বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর বিরহকাতর ও স্মৃতিমেদুর কবিতা হলো ‘অসম্ভব’। এই কবিতায় শ্রাবণের এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে পুরোনো প্রেমের স্মৃতিচারণ এবং বিচ্ছেদের চিরস্থায়ী রূপটি মেনে নেওয়ার মানসিক টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অসম্ভব |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সানাই |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | বিরহ ও স্মৃতিচারণমূলক রোমান্টিক কবিতা (Romantic and Nostalgic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
অসম্ভব – সম্পূর্ণ কবিতা
পূর্ণ হয়েছে বিচ্ছেদ, যবে ভাবিনু মনে,
একা একা কোথা চলিতেছিলাম নিষ্কারণে।
শ্রাবণের মেঘ কালো হয়ে নামে বনের শিরে,
খর বিদ্যুৎ রাতের বক্ষ দিতেছে চিরে,
দূর হতে শুনি বারুণী নদীর তরল রব–
মন শুধু বলে, অস’ম্ভব এ অস’ম্ভব।
এমনি রাত্রে কতবার, মোর বাহুতে মাথা,
শুনেছিল সে যে কবির ছন্দে কাজরি-গাথা।
রিমিঝিমি ঘন বর্ষণে বন রোমাঞ্চিত,
দেহে আর মনে এক হয়ে গেছে যে-বাঞ্ছিত
এল সেই রাতিবহি শ্রাবণের সে-বৈভব–
মন শুধু বলে, অস’ম্ভব এ অস’ম্ভব।
দূরে চলে যাই নিবিড় রাতের অন্ধকারে,
আকাশের সুর বাজিছে শিরায় বৃষ্টিধারে।
যূথীবন হতে বাতাসেতে আসে সুধার স্বাদ,
বেণীবাঁধনের মালায় পেতেম যে-সংবাদ
এই তো জেগেছে নবমালতীর সে সৌরভ–
মন শুধু বলে, অ’সম্ভব এ অস’ম্ভব।
ভাবনার ভুলে কোথা চলে যাই অন্যমনে
পথসংকেত কত জানায়েছে যে-বাতায়নে।
শুনিতে পেলেম সেতারে বাজিছে সুরের দান
অশ্রুজলের আভাসে জড়িত আমারি গান।
কবিরে ত্যজিয়া রেখেছে কবির এ গৌরব–
মন শুধু বলে, অস’ম্ভব এ অস’ম্ভব।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রকৃতি ও স্মৃতির মেলবন্ধন:
“শ্রাবণের মেঘ কালো হয়ে নামে বনের শিরে… এমনি রাত্রে কতবার, মোর বাহুতে মাথা, / শুনেছিল সে যে কবির ছন্দে কাজরি-গাথা।”— শ্রাবণের দুর্যোগপূর্ণ রাতে মেঘ, বিদ্যুৎ ও বৃষ্টির শব্দ কবির মনে পুরোনো দিনের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। ঠিক এমনই বর্ষণমুখর রাতে প্রিয়তমা তাঁর বাহুতে মাথা রেখে একসময় গান শুনত। বাইরের প্রকৃতির এই রুদ্র অথচ রোমান্টিক রূপ কবির অন্তরের একাকীত্বকে আরও গাঢ় করে।
- বিচ্ছেদের তীব্র বেদনা ও অবিশ্বাস:
“পূর্ণ হয়েছে বিচ্ছেদ, যবে ভাবিনু মনে… মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।”— যুক্তিবাদী মন জানে যে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃতির পুরোনো রূপ ও ফুলের সুবাস (নবমালতীর সৌরভ) পেয়ে অবচেতন হৃদয় কিছুতেই সেই বিচ্ছেদ মেনে নিতে চায় না। হৃদয়ের কাছে এই দূরত্ব যেন এক অবিশ্বাস্য ও ‘অসম্ভব’ ঘটনা।
- হারানো প্রেমের অমরত্ব:
“শুনিতে পেলেম সেতারে বাজিছে সুরের দান / অশ্রুজলের আভাসে জড়িত আমারি গান। / কবিরে ত্যজিয়া রেখেছে কবির এ গৌরব–“— আপনমনে পথ চলতে চলতে কবি একসময় প্রিয়তমার জানালার (বাতায়ন) নিচে এসে পৌঁছান। সেখানে তিনি শুনতে পান, প্রিয়তমা তাঁকেই ছেড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু কবির রচিত অশ্রুভেজা গান সে এখনো সেতারে বাজাচ্ছে। প্রিয় মানুষের এই স্মৃতিটুকুই কবির জীবনে ফেলে যাওয়া এক বিষাদময় গৌরব।
