বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর মননশীল, প্রতীকী ও আত্মবিশ্লেষণমূলক কবিতা হলো ‘তুলনায় সমালোচনা’। এই কবিতায় প্রকৃতির দুই ভিন্ন রূপ—কোমল ফুল ও কণ্টকপূর্ণ বা রুক্ষ উপাদানের পারস্পরিক তুলনার মাধ্যমে বাহ্যিক সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়ী বিলাস বনাম কাঠিন্য, স্থায়িত্ব এবং জীবনের আসল মূল্যের এক দার্শনিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | তুলনায় সমালোচনা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সোনার তরী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মননশীল, প্রতীকী ও দার্শনিক গীতি-কবিতা (Contemplative, Symbolic and Philosophical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে কবির অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মমূল্যায়নের এক সার্থক রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ‘তুলনায় সমালোচনা’ কবিতায় কণ্টক (কাঁটা) এবং কুসুম বা ফুলের কথোপকথন ও তুলনার ছলে মানবজীবনের দুটি বিপরীত প্রবৃত্তি উপস্থাপিত হয়েছে। একদিকে যেমন রয়েছে ফুল, যা কোমল, বিলাসী, ক্ষণস্থায়ী, সৌন্দর্যের পূজারি এবং চারপাশের মৌমাছি ও বাতাসের প্রেমে মত্ত; অন্যদিকে রয়েছে কাঁটা বা রুক্ষ সত্তা, যা নগ্ন, একা, কঠোর এবং ঝড়ের দিনেও অটল। বাহ্যিক জাঁকজমক ও ক্ষণিকের আদর-সোহাগের চেয়ে আত্মিক দৃঢ়তা এবং কঠিন বাস্তবতার দীর্ঘস্থায়ী মূল্য যে অনেক বেশি, এই কবিতায় তা অত্যন্ত সুকৌশলে প্রতিভাত হয়েছে।
তুলনায় সমালোচনা কবিতা (সম্পূর্ণ)
একদা পুলকে প্রভাত আলোকে
গাহিছে পাখী;
কহে কন্টক বাঁকা কটাক্ষে
কুসুমে ডাকি’;—
তুমি ত কোমল বিলাসী কমল,
দুলায় বায়ু,
দিনের কিরণ ফুরাতে ফুরাতে
ফুরায় আয়ু;
এ পাশে মধুপ মধুমদে তোর,
ও পাশে পবন পরিমল-চোর,
বনের দুলাল, হাসি পায় তোর
আদর দেখে’!
আহা মরি মরি কি রঙীন্ বেশ,
সোহাগ হাসির নাহি আর শেষ,
সারাবেলা ধরি রসালসাবেশ
গন্ধ মেখে’!
হায় ক’দিনের আদর সোহাগ
সাধের খেলা!
ললিত মাধুরী, রঙীন্ বিলাস,
মধুপ-মেলা!
ওগো নহি আমি তোদের মতন
সুখের প্রাণী,
হাব ভাব হাস, নানা-রঙা বাস
নাহিক জানি!
রয়েছি নগ্ন, জগতে লগ্ন
আপন বলে,
কে পাবে তাড়াতে আমাকে মাড়াতে
ধরণী তলে!
তোদের মতন নহি নিমেষের,
আমি এ নিখিলে চির দিবসের,
বৃষ্টিবাদল ঝড়বাতাসের
না রাখি ভয়!
সতত একাকী, সঙ্গীবিহীন,
কারো কাছে কোন নাহি প্রেম ঋণ,
চাটুগান শুনি সারা নিশিদিন
করি না ক্ষয়।
আসিবেক শীত, বিহঙ্গগীত
যাইবে থামি’,
ফুলপল্লব ঝরে’ যাবে সব,
রহিব আমি!
চেয়ে দেখ মোরে, কোন বাহুল্য
কোথাও নাই,
স্পষ্ট সকলি, আমার মূল্য
জানে সবাই।
এ ভীরু জগতে যার কাঠিন্য
জগৎ তারি।
নখের আঁচড়ে আপন চিহ্ন
রাখিতে পারি!
কেহ জগতেরে চামর ঢুলায়,
চরণে কোমল হস্ত বুলায়,
নত মস্তকে লুটায়ে ধূলায়
প্রণাম করে।
ভুলাইতে মন কত করে ছল,
কাহারো বর্ণ, কারো পরিমল,
বিফল বাসরসজ্জা, কেবল
দু দিন তরে।
কিছুই করি না, নীরবে দাঁড়ায়ে
তুলিয়া শির
বিঁধিয়া রয়েছি অন্তর মাঝে
এ পৃথিবীর।
আমারে তোমরা চাহ না চাহিতে
চোখের কোণে,
গরবে ফাটিয়া উঠেছ ফুটিয়া
আপন মনে।
আছে তব মধু, থাক্ সে তোমায়,
আমার নাহি।
есть তব রূপ,—মোর পানে কেহ
দেখে না চাহি।
কারো আছে শাখা, কারো আছে দল,
কারো আছে ফুল, কারো আছে ফল,
আমারি হস্ত রিক্ত কেবল
দিবসযামী!
ওহে তরু তুমি বৃহৎ প্রবীণ,
আমাদের প্রতি অতি উদাসীন,
আমি বড় নহি, আমি ছায়াহীন,
ক্ষুদ্র আমি।
হই না ক্ষুদ্র, তবুও ক্ষুদ্র
ভীষণ ভয়,
আমার দৈন্য সে মোর সৈন্য
তুলনায় সমালোচনা কবিতার Romanized Version:
Ekda puloke provat aloke
Gahiche pakhi;
Kohe kontok baka kotakkhe
Kusume daki’;—
Tumi to komol bilashi komol,
Dulay vayu,
Diner kiron furate furate
Furay ayu;
E pashe modhup modhumode tor,
O pashe pobon porimol-chor,
Boner dulal, hashi pay tor
Ador dekhe’!
Aha mori mori ki rongin vesh,
Sohag hashir nahi ar shesh,
Sarabela dhori rosalasavesh
Gondho mekhe’!
Hay k’diner ador sohag
Sadher khela!
Lolit madhuri, rongin bilash,
Modhup-mela!
Ogo nahi ami toder moton
Shukher prani,
Hab bhav hash, nana-ranga bash
Nahik jani!
Royechi nogno, jogote logno
Apon bole,
Ke pabe tarate amake marate
Dhoroni tole?
Toder moton nahi nimesher,
Ami e nikhile chiro dibosher,
Brishtibadol jhorbatasher
Na rakhi voy!
Sotot ekaki, shonghibihin,
Karo kache kon nahi prem rin,
Chatugan shuni shara nishidin
Kori na khoy.
Asibek sheet, bihongogit
Jaibe thami’,
Phulpollob zhore’ jaibe shob,
Rohibo ami!
Cheye dekho more, kon bahulyo
Kothay nai,
Sporshto sokoli, amar mulyo
Jane shobai.
E bhiru jogote jar kathinyo
Jogot tari.
Nokher anchore apon chinho
Rakhite pari!
Keho jogotere chamor dhulay,
Chorोने komol hosto bulay,
Noto mostoke lutaye dhulay
Pronam kore.
Bhulaite mon koto kore chol,
Kaharoo borno, karo porimol,
Bifol bashorshojja, kebol
Kew du din tore.
Kichhui kori na, nirobe daraye
Tuliya shir
Bidhiya royeche ontor majhe
E prithibir.
Amare tomara chah na chahite
Chokher kone,
Gorobe fatiya uthecho futiya
Apon mone.
Ache tobo modhu, thak se tomay,
Amar nahi.
Ache tobo rup,—mor pane keho
Dekhe na chahi.
Karo ache shakha, karo ache dol,
Karo ache phul, karo ache phol,
Amari hosto rikto kebol
Diboshyami!
Ohe toru tumi brihot probhin,
Amader proti oti udashin,
Ami boro nahi, ami chhayahin,
Kshudro ami.
Hoi na kshudro, tobuo kshudro
Bhishon voy,
Amar doino se mor shoinyo
Tahari joy.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
কোমল ফুল ও কণ্টকের দ্বন্দ্ব:
“তুমি ত কোমল বিলাসী কমল, / দুলায় বায়ু, / দিনের কিরণ ফুরাতে ফুরাতে / ফুরায় আয়ু;”
— কবিতার শুরুতে কাঁটা বা কণ্টক ফুলকে উদ্দেশ্য করে বলে যে ফুল হলো অত্যন্ত কোমল, বিলাসী এবং ক্ষণস্থায়ী। বাতাসের দোলায় তার জীবন ফুরিয়ে আসে, আর তার চারপাশের মৌমাছি ও গন্ধচোরেরা তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
কাঁটার আত্মমর্যাদা ও স্থায়িত্ব:
“তোদের মতন নহি নিমেষের, / আমি এ নিখিলে চির দিবসের, / বৃষ্টিবাদল ঝড়বাতাসের / না রাখি ভয়! /… আসিবেক শীত, বিহঙ্গগীত / যাইবে থামি’, / ফুলপল্লব ঝরে’ যাবে সব, / রহিব আমি!”
— ফুলের মতো ক্ষণিকের বিলাসিতা কাঁটার নেই। ফুল বা পাতা ঝরে গেলেও কাঁটা বা তার কাঠিন্য চিরকাল টিকে থাকে। ঝড়-বাদল বা শীতের দিনেও তার কোনো ভয় নেই—সে প্রকৃতির রুক্ষতার মাঝেও অটল ও চিরন্তন।
বাহ্যিক জাঁকজমক বনাম অন্তরের শক্তি:
“এ ভীরু জগতে যার কাঠিন্য / জগৎ তারি। / নখের আঁচড়ে আপন চিহ্ন / রাখিতে পারি!”
— এই পৃথিবীর নরম বা ভীরু মোহের চেয়ে যার মাঝে কাঠিন্য বা দৃঢ়তা আছে, পৃথিবী তারই। বাহ্যিক সাজসজ্জা বা রঙের খেলা দুদিনের জন্য হলেও, বেদনার আঁচড় বা গভীর সত্য স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
দৈন্যই কবির শক্তি:
“আমার দৈন্য সে মোর সৈন্য /তাহারি জয়।”
— পরিশেষে, বাহ্যিক ঐশ্বর্য, ফুল, ফল বা ছায়া না থাকলেও—সেই রিক্ততা ও দৈন্যই হলো মানুষের আসল শক্তি বা সৈন্য, যার মধ্য দিয়েই চরম বিজয় অর্জিত হয়।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।