বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের পড়ন্ত বেলায় রচিত ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত মিষ্টি, রোমান্টিক ও ঘরোয়া কবিতা হলো ‘নামকরণ’। এই কবিতায় প্রথাগত ব্যাকরণ ও অভিধানের বাইরে গিয়ে একান্ত ভালোবেসে প্রিয় মানুষের একটি নতুন নাম রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রেমের সম্পর্কে প্রথাগত বা কেতাবি ভাষার চেয়ে যে দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত ও স্বতঃস্ফূর্ত ডাক বেশি দামি, সেটিই এই কবিতার মূল সুর।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামনামকরণ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক ও গীতি-কবিতা (Romantic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট আনন্দ, প্রেম ও স্মৃতির ছবি পরম মমতায় এঁকেছেন। ‘নামকরণ’ কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার একটি মিষ্টি ও একান্ত ব্যক্তিগত নাম রাখার কথা বলেছেন। বর্ষার দিনে প্রিয়তমা নিভৃতে বসে পশমের জামা বোনেন আর নীরবে কবির লেখা শোনেন। যেহেতু তিনি কবির কথা মন দিয়ে শোনেন, তাই কবি আদর করে তাঁর নাম দিয়েছেন ‘শোনামণি’। এই নাম পণ্ডিতদের নিয়মে তৈরি নয়, বা এর কোনো অর্থ অভিধানে পাওয়া যাবে না। এটি কেবলই কবির প্রাণের ভাষা। যখন কবি এই নামে ডাকেন, তখন প্রিয়তমার হাতের কাজ থেমে যায়, তাঁর হাতের কাঁকন বেজে ওঠে এবং দুজনের হাসির মাধ্যমে তাদের ভালোবাসার নীরব বোঝাপড়াটি সার্থক হয়ে ওঠে।

নামকরণ – সম্পূর্ণ কবিতা

বাদলবেলায় গৃহকোণে

রেশমে পশমে জামা বোনে,

নীরবে আমার লেখা শোনে,

      তাই সে আমার শোনামণি।

প্রচলিত ডাক নয় এ যে

দরদীর মুখে ওঠে বেজে,

পন্ডিতে দেয় নাই মেজে–

      প্রাণের ভাষাই এর খনি।

সেও জানে আর জানি আমি

এ মোর নেহাত পাগলামি–

ডাক শুনে কাজ যায় থামি,

     কঙ্কণ ওঠে কনকনি।

সে হাসে, আমিও তাই হাসি–

      জবাবে ঘটে না কোনো বাধা।

অভিধান-বর্জিত ব’লে

      মানে আমাদের কাছে সাদা।

      কেহ নাহি জানে কোন্‌ খনে

                পশমের শিল্পের সাথে

সুকুমার হাতের নাচনে

      নূতন নামের ধ্বনি গাঁথে

                শোনামণি, ওগো সুনয়নী।

Romanized Version

Badolbelay grihokone
Reshome poshome jama bone,
Nirobe amar lekha shone,
Tai she amar shonamoni.
Procholito dak noy e je
Dorodir mukhe othe beje,
Pondite dey nai meje–
Praner bhashai er khoni.
Sheo jane ar jani ami
E mor nehat paglami–
Dak shune kaj jay thami,
Konkon othe konokoni.
She hashe, amio tai hashi–
Jobabe ghote na kono badha.
Obhidhan-borjito bo’le
Mane amader kachhe shada.
Keho nahi jane kon khone
Poshomer shilper shathe
Shukumar hater nachone
Nuton namer dhwoni gnathe
Shonamoni, ogo shunoyoni.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ভালোবাসার একান্ত ব্যক্তিগত ভাষা:
“নীরবে আমার লেখা শোনে, / তাই সে আমার শোনামণি। / প্রচলিত ডাক নয় এ যে… পন্ডিতে দেয় নাই মেজে–“
— বর্ষার দিনে প্রিয়তমা যখন উল বোনে আর মনোযোগ দিয়ে কবির লেখা শোনে, তখন কবি আদর করে তাকে ‘শোনামণি’ বলে ডাকেন। এই নাম সমাজের আর দশটা প্রচলিত ডাকের মতো নয় এবং পণ্ডিতেরা কোনো ব্যাকরণ দিয়ে এটি তৈরি করেননি। এটি কেবলই কবির ভালোবাসার (দরদীর) মুখ থেকে উচ্চারিত প্রাণের নিজস্ব ভাষা।
  • প্রেমের পাগলামি ও নীরব বোঝাপড়া:
“সেও জানে আর জানি আমি / এ মোর নেহাত পাগলামি– / ডাক শুনে কাজ যায় থামি, / কঙ্কণ ওঠে কনকনি।”
— কবি জানেন যে তাঁর এই নামকরণ এক ধরনের মিষ্টি পাগলামি, এবং তাঁর প্রিয়তমাও তা বোঝেন। কিন্তু যখনই কবি তাঁকে এই অদ্ভুত নামে ডাকেন, প্রিয়তমার হাতের কাজ থেমে যায় এবং হাতের কাঁকনে (কঙ্কণ) খুশির রিনঝিন শব্দ বেজে ওঠে। দুজনের হাসির মাঝ দিয়ে তাদের এই নীরব সম্মতির কোনো বাধাই আর থাকে না।
  • অভিধানহীন নামের সার্থকতা:
“অভিধান-বর্জিত ব’লে / মানে আমাদের কাছে সাদা। … সুকুমার হাতের নাচনে / নূতন নামের ধ্বনি গাঁথে”
— ‘শোনামণি’ নামের অর্থ কোনো ডিকশনারি বা অভিধানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে এর অর্থ একদম জলের মতো পরিষ্কার (সাদা)। সুন্দর হাতে (সুকুমার হাত) পশম বোনার শিল্পের মতোই কবির এই প্রিয়তমা যেন অজান্তেই কবির দেওয়া এই নতুন নামের ধ্বনি নিজের জীবনের সাথে পরম আনন্দে গেঁথে নিয়েছেন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সানাই কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে যাচাই করে আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্র্যাকেটগুলো পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন