শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের শীতের রোদ্দুর কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ২৩ সংখ্যক কবিতা হলো ‘শীতের রোদ্দুর’। শীতের এক শান্ত, আলস্যভরা দুপুরে প্রকৃতির স্তব্ধতার ভেতর দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা এবং আত্মবিস্মৃতির প্রাত্যহিকতা ভেঙে পরম আনন্দের স্পর্শে “আমি আছি”—এই শাশ্বত অস্তিত্বের বাণীমূর্তিকে আবিষ্কার করার দর্শন এ কবিতায় অপূর্ব নিবিড়তায় রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশীতের রোদ্দুর (২৩ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও অস্তিত্ববাদী দার্শনিক লিরিক (Existential / Philosophical Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে শান্তিনিকেতনের নিসর্গ ও অন্তর্জগতের নিভৃত সত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। শীতের এক কর্মহীন, রোদ-ঝলমল দিনে সেগুন বন, ঝুরি-নামা বটগাছ আর ঝাউয়ের মর্মরধ্বনি মিলে যে স্তব্ধতার আবহ সৃষ্টি করে, তা কবিকে বহির্জগতের ব্যস্ততা থেকে ভেতরের গভীরে নিয়ে যায়। সারা বছর সাধারণ হয়ে থাকা আমগাছ যেমন মাঘের শেষে হঠাৎ মুকুলের স্পর্শে জেগে ওঠে, মানবসত্তাও তেমনি প্রিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি বা গানের সুরে এক নিমেষেই নিজের অনন্যতাকে উপলব্ধি করে। উপনিষদের “সোহহং” বা অস্তিত্বের শাশ্বত সত্যটিকেই কবি “আমি আছি” উপলব্ধির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

শীতের রোদ্দুর।

সোনা-মেশা সবুজের ঢেউ

স্তম্ভিত হয়ে আছে সেগুন বনে।

বেগনি-ছায়ার ছোঁওয়া-লাগা

ঝুরি-নামা বৃদ্ধ বট

ডাল মেলেছে রাস্তার ওপার পর্যন্ত।

ফলসাগাছের ঝরা পাতা

হঠাৎ হাওয়ায় চমকে বেড়ায় উড়ে

ধুলোর সাঙাত হয়ে।

কাজ-ভোলা এই দিন

উধাও বলাকার মতো

লীন হয়ে চলেছে নিঃসীম নীলিমায়।

ঝাউগাছের মর্মরধ্বনিতে মিশে

মনের মধ্যে এই কথাটি উঠছে বেজে,

“আমি আছি।”

কুয়োতলার কাছে

সামান্য ঐ আমের গাছ;

সারা বছর ও  থাকে আত্মবিস্মৃত,

বনের সাধারণ সবুজের আবরণে

ও থাকে ঢাকা।

এমন সময় মাঘের শেষে

হঠাৎ মাটির নিচে

শিকড়ে শিকড়ে তার শিহর লাগে,

শাখায় শাখায় মুকুলিত হয়ে ওঠে বাণী–

“আমি আছি,”

চন্দ্রসূর্যের আলো আপন ভাষায়

স্বীকার করে তার সেই ভাষা।

অলস মনের শিয়রে দাঁড়িয়ে

হাসেন অন্তর্যামী,

হঠাৎ দেন ঠেকিয়ে সোনার কাঠি

প্রিয়ার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি দিয়ে,

কবির গানের সুর দিয়ে,

তখন যে-আমি ধূলিধূসর সামান্য দিনগুলির

মধ্যে মিলিয়ে ছিল,

সে দেখা দেয় এক নিমেষের অসমান্য আলোকে।

সে-সব দুর্মূল্য নিমেষ

কোনো রত্নভাণ্ডারে থেকে যায় কি না জানিনে;

এইটুকু জানি–

তারা এসেছে আমার আত্মবিস্মৃতির মধ্যে,

জাগিয়েছে আমার মর্মে

বিশ্বমর্মের নিত্যকালের সেই বাণী

“আমি আছি।”

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Shiter roddur.
Shona-mesha shobujer dheu
Stombhito hoye achhe shegun bone.
Begni-chhayar chhonwa-laga
Jhuri-nama briddho bot
Dal melechhe rastar opar porjonto.
Pholsagachher jhora pata
Hothat haway chomke beray ure
Dhulor sangat hoye.
Kaj-bhola ei din
Udhao bolakar moto
Lin hoye cholechhe nihshim nilimay.
Jhaugachher mormordhonite mishe
Moner moddhye ei kothati uthchhe beje,
“Ami achhi.”
Kuyotolar kachhe
Shamanno oi amer gachh;
Shara bochhor o thake atmobismrito,
Boner shadaron shobujer aborone
O thake dhaka.
Emon shomoy Magher sheshe
Hothat matir niche
Shikore shikore tar shihor lage,
Shakhay shakhay mukulito hoye othe bani–
“Ami achhi,”
Chondroshurjer alo apon bhashay
Shikar kore tar shei bhasha.
Olosh moner shiyore dariye
Hashen ontorjami,
Hothat den thekiye shonar kathi
Priyar mugdho chokher drishti diye,
Kobir ganer shur diye,
Tokhon je-ami dhulidhushor shamanno dingulir
Moddhye miliye chhilo,
She dekha dey ek nimesher oshomanno aloke.
She-shob durmullo nimesh
Kono rotnobhandare theke jay ki na janine;
Ei-tuku jani–
Tara eshechhe amar atmobismritir moddhye,
Jagiyechhe amar morme
Bisshomormer nittokaler shei bani
“Ami achhi.”

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • শীতের স্তব্ধ নিসর্গ ও অস্তিত্বের অনুরণন:
    “কাজ-ভোলা এই দিন / উধাও বলাকার মতো / লীন হয়ে চলেছে নিঃসীম নীলিমায়। / ঝাউগাছের মর্মরধ্বনিতে মিশে / মনের মধ্যে এই কথাটি উঠছে বেজে, / ‘আমি আছি।'”
    — সেগুনবনের রোদ, বটের ছায়া আর ঝাউগাছের বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি এক পরম বিশ্রামের স্তব্ধতায় ডুবে যায়। সেই বাহ্যিক নীরবতার ভেতরেই কবির অন্তরে প্রবলভাবে বেজে ওঠে অস্তিত্বের মৌলিকতম উপলব্ধি—’আমি আছি’।
  • আমগাছের জাগরণ ও প্রকৃতির স্বীকৃতি:
    “সারা বছর ও থাকে আত্মবিস্মৃত, / … এমন সময় মাঘের শেষে / হঠাৎ মাটির নিচে / শিকড়ে শিকড়ে তার শিহর লাগে, / শাখায় শাখায় মুকুলিত হয়ে ওঠে বাণী– / ‘আমি আছি,'”
    — কুয়োতলার সাধারণ আমগাছটি সারা বছর নিজের বিশেষত্ব ভুলে থাকে। কিন্তু মাঘের শেষে বসন্তের আগমনে মুকুলিত হয়ে সে নিজের অনন্য অস্তিত্ব ঘোষণা করে, আর আকাশ-বাতাসও সেই বাণীর মর্যাদা দেয়।
  • সোনার কাঠির স্পর্শ ও আত্ম-আবিষ্কার:
    “তখন যে-আমি ধূলিধূসর সামান্য দিনগুলির / মধ্যে মিলিয়ে ছিল, / সে দেখা দেয় এক নিমেষের অসমান্য আলোকে। / … জাগিয়েছে আমার মর্মে / বিশ্বমর্মের নিত্যকালের সেই বাণী / ‘আমি আছি।'”
    — প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ধুলায় ঢাকা পড়ে থাকা মানুষের সাধারণ জীবন প্রেমিকার মুগ্ধ দৃষ্টি কিংবা গানের সুরের মতো ‘সোনার কাঠির’ ছোঁয়ায় হঠাৎ দিব্য মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এই ক্ষণিক অনুভূতিই মানুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শাশ্বত অস্তিত্বের সাথে একাত্ম করিয়ে দেয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন