আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘সোনার তরী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৩/১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের নামাঙ্কিত ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকধর্মী, দার্শনিক ও কালজয়ী কবিতা হলো ‘সোনার তরী’। এই কবিতায় মানবজীবনের কর্মফল, মর্ত্যধূলির অর্জন, কালের অন্তহীন স্রোত এবং মৃত্যুর পর মহাকালের নৌকায় কেবল মানুষের সাধনার ফসল বা কর্মটুকু টিকে থাকার এক অপূর্ব ও মর্মস্পর্শী রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসোনার তরী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের বছর১৮৯৩ (প্রথম প্রকাশ ও কাব্যগ্রন্থের নামকরণ)
কবিতার ধরনরূপকধর্মী, দার্শনিক ও প্রতীকী গীতি-কবিতা (Symbolic, Philosophical and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৩ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের এই কেন্দ্রীয় কবিতাটি রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যতম গভীর এক সৃষ্টি। পদ্মার বুকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে কবির মনে এই রূপকটি এসেছিল। ক্ষুরধারার নদী, কূলে একা দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ মানুষ, ছোট এক টুকরো ক্ষেত আর কেটে রাখা সোনার ধান—এসবকিছুর মধ্য দিয়ে মানবজীবনের চিরন্তন সত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানুষ সারাজীবন ধরে যা কিছু অর্জন করে, মহাকালের সেই সোনার তরী কেবল তার সৃষ্টিকর্ম বা ধানটুকুই তুলে নেয়, আর মানুষকে শূন্য নদীর তীরে একা পড়ে থাকতে হয়।

সোনার তরী কবিতা (সম্পূর্ণ)

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে’ আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হ’ল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোন দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙ্গে দু’ধারে,
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে!

ওগো তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে!
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে!
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুসি তারে দাও
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে!

যত চাও তত লও তরণী পরে।
আর আছে?—আর নাই, দিয়েছি ভরে’।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে’
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে’!

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছােট সে তরী
আমারি সােনার ধানে গিয়েছে ভরি’।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি’,
যাহা ছিল নিয়ে গেল সােনার তরী।

সোনার তরী কবিতার Romanized Version:

Gogone goroje megh, ghono borsha.
Kule eka bose’ achhi, nahi vorsha.
Rashi rashi bhara bhara
Dhan kata ho’lo shara,
Vora nodi khurdhara
Khor-porosha.
Katite katite dhan elo borsha.
Ekhani chhoto khet ami ekela,
Charidike baka jol koriche khela.
Porapare dekhi anka
Toruchhayamoshimakha
Gramkhani meghe dhaka
Probhat bela.
E parete chhoto khet ami ekela.
Gan geye tori beye ke ashe pare!
Dekhe’ jeno mone hoy chini uhare.
Vora-pale chole jay,
Kon dike nahi chay,
Dheuguli nirupay
Bhange du’dhare,
Dekhe’ jeno mone hoy chini uhare!
Ogo tumi kotha jao kon bideshe!
Barek virao tori kulete ese!
Jeyo jetha jete chao,
Yare khushi tare dao
Shudhu tumi niye jao
Khonik hese
Amar shonar dhan kulete ese!
Joto chao toto loho toroni pore.
Ar ache?—ar nai, diyechhi bhore’.
Etokal nodikule
Jaha loye chinu bhule’
Shokoli dilam tule
Thore bithore
Ekhon amare loho koruna kore’!
Thai nai, thai nai! Chhoto se tori
Amari shonar dhane giyeche vori’.
Shrabon gogon ghire
Ghono megh ghure fire,
Shunyo nodir tire
Rohinu pori’,
Jaha chhilo niye gelo shonar tori.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রকৃতির পটভূমি ও নিঃসঙ্গতা: শ্রাবণের ঘন বর্ষা, গগনে গর্জনশীল মেঘ আর ক্ষুরধারার নদী—এই প্রকৃতির মাঝে মানুষ তার জীবনের ছোট ক্ষেতে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
  • সোনার ধানের রূপক: জীবনের সারাৎসারে অর্জিত ফসল বা কর্মফল হলো ‘সোনার ধান’। মানুষ সারাজীবন ধরে কেবল সেই ফসলই উৎপাদন করে।
  • মহাকালের তরী ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি: মহাকালের প্রতীক সেই সোনার তরী পারাপার করলেও সে কেবল মানুষের সৃষ্টি বা কর্মটুকুই গ্রহণ করে (ধান নেয়), মানুষকে বা তার অহংকারকে ঠাঁই দেয় না। তরী বোঝাই হয়ে যাওয়ার পর মানুষকে শূন্য নদীর তীরে একা পড়ে থাকতে হয়—এটাই মানবজীবনের চরম দার্শনিক সত্য।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত