সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের যেতে নাহি দিব কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও দার্শনিক আবেদনসমৃদ্ধ কবিতা হলো ‘যেতে নাহি দিব’। এই কবিতায় এক চিরন্তন বিচ্ছেদবেদনা এবং মহাকালের অনিবার্য নিয়মের বিরুদ্ধে মানুষের স্নেহ-প্রেমের নিরন্তর কিন্তু ব্যর্থ প্রতিবাদের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। সামান্য একটি পারিবারিক বিদায়দৃশ্য কীভাবে এক গভীর বৈশ্বিক ও দার্শনিক সত্যে রূপান্তরিত হয়, তারই এক অপূর্ব নিদর্শন এই কবিতা।
কবিতার মূল তথ্য:
বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামযেতে নাহি দিব
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের বছর১৮৯৪ (১৩০১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও গীতিময় শোকগাথা (Philosophical and Lyrical Poem)
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
‘সোনার তরী’ পর্বে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় রোমান্টিক বিষাদ এবং প্রকৃতির সাথে মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়। পূজার ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার এক আটপৌরে ও সাধারণ বিদায়দৃশ্যকে কেন্দ্র করে এই কবিতার সূচনা। বিদায়বেলায় চার বছরের শিশুকন্যার “যেতে আমি দিব না তোমায়” এই সরল ও অবুঝ উক্তিটি কবির মনে এক বৃহত্তর দার্শনিক ভাবনার জন্ম দেয়। কবি অনুভব করেন, শুধু তাঁর কন্যাই নয়, সমগ্র বিশ্বচরাচরেই এই একই বিচ্ছেদবেদনা ও চিরন্তন ক্রন্দন প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে।

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের যেতে নাহি দিব কবিতা

যেতে নাহি দিব

 দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর;

         হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর।

          জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায়

          মধ্যাহ্ন-বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায়

          ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি

          ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী রাতি

          ঝাঁ ঝাঁ করে চারি দিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম–

          শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।

          গিয়েছে আশ্বিন– পূজার ছুটির শেষে

          ফিরে যেতে হবে আজি বহুদূরদেশে

          সেই কর্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে

          বাঁধিছে জিনিসপত্র দড়াদড়ি লয়ে,

          হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এ-ঘরে ও-ঘরে।

          ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে,

          ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার,

          তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার

          একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে

          ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে

          যত বাড়ে বোঝা। আমি বলি, “এ কী কাণ্ড!

          এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড

          বোতল বিছানা বাক্স  রাজ্যের বোঝাই

          কী করিব লয়ে  কিছু এর রেখে যাই

          কিছু লই সাথে।’

                          সে কথায় কর্ণপাত

          নাহি করে কোনো জন। “কী জানি দৈবাৎ

          এটা ওটা আবশ্যক যদি হয় শেষে

          তখন কোথায় পাবে বিভুঁই বিদেশে?

          সোনামুগ সরু চাল সুপারি ও পান;

         ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই-চারিখান

          গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল;

           দুই ভাণ্ড ভালো রাই-সরিষার তেল;

           আমসত্ত্ব আমচুর; সের দুই দুধ–

           এই-সব শিশি কৌটা ওষুধবিষুধ।

           মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে,

           মাথা খাও, ভুলিয়ো না, খেয়ো মনে করে।’

           বুঝিনু যুক্তির কথা বৃথা বাক্যব্যয়।

           বোঝাই হইল উঁচু পর্বতের ন্যায়।

           তাকানু ঘড়ির পানে, তার পরে ফিরে

           চাহিনু প্রিয়ার মুখে; কহিলাম ধীরে,

           “তবে আসি’। অমনি ফিরায়ে মুখখানি

            নতশিরে চক্ষু-‘পরে বস্ত্রাঞ্চল টানি

            অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন।

            বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন

            কন্যা মোর চারি বছরের। এতক্ষণ

            অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন,

            দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা

            মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা

            দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায়

            নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায়

            ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁষে,

            চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্নিমেষে

            বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্তদেহে এবে

            বাহিরের দ্বারপ্রান্তে কী জানি কী ভেবে

            চুপিচাপি বসে ছিল। কহিনু যখন

            “মা গো, আসি’ সে কহিল বিষণ্ণ-নয়ন

            ম্লান মুখে, “যেতে আমি দিব না তোমায়।’

            যেখানে আছিল বসে রহিল সেথায়,

            ধরিল না বাহু মোর, রুধিল না দ্বার,

            শুধু নিজ হৃদয়ের স্নেহ-অধিকার

            প্রচারিল–“যেতে আমি দিব না তোমায়’।

            তবুও সময় হল শেষ, তবু হায়

            যেতে দিতে হল।

                                ওরে মোর মূঢ় মেয়ে,

            কে রে তুই, কোথা হতে কী শকতি পেয়ে

            কহিলি এমন কথা, এত স্পর্ধাভরে–

            “যেতে আমি দিব না তোমায়’? চরাচরে

            কাহারে রাখিবি ধরে দুটি ছোটো হাতে

            গরবিনী, সংগ্রাম করিবি কার সাথে

            বসি গৃহদ্বারপ্রান্তে শ্রান্ত ক্ষুদ্র দেহ

            শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ।

            ব্যথিত হৃদয় হতে বহু ভয়ে লাজে

            মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে

            এ জগতে, শুধু বলে রাখা “যেতে দিতে

            ইচ্ছা নাহি’। হেন কথা কে পারে বলিতে

            “যেতে নাহি দিব’! শুনি তোর শিশুমুখে

            স্নেহের প্রবল গর্ববাণী, সকৌতুকে

            হাসিয়া সংসার টেনে নিয়ে গেল মোরে,

            তুই শুধু পরাভূত চোখে জল ভ’রে

            দুয়ারে রহিলি বসে ছবির মতন,

            আমি দেখে চলে এনু মুছিয়া নয়ন।

             চলিতে চলিতে পথে হেরি দুই ধারে

             শরতের শস্যক্ষেত্র নত শস্যভারে

             রৌদ্র পোহাইছে। তরুশ্রেণী উদাসীন

             রাজপথপাশে, চেয়ে আছে সারাদিন

             আপন ছায়ার পানে। বহে খরবেগ

             শরতের ভরা গঙ্গা। শুভ্র খণ্ডমেঘ

             মাতৃদুগ্ধ পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত

             সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মতো

             নীলাম্বরে শুয়ে। দীপ্ত রৌদ্রে অনাবৃত

             যুগ-যুগান্তরক্লান্ত দিগন্তবিস্তৃত

             ধরণীর পানে চেয়ে ফেলিনু নিশ্বাস।

              কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ,

              সমস্ত পৃথিবী। চলিতেছি যতদূর

              শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর

              “যেতে আমি দিব না তোমায়’। ধরণীর

              প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্বপ্রান্ততীর

              ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে,

              “যেতে নাহি দিব। যেতে নাহি দিব।’ সবে

               কহে “যেতে নাহি দিব’। তৃণ ক্ষুদ্র অতি

               তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী

               কহিছেন প্রাণপণে “যেতে নাহি দিব’।

               আয়ুক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব-নিব,

               আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে

               কহিতেছে শত বার “যেতে দিব না রে’।

               এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে

                সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে

                গভীর ক্রন্দন–“যেতে নাহি দিব’।   হায়,

                তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।

                চলিতেছে এমনি অনাদি কাল হতে।

                প্রলয়সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে

                প্রসারিত-ব্যগ্র-বাহু জ্বলন্ত-আঁখিতে

                “দিব না দিব না যেতে’ ডাকিতে ডাকিতে

                হু হু করে তীব্রবেগে চলে যায় সবে

                পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত কলরবে।

                সম্মুখ-ঊর্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ

                “দিব না দিব না যেতে’– নাহি শুনে কেউ

                নাহি কোনো সাড়া।

                                   চারি দিক হতে আজি

                 অবিশ্রাম কর্ণে মোর উঠিতেছে বাজি

                 সেই বিশ্ব-মর্মভেদী করুণ ক্রন্দন

                 মোর কন্যাকণ্ঠস্বরে; শিশুর মতন

                 বিশ্বের অবোধ বাণী। চিরকাল ধরে

                 যাহা পায় তাই সে হারায়, তবু তো রে

                 শিথিল হল না মুষ্টি, তবু অবিরত

                 সেই চারি বৎসরের কন্যাটির মতো

                 অক্ষুণ্ন প্রেমের গর্বে কহিছে সে ডাকি

                 “যেতে নাহি দিব’। ম্লান মুখ, অশ্রু-আঁখি,

                 দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে টুটিছে গরব,

                 তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব,

                 তবু বিদ্রোহের ভাবে রুদ্ধ কণ্ঠে কয়

                 “যেতে নাহি দিব’। যত বার পরাজয়

               তত বার কহে, “আমি ভালোবাসি যারে

                 সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।

                 আমার আকাঙক্ষা-সম এমন আকুল,

                 এমন সকল-বাড়া, এমন অকূল,

                 এমন প্রবল বিশ্বে কিছু আছে আর!’

                 এত বলি দর্পভরে করে সে প্রচার

                 “যেতে নাহি দিব’। তখনি দেখিতে পায়,

                 শুষ্ক তুচ্ছ ধূলি-সম উড়ে চলে যায়

                 একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন;

                 অশ্রুজলে ভেসে যায় দুইটি নয়ন,

                 ছিন্নমূল তরু-সম পড়ে পৃথ্বীতলে

                 হতগর্ব নতশির। তবু প্রেম বলে,

                 “সত্যভঙ্গ হবে না বিধির। আমি তাঁর

                 পেয়েছি স্বাক্ষর-দেওয়া মহা অঙ্গীকার

                 চির-অধিকার-লিপি।’– তাই স্ফীত বুকে

                 সর্বশক্তি মরণের মুখের সম্মুখে

                 দাঁড়াইয়া সুকুমার ক্ষীণ তনুলতা

                 বলে, “মৃত্যু তুমি নাই।– হেন গর্বকথা!

                 মৃত্যু হাসে বসি। মরণপীড়িত সেই

                 চিরজীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই

                 অনন্ত সংসার, বিষণ্ণ নয়ন-‘পরে

                 অশ্রুবাষ্প-সম, ব্যাকুল আশঙ্কাভরে

                 চির-কম্পমান। আশাহীন শ্রান্ত আশা

                 টানিয়া রেখেছে এক বিষাদ-কুয়াশা

                 বিশ্বময়। আজি যেন পড়িছে নয়নে–

                 দুখানি অবোধ বাহু বিফল বাঁধনে

                 জড়ায়ে পড়িয়া আছে নিখিলেরে ঘিরে,

                 স্তব্ধ সকাতর। চঞ্চল স্রোতের নীরে

                 পড়ে আছে একখানি অচঞ্চল ছায়া–

                 অশ্রুবৃষ্টিভরা কোন্‌ মেঘের সে মায়া।

               তাই আজি শুনিতেছি তরুরক মর্মরে

                 এত ব্যাকুলতা; অলস ঔদাস্যভরে

                 মধ্যাহ্নের তপ্ত বায়ু মিছে খেলা করে

                 শুষ্ক পত্র লয়ে; বেলা ধীরে যায় চলে

                 ছায়া দীর্ঘতর করি অশত্থের তলে।

                 মেঠো সুরে কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি

                 বিশ্বের প্রান্তর-মাঝে; শুনিয়া উদাসী

                 বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে

                 দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে

                 একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল

                 বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল

                 দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী।

                 দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি

                 সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্মাহত

                 মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মতো।

যেতে নাহি দিব Romanized Version:

Duare prostut gari; bela dwiprohor;
Hemonter roudro krome hoteche prokhor.
Jonoshunno pollipothe dhuli ure jay
Modhyahno-batashe; snigdho oshotther chay
Klanto briddha vikhirini jirno bostro pati
Ghumaye poreche; jeno roudromoyi rati
Jha jha kore chari dike nistobdho nishjhum–
Shudhu mor ghore nahi bishramer ghum.
Giyeche ashwin– pujar chhutir sheshe
Phire jete hobe aji bohudurdeshe
Shei kormosthane. Bhrittyogon byasto hoye
Bandhiche jinishpotro doradori loye,
Hakahaki dakadaki e-ghore o-ghore.
Ghorer grihini, chokkhu cholochol kore,
Byathiche bokkher kachhe pashaner bhar,
Tobuo shomoy tar nahi kandibar
Ekdondo tore; bidayer ayojone
Byasto hoye phire; joshestho na hoy mone
Joto bare bojha. Ami boli, “E ki kando!
Eto ghot eto pot hari shora bhandho
Botol bichhana baksho rajyer bozhai
Ki koribo loye kichhu er rekhe jai
Kichhu loi shathe.’
She kothay kornopat
Nahi kore kono jon. “Ki jani doibat
Eta ota aboshshok jodi hoy sheshe
Tokhon kothay pabe bibhui bideshe?
Shonamug shoru chal shupari o pan;
O harite dhaka achhe dui-charikhan
Gurer patali; kichhu jhuna narikel;
Dui bhandho bhalo rai-shorishar tel;
Amshotto amchur; sher dui dudh–
Ei-shob shishi kouta oshudhbishudh.
Mishtanno rohilo kichhu harir bhitore,
Matha khao, bhuliyo na, kheyo mone kore.’
Bujhinu juktir kotha britha bakyobyoy.
Bozhai hoilo uchu porboter nyay.
Takanu ghorir pane, tar pore phire
Chahinu priyar mukhe; kohilam dhire,
“Tobe ashi’. Omoni phiraye mukhokhani
Notoshire chokkhu-‘pore bostranchol tani
Omongol oshrujol korilo gopon.
Bahire dwarer kachhe boshi onyomon
Konya mor chari bochhorer. Etokkhon
Onyo dine hoye jeto snan shomopon,
Duti onno mukhe na tulite ankhipata
Mudiya ashito ghume; aji tar mata
Dekhe nai tare; eto bela hoye jay
Nai snanahar. Etokkhon chhayapray
Phiritechhilo she mor kachhe kachhe gheshe,
Chahiya dekhitechhilo mouno nirnimeshe
Bidayer ayojon. Srantodehe ebe
Bahirer dwarprante ki jani ki bhebe
Chupichapi boshe chhilo. Kohinu jokhon
“Ma go, ashi’ she kohilo bishonno-noyon
Mlan mukhe, “Jete ami dibo na tomay.’
Jekhane achhilo boshe rohilo shethay,
Dhorilo na bahu mor, rudhilo na dwar,
Shudhu nijo hridoyer sneho-odhikar
Procharilo–“Jete ami dibo na tomay’.
Tobuo shomoy holo shesh, tobu hay
Jete dite holo.
Ore mor murho meye,
Ke re tui, kotha hote ki shokoti peye
Kohili emon kotha, eto spordhabhore–
“Jete ami dibo na tomay’? Chorachore
Kahare rakhibi dhore duti chhoto hate
Gorobini, shongram koribi kar shathe
Boshi grihodwarprante sranto khudro deho
Shudhu loye oituku buk-bhora sneho.
Byathito hridoy hote bohu bhoye laje
Mormer prarthona shudhu byakto kora shaje
E jogote, shudhu bole rakha “Jete dite
Ichchha nahi’. Heno kotha ke pare bolite
“Jete nahi dibo’! Shuni tor shishumukhe
Sneher probolo gorbobani, shokoutuke
Hashiya shongshar tene niye gelo more,
Tui shudhu porabhuto chokhe jol bhore
Duare rohili boshe chhobir moton,
Ami dekhe chole enu muchhiya noyon.
Cholite cholite pothe heri dui dhare
Shoroter shoshyokkhetro noto shoshyobhare
Roudro pohaiche. Torushreni udashin
Rajpoth-pashe, cheye achhe sharadin
Apon chhayar pane. Bohe khorobeg
Shoroter bhora gonga. Shubhro khondomegh
Matridugdho poritripto shukhonidraroto
Sodyojato shukumar gobotser moto
Nilambore shuye. Dipto roudre onabrito
Jugo-jugantor-klanto digontobistrito
Dhoronir pane cheye phelinu nishshas.
Ki gobhir dukkhe mogno shomosto akash,
Shomosto prithibi. Cholitechi jotodur
Shunitechi ekmatro mormantiko shur
“Jete ami dibo na tomay’. Dhoronir
Pranto hote nilabhrer sorboprantotir
Dhwoniteche chirokal onadyonto robe,
“Jete nahi dibo. Jete nahi dibo.’ Shobe
Kohe “Jete nahi dibo’. Trino khudro oti
Tareo bandhiya bokkhe mata boshumoti
Kohichen pranpone “Jete nahi dibo’.
Ayukkhin dipmukhe shikha nibo-nibo,
Andharer grash hote ke taniche tare
Kohiteche shoto bar “Jete dibo na re’.
E ononto chorachore sworgomorto cheye
Shob cheye puraton kotha, shob cheye
Gobhir krondon–“Jete nahi dibo’. Hay,
Tobu jete dite hoy, tobu chole jay.
Cholitheche emni onadi kal hote.
Proloyshomudrobahi srijoner srote
Prosharito-byagro-bahu jwolonto-ankhite
“Dibo na dibo na jete’ dakite dakite
Hu hu kore tibrobege chole jay shobe
Purno kori bishwotot arto kolorobe.
Shommukh-urmire dake poshchater dheu
“Dibo na dibo na jete’– nahi shune keu
Nahi kono shara.
Chari dik hote aji
Obishram korne mor uthiteche baji
Shei bishwo-mormobhedi koruno krondon
Mor konyakonthoswore; shishur moton
Bishwer obodh bani. Chirokal dhore
Jaha pay tai she haray, tobu to re
Shithil holo na mushti, tobu obiroto
Shei chari botsorer konyatir moto
Okhunno premer gorbe kohiche she daki
“Jete nahi dibo’. Mlan mukh, oshru-ankhi,
Donde donde pole pole tutiche gorob,
Tobu prem kichhute na mane porabhob,
Tobu bidroher bhabe ruddho konthe koy
“Jete nahi dibo’. Joto bar porajoy
Toto bar kohe, “Ami bhalobashi jare
She ki kobhu ama hote dure jete pare.
Amar akankha-shomo emon akul,
Emon shokol-bara, emon okul,
Emon probol bishwe kichhu ache ar!’
Eto boli dorpobhore kore she prochar
“Jete nahi dibo’. Tokhoni dekhite pay,
Shushko tuchchho dhuli-shomo ure chole jay
Ekti nishshashe tar adorer dhon;
Oshrujole bheshe jay duiti noyon,
Chhinnomul toru-shomo pore prithwitole
Hotogorbo notoshir. Tobu prem bole,
“Shotyobhongo hobe na bidhir. Ami Tanr
Peyechi shakkhor-dewa moha ongikar
Chiro-odhikar-lipi.’– tai sphito buke
Sorboshokti moroner mukher shommukhe
Daraiya shukumar kheen tonulota
Bole, “Mrityu tumi nai.’– Heno gorbokotha!
Mrityu hashe boshi. Moronpirito shei
Chirojibi prem achhonno koreche ei
Ononto shongshar, bishonno noyon-‘pore
Oshrubashpo-shomo, byakul ashongkabhore
Chiro-kompoman. Ashahin sranto asha
Taniya rekheche ek bishad-kuyasha
Bishwomoy. Aji jeno poriche noyone–
Dukhani obodh bahu biphol bandhone
Joraye poriya ache nikhilere ghire,
Stobdho shokator. Chonchol sroter nire
Pore ache ekkhani ochonchol chhaya–
Oshrubrishtibhora kon megher she maya.
Tai aji shunitechi torur mormore
Eto byakulota; olosh oudashyobhore
Modhyahner topto bayu michhe khela kore
Shushko potro loye; bela dhire jay chole
Chhaya dirghotoro kori oshotther tole.
Metho shure kande jeno ononter banshi
Bishwer prantor-majhe; shuniya udashi
Boshundhora boshiya achhen elochule
Durbaypi shoshyokkhetre jahnobir kule
Ekkhani roudropito hironyo-onchol
Bokkhe tani diya; sthiro noyonjugol
Dur nilambore mogno; mukhe nahi bani.
Dekhilam Tanr shei mlan mukhokhani
Shei dwarprante lin, stobdho mormohoto
Mor chari botshorer konyatir moto.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
  • অবুঝ স্নেহের অধিকারবোধ:
    “মা গো, আসি’ সে কহিল বিষণ্ণ-নয়ন / ম্লান মুখে, ‘যেতে আমি দিব না তোমায়।'”
    — কন্যা তার বাবাকে আটকাতে না পারলেও নিজের হৃদয়ের স্নেহের জোরে এক গভীর অধিকারবোধ প্রকাশ করেছে। এই উক্তিটি মূলত প্রেমের এক সর্বজনীন রূপ, যা প্রিয়জনকে কখনোই হারাতে চায় না।
  • মহাকাল ও নিয়মের কাছে প্রেমের পরাজয়:
    “তখনি দেখিতে পায়, / শুষ্ক তুচ্ছ ধূলি-সম উড়ে চলে যায় / একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন;”
    — প্রেমের প্রবল দাবি এবং অধিকারবোধ থাকা সত্ত্বেও মহাকালের অমোঘ নিয়মে সবকিছুই হারিয়ে যায়। সময় এবং নিয়মের কাছে মানুষের চিরন্তন স্নেহ বারবার পরাজিত হয়।
  • বিশ্বপ্রকৃতির শাশ্বত ক্রন্দন:
    “এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে / সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে / গভীর ক্রন্দন–‘যেতে নাহি দিব’।”
    — কবি এখানে তাঁর কন্যার ব্যক্তিগত কান্নার মাঝে বিশ্বপ্রকৃতির এক চিরন্তন রূপ দেখতে পেয়েছেন। ধরণী তার প্রতিটি তৃণলতাকে, এমনকি আলোও তার শিখাকে আঁধারের গ্রাস থেকে বাঁচাতে প্রতিনিয়ত বলছে—”যেতে নাহি দিব।” তবুও বিচ্ছেদ অনিবার্য।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন