শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের হে যক্ষ সেদিন প্রেম কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৩৯ সংখ্যক কবিতা হলো ‘হে যক্ষ, সেদিন প্রেম’। কালিদাসের অমর সৃষ্টি ‘মেঘদূত’-এর যক্ষ-প্রিয়ার বিরহকে অবলম্বন করে সান্নিধ্যের সংকীর্ণ বলয় থেকে বিরহের মাধ্যমে প্রেমের বিশ্বজনীনতা ও শিল্পে রূপান্তরের যে শাশ্বত দর্শন, তা এ কবিতায় অসাধারণ ভাবগাম্ভীর্যে ধরা পড়েছে।

সেদিন প্রেম কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামহে যক্ষ, সেদিন প্রেম (৩৯ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও ক্লাসিক্যাল বিরহভাবাশ্রিত নন্দনতাত্ত্বিক লিরিক (Aesthetic Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের ভাবাদর্শকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বের আলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এ বর্ণিত অলকা থেকে নির্বাসিত যক্ষের যে বিরহ, তাকে রবীন্দ্রনাথ নিছক শাস্তি হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন এক পরম ‘বর’ হিসেবে। কাছে থাকার অতি-সান্নিধ্যে প্রেম যেখানে আত্মকেন্দ্রিক কুঁড়ির মতো রুদ্ধ থাকে, দূরত্বের বিচ্ছেদে তা পাপড়ি মেলে বিশ্বের প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়। এই বিচ্ছেদের বেদনাতেই গৃহকোণের সাধারণ প্রিয়া রূপান্তরিত হয় চিরন্তন শিল্পের এক শাশ্বত, স্বর্গীয় মূর্তিতে।

সেদিন প্রেম সম্পূর্ণ কবিতা:

হে যক্ষ, সেদিন প্রেম তোমাদের

বৃদ্ধ ছিল আপনাতেই

পদ্মকুঁড়ির মতো।

সেদিন সংকীর্ণ সংসারে

একান্তে ছিল তোমার প্রেয়সী

যুগলের নির্জন উৎসবে,

সে ঢাকা ছিল তোমার আপনাকে দিয়ে,

শ্রাবণের মেঘমালা

যেমন হারিয়ে ফেলে চাঁদকে

আপনারি আলিঙ্গনের

আচ্ছাদনে।

এমন সময়ে প্রভুর শাপ এল

বর হয়ে,

কাছে থাকার বেড়া-জাল গেল ছিঁড়ে।

খুলে গেল প্রেমের আপনাতে-বাঁধা

পাপড়িগুলি,

সে-প্রেম নিজের পূর্ণ রূপের দেখা পেল

বিশ্বের মাঝখানে।

বৃষ্টির জলে ভিজে’ সন্ধ্যাবেলাকার জুঁই

তাকে দিল গন্ধের অঞ্জলি।

রেণুর ভারে মন্থর বাতাস

তাকে জানিয়ে দিল

নীপ-নিকুঞ্জের আকুতি।

সেদিন অশ্রুধৌত সৌম্য বিষাদের

দীক্ষা পেলে তুমি;

নিজের অন্তর-আঙিনায়

গড়ে তুললে অপূর্ব মূর্তিখানি

স্বর্গীয় গরিমায় কান্তিমতী।

যে ছিল নিভৃত ঘরের সঙ্গিনী

তার রসরূপটিকে আসন দিলে

অনন্তের আনন্দমন্দিরে

ছন্দের শঙ্খ বাজিয়ে।

আজ তোমার প্রেম পেয়েছে ভাষা,

আজ তুমি হয়েছ কবি,

ধ্যানোদ্ভবা প্রিয়া

বক্ষ ছেড়ে বসেছে তোমার মর্মতলে

বিরহের বীণা হাতে।

আজ সে তোমার আপন সৃষ্টি

বিশ্বের কাছে উৎসর্গ-করা।

 

সেদিন প্রেম সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

He jokkho, shedin prem tomader
Ruddho chhilo aponatei
Podmokunrir moto.
Shedin shongkirno shongshare
Ekante chhilo tomar preyoshi
Jugoler nirjon utshobe,
She dhaka chhilo tomar aponake diye,
Shraboner meghmala
Jemon hariye phele chandke
Aponari alinggoner
Acchadone.
Emon shomoye probhur shap elo
Bor hoye,
Kachhe thakar bera-jal gelo chhinre.
Khule gelo premer aponate-bandha
Papriguli,
She-prem nijer purno ruper dekha pelo
Bissher majhkhane.
Brishtir jole bhije’ shondhyabelakar jui
Take dilo gondher onjoli.
Renur bhare monthor batash
Take janiye dilo
Nip-nikunjer akuti.
Shedin oshrudhouto shoummo bishader
Dikkha pele tumi;
Nijer ontor-anginay
Gore tulele opurbo murtikhani
Sworgiyo gorimay kantimoti.
Je chhilo nibhrito ghorer shonggini
Tar roshoruptike ashon dile
Ononter anondomondire
Chhongder shongkho bajiye.
Aj tomar prem peyechhe bhasha,
Aj tumi hoyechho kobi,
Dhyanodbhoba priya
Bokkho chhere boshechhe tomar mormotole
Biroher bina hate.
Aj she tomar apon srishti
Bissher kachhe utshorgo-kora.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • সান্নিধ্যের সীমাবদ্ধতা ও মেঘের আচ্ছাদন:
    “সেদিন সংকীর্ণ সংসারে / একান্তে ছিল তোমার প্রেয়সী / যুগলের নির্জন উৎসবে, / সে ঢাকা ছিল তোমার আপনাকে দিয়ে, / শ্রাবণের মেঘমালা / যেমন হারিয়ে ফেলে চাঁদকে / আপনারি আলিঙ্গনের / আচ্ছাদনে।”
    — মিলনের অতি-সান্নিধ্যে প্রেম কেবল নিজেদের মধ্যেই বন্দি থাকে। মেঘ যেমন অতিরিক্ত আলিঙ্গনে চাঁদের কিরণকে ঢেকে ফেলে, তেমনি অহং ও উপস্থিতির বেড়াজালে প্রেমের বিশ্বরূপটি আড়াল হয়ে থাকে।
  • শাপের বর ও প্রেমের প্রস্ফুটন:
    “এমন সময়ে প্রভুর শাপ এল / বর হয়ে, / কাছে থাকার বেড়া-জাল গেল ছিঁড়ে। / খুলে গেল প্রেমের আপনাতে-বাঁধা / পাপড়িগুলি,”
    — কুবেরের নির্বাসন-শাপ যক্ষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল। শারীরিক উপস্থিতির মায়াজাল ছিন্ন হতেই আত্মকেন্দ্রিক কুঁড়িটি পাপড়ি মেলে বিশ্বের আঙিনায় বিকশিত হলো; বৃষ্টির গন্ধ ও কদম্বের ব্যাকুলতা তখন প্রেমিকের অনুভূতির সাথে একাত্ম হয়ে উঠল।
  • বিরহের দীক্ষা ও শিল্পের সৃষ্টি:
    “যে ছিল নিভৃত ঘরের সঙ্গিনী / তার রসরূপটিকে আসন দিলে / অনন্তের আনন্দমন্দিরে / ছন্দের শঙ্খ বাজিয়ে। / আজ তোমার প্রেম পেয়েছে ভাষা, / আজ তুমি হয়েছ কবি,”
    — বিচ্ছেদের পবিত্র বেদনাই যক্ষকে এক প্রেমিক থেকে চিরন্তন স্রষ্টা বা ‘কবি’তে উন্নীত করেছে। রক্তমাংসের সাধারণ ঘরের নারী তখন ধ্যানলব্ধা হয়ে অন্তরের বীণাপাণি রূপ ধারণ করেছে, যা আর কোনো একক ব্যক্তির নয়—বরং সমগ্র বিশ্বের চিরন্তন রসসম্পদ।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (পাঠভেদ সংশোধন: ‘রুদ্ধ ছিল’ অনুসৃত), বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন