliya,
Pujibo tare giya ki diye!
Mone gopone thake prem, jay na dekha,
Kushum dey tai debotay.
Daraye thaki dware, chahiya dekhi tare,
Ki b’ole apnare dibo tay?
Bhalo basile bhalo jare dekhibe hoy
Se jeno pare bhalo bashite.
Madhur hashi tar dik se upohar
Madhuri fute jar hashite.
Jar nobonishukumar kopoltol
Ki shobha pay premlaje go!
Jahar dhol-dhol noyon-shotodol
Tarei ankhijol shaje go.
Tai lukaye thaki shoda pashe se dekhe,
Bhalobasite mori shorome.
Rudhiya monodwar premer karagar
Rochechhi apnar morome.
Aha e tonu-aboron shrihin mlan
Jhoriya pore jodi shukaye,
Hridoymajhe momo debota monorom
Madhuri nirupom lukaye.
Joto gopone bhalobashi poran vhori
Poran vhori uthe shobhate–
Jemon kalo meghe orun-alo lege
Madhuri uthe jege probhate.
Ami se shobha kahare to dekhate nari,
E pora deho shobe dekhe jay–
Prem je chupe chupe futite chahe rupe,
Moneri andhokupe theke jay.
Dekho boner bhalobasha andhare bosi
Kushume apnare bikashe,
Tarka nij hiya tuliche ujonliya
Apon alo diya likha se.
Bhobe premer ankhi prem karite chahe,
Mohon rup tai dhoriche.
Ami je apnay futate pari nai,
Poran kende tai moriche.
Ami apon modhurata apani jani
Porane ache jaha jagiya,
Tahare loye setha dekhate parile ta
Jeto e byakulota bhagiya.
Ami ruposhi nahi, tobu amaro mone
Premer rup se to shomudhur.
Dhon se jotoner shoyon-shoponer,
Kore se jiboner tomodur.
Ami amar opoman shohite pari
Premer shohhe na to opoman.
Amoraboti t্যেje hridoye esheche je,
Tahar-o cheye se je mohiyan.
Pashe kurup kobhu tare dekhibe hoy
Kurup deho-majhe udiya,
Praner ek dhare deher porpare
Tai to rakhi tare rudhiya.
Tai ankhite prokashite chahi ne tare,
Nirobe thake tai roshona.
Mukhe se chahe joto noyon kori noto,
Gopone more koto bashona.
Tai jodi se kache ashe palai dure,
Apon mono-asha dole jai,
Pashe se more dekhe thomoki bole “e ke!”
Du-hate mukh dheke chole jai.
Pashe noyone bochone se bujhite pare
Amar jiboner kahini–
Pashe se mone bhane, “eo ki prem jane!
Ami to er pane chahi ni!”
Tobe porane bhalobasha keno go দিলে
Rup na dile jodi bidhi he!
Pujar tore hiya uthe je byakuliya,
Pujibo tare giya ki diye!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • রূপ ও প্রেমের দ্বন্দ্ব: বাহ্যিক সৌন্দর্যের অভাব এবং অন্তরের গভীর প্রেমের উপস্থিতির মধ্যে যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, তা এই কবিতার মূল চালিকাশক্তি।
  • গোপন প্রেম ও নিঃশব্দ আত্মত্যাগ: রূপহীনতার সংকোচে নিজের ভালোবাসাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রেখে হৃদয়ের অন্ধকূপে সঁপে দেওয়ার এক চরম আত্মিক বেদনা ও নিঃস্বার্থ নিবেদন এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মানসী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত