শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের বিশ্বলক্ষ্মী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৩২ সংখ্যক কবিতা হলো ‘বিশ্বলক্ষ্মী’। বৈশাখের প্রচণ্ড রৌদ্রতাপ ও শুষ্কতাকে ধরিত্রীর কঠোর তপস্যা হিসেবে অবলোকন করে কীভাবে ত্যাগের দহনে পরিশুদ্ধ হয়ে বর্ষার শ্যামল স্নিগ্ধতায় সৃষ্টির চরম সার্থকতা ও সৌন্দর্য নেমে আসে, তার এক অপূর্ব পৌরাণিক ও রূপকাশ্রিত বন্দনা এ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে।

বিশ্বলক্ষ্মী কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবিশ্বলক্ষ্মী (৩২ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও ঋতু-রূপকাশ্রিত স্তোত্রধর্মী লিরিক (Allegorical Hymn / Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির রুদ্র ও শান্ত রূপের নিগূঢ় দার্শনিক তাৎপর্য উন্মোচন করেছেন। পার্বতীর শিবকে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যার পৌরাণিক রূপকল্পকে কবি এখানে বৈশাখের প্রকৃতির ওপর আরোপ করেছেন। বৈশাখের খরতাপ কোনো বিনাশ নয়; তা প্রকৃতির উপবাস, যা ভোগের সমস্ত স্থূল আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে খাঁটি আত্মত্যাগের হোমাগ্নি জ্বালায়। এই দহন ও তপস্যার মধ্য দিয়েই রুদ্রের কৃপা নেমে আসে মেঘের গর্জনে, আর মরুপ্রায় ধরণী শ্যামল আস্তরণ বিছিয়ে বরণ করে নেয় সুন্দরের করুণ চরণকে।

বিশ্বলক্ষ্মী সম্পূর্ণ কবিতা:

বিশ্ব’লক্ষ্মী,

তুমি একদিন বৈশাখে

বসেছিলে দারুণ তপস্যায়

রুদ্রের চরণতলে।

তোমার তনু হল উপবাসে শীর্ণ,

পিঙ্গল তোমার কেশপাশ।

দিনে দিনে দুঃখকে তুমি দগ্ধ করলে

দুঃখেরি দহনে,

শুষ্ককে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিলে

পূজার পুণ্যধূপে।

কালোকে আলো করলে,

তেজ দিলে নিস্তেজকে,

ভোগের আবর্জনা লুপ্ত হল

ত্যাগের হোমাগ্নিতে।

দিগন্তে রুদ্রের প্রসন্নতা

ঘোষণা করলে মেঘগর্জনে,

অবনত হল দাক্ষিণ্যের মেঘপুঞ্জ

উৎকণ্ঠিতা ধরণীর দিকে।

মরুবক্ষে তৃণরাজি

শ্যাম আস্তরণ দিল পেতে,

সুন্দরের করুণ চরণ

নেমে এল তার ‘পরে।

বিশ্বলক্ষ্মী সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Bishwolokkhi,
Tumi ekdin Boishakhe
Boshechhile darun toposshay
Rudrer choron-tole.
Tomar tonu holo upobashe shirno,
Pinggol tomar kesh-pash.
Dine dine dukkhoke tumi dogdho korle
Dukkheri dohone,
Shushkoke jwaliye bhosmo kore dile
Pujar punyodhupe.
Kaloke alo korle,
Tej dile nistejke,
Bhoger aborjona lupto holo
Tyager homagnite.
Digonte rudrer proshonnota
Ghoshona korle meghgorjone,
Obonoto holo dakhinnyer meghpunjo
Utkonthita dhoronir dike.
Morubokkhe trinoraji
Shyam astoron dilo pete,
Shundorer korun choron
Neme elo tar ‘pore.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • বৈশাখের তপস্যা ও কৃচ্ছ্রসাধন:
    “বিশ্ব’লক্ষ্মী, / তুমি একদিন বৈশাখে / বসেছিলে দারুণ তপস্যায় / রুদ্রের চরণতলে। / তোমার তনু হল উপবাসে শীর্ণ, / পিঙ্গল তোমার কেশপাশ।”
    — বৈশাখের দগ্ধ নিসর্গকে কবি এক তপস্বিনী দেবীরূপে কল্পনা করেছেন। রুদ্র রূপী মহাদেবের কৃপালাভের উদ্দেশ্যে সেই প্রকৃতি উপবাসে শীর্ণা, রুক্ষ ও পিঙ্গল কেশ ধারণ করে নিবিষ্ট সাধনায় রত।
  • দহনে শুচিতা ও ত্যাগের হোমাগ্নি:
    “দিনে দিনে দুঃখকে তুমি দগ্ধ করলে / দুঃখেরি দহনে, / … ভোগের আবর্জনা লুপ্ত হল / ত্যাগের হোমাগ্নিতে।”
    — গ্রীষ্মের তাপ কোনো অভিশাপ নয়, বরং আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। নিজের সমস্ত শুষ্কতাকে পূজার ধূপের মতো জ্বালিয়ে দিয়ে এবং সমস্ত পার্থিব জড়তাকে ত্যাগের আগুনে ভস্মীভূত করে প্রকৃতি অন্তরের খাঁটি জ্যোতিকে জাগিয়ে তোলে।
  • রুদ্রের প্রসন্নতা ও শ্যামল অবতারণা:
    “দিগন্তে রুদ্রের প্রসন্নতা / ঘোষণা করলে মেঘগর্জনে, / … মরুবক্ষে তৃণরাজি / শ্যাম আস্তরণ দিল পেতে, / সুন্দরের করুণ চরণ / নেমে এল তার ‘পরে।”
    — তপস্যা পূর্ণ হলে রুদ্রের প্রসন্নতা নেমে আসে মেঘের গর্জনে ও বারিধারায়। শুষ্ক ধরণী নবীন সবুজ ঘাসের গালিচা পেতে দেয়, আর সেই শ্যামল শয্যার ওপর পরম করুণাময় সৌন্দর্য নেমে এসে বিশ্বচরাচরকে পূর্ণতা দান করে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন