সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের দুর্ব্বোধ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর মনস্তাত্ত্বিক, রোমান্টিক ও দার্শনিক কবিতা হলো ‘দুর্ব্বোধ’। ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি মানবহৃদয়ের জটিলতা, প্রেমের অন্তহীন গভীরতা এবং প্রিয় মানুষকে সম্পূর্ণভাবে বোঝানোর অক্ষমতার এক অপূর্ব রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন। মনকে কোনো সাধারণ মণি বা ফুলের মতো সহজে মাপা যায় না, কারণ হৃদয় এক অতল সমুদ্রের মতো রহস্যময়।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদুর্ব্বোধ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের বছর১৮৯৪ (১২৯৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা (Romantic and Psychological Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যযাত্রার “মানসী-সোনার তরী পর্ব”-এর অন্তর্গত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বল সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতায় কবি সৌন্দর্যচেতনা, প্রকৃতি এবং মানবমনের অন্তর্নিহিত রহস্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ‘দুর্ব্বোধ’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, বাহ্যিকভাবে সবকিছু প্রকাশ করা সত্ত্বেও ভালোবাসার গভীরতা বা মনের ব্যাকুলতা প্রিয় মানুষটির কাছে অনেক সময় দুর্ব্বোধ বা জটিল ঠেকে। একে কোনো সাধারণ বস্তু বা উপমার সাহায্যে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।

দুর্ব্বোধ – সম্পূর্ণ কবিতা

দুর্ব্বোধ।
তুমি মোরে পার না বুঝিতে?
প্রশান্ত বিষাদ তরে
দুটি আঁখি প্রশ্ন করে’
অর্থ মোর চাহিছে খুঁজিতে,
চন্দ্রমা যেমন ভাবে স্থির নত মুখে
চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে।
কিছু আমি করিনি গোপন।
যাহা আছে, সব আছে
তোমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন।
দিয়েছি সমস্ত মোর করিতে ধারণা,
তাই মোরে বুঝিতে পার না?
এ যদি হইত শুধু মণি,
শত খণ্ড করি তারে
সযত্নে বিবিধাকারে,
একটি একটি করি’ গণি’
একখানি সূত্রে গাঁখি একখানি হায়
পরাতেম গলায় তোমার!
এ যদি হইত শুধু ফুল,
সুগোল সুন্দর ছোটো,
ঊষালোকে ফোটো-ফোটো,
বসন্তের পবনে দোদুল,
বৃন্ত হতে সযতনে আনিতাম তুলে,
পরায়ে দিতে কালো চুলে!
এ যে সখি সম হৃদয়!
কোথা জল, কোথা কূল,
দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্য-নিলয়।
এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রাণী,
এ তবু তোমার রাজধানী!
কি তোমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয় মাঝে
নাহি জানি কি যে বাজে
নিশিদিন নীরব সঙ্গীতে!
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যাপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতন।
এ যদি হইত শুধু সুখ,
কেবল একটি হাসি
অধরের প্রান্তে আসি
আনন্দ করিত জাগরূক।
মুহূর্ত্তে বুঝিয়া নিতে হৃদয়-বারতা
বলিতে হত না কোন কথা!
এ যদি হইত শুধু দুখ,
দুটি বিন্দু অশ্রুজল
দুই চক্ষে ছল ছল,
বিষন্ন অধর ম্লান মুখ,
প্রত্যক্ষ দেখিতে পেতে অন্তরের ব্যথা,
নীরবে প্রকাশ হত কথা!
এ যে সখি হৃদয়ের প্রেম!
সুখ দুঃখ বেদনার
আদি অন্ত নাহি যার
চির দৈন্য চির পূর্ণ হেম!
নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবা রাতে

তাই আমি না পারি বুঝাতে!

নাই বা বুঝিলে তুমি মোরে!
চিরকাল চোখে চোখে
নূতন নূতনালোকে
পাঠ কর রাত্রি দিন ধরে।
বুঝা যায় আধ প্রেম, আধ খানা মন,

সমস্ত কে বুঝেছে কখন্‌!

দুর্ব্বোধ Romanized Version

Durbodh.
Tumi more par na bujhite?
Proshanto bishad tore
Duti ankhi prosno kore’
Ortho mor chahihe khujite,
Chondroma jemon bhabe sthir noto mukhe
Cheye dekhe somudrer buke.
Kichhu ami korini gopono.
Jaha ache, sob ache
Tomar ankhir kachhe
Prosarito obarito mon.
Diyechhi shomosto mor korite dharona,
Tai more bujhite par na?
E jodi hoito shudhu moni,
Shato khondo kori tare
Sojotne bibidhakare,
Ekti ekti kori’ goni’
Ekkhani sutre gan-khi ekkhani hay

Poratem golay tomar!

E jodi hoito shudhu ful,
Sugol shundor chhoto,
Ushaloke foto-foto,
Boshonter pobone dodul,
Brinto hote sojotne anitam tule,
Poraye dite kalo chule!
E je sokhi som hridoy!
Kotha jol, kotha kul,
Dik hoye jay bhul,
Ononto-hin rohosyo-niloy.
E rajyer adi onto nahi jan rani,
E tobu tomar rajdhani!
Ki tomare chahi bujhite?
Gobhir hridoy majhe
Nahi jani ki je baje
Nishidin nirob shongite!
Shobdohin stabdhotay byapiya gogon

Rojonir dhonir moton.

E jodi hoito shudhu sukh,
Kebol ekti hasi
Odhorer pronte ashi
Anondo korito jagoruk.
Muhurte bujiya nite hridoy-barta
Bolite hoto na kono kotha!
E jodi hoito shudhu dukh,
Duti bindu oshrujol
Dui chokhe chol chol,
Bishonno odhor mlan mukh,
Protyokkho dekhte pete ontorer byatha,
Nirobe prokash hoto kotha!
E je sokhi hridoyer prem!
Sukh duhkho bedonar
Adi onto nahi jar
Chiro doinyo chiro purno hem!
Nob nob byakulota jage diba rate
Tai ami na pari bujhate!
Nai ba bujhile তুমি more!
Chirokal choke choke
Nuton nutonaloke
Path kor ratri din dhore.
Bujha ja adhi prem, adh khana mon,
Shomosto ke bujeche kokhon!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সহজ থেকে জটিলতার রূপক: কবি দেখিয়েছেন যে মনের অনুভূতি যদি কেবল কোনো জড় বস্তু বা মণি হতো, তবে তাকে সহজে খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করে বা মালায় গেঁথে উপহার দেওয়া যেত। যদি তা কেবল ফুল হতো, তবে তা চুলে গুঁজে দেওয়া সহজ ছিল। কিন্তু মানবহৃদয় ও প্রেম তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
  • হৃদয়ের অতল সমুদ্র রূপক:
“এ যে সখি সম হৃদয়! / কোথা জল, কোথা কূল, / দিক হয়ে যায় ভুল, / অন্তহীন রহস্য-নিলয়।”
— মন বা হৃদয় হলো একটি অন্তহীন রহস্যের রাজ্য বা অতল সমুদ্রের মতো। এর আদি-অন্ত বা কূল-কিনারা সহজে বোঝা যায় না, যদিও এর পুরো অধিকারটাই প্রিয়জনের হাতে ন্যস্ত।
  • সুখ ও দুঃখের সীমানা ছাড়িয়ে প্রেম: প্রেম কেবল সাধারণ কোনো একটি হাসি (সুখ) কিংবা চোখের জলের (দুঃখ) মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুখ, দুঃখ ও বেদনার এক চিরন্তন ও পূর্ণ প্রবাহ, যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্যাকুলতা জন্ম নেয়। আর ঠিক এই কারণেই পুরো হৃদয়টিকে এককথায় বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না।
  • সম্পূর্ণ বোঝার অসম্ভাব্যতা:
“বুঝা যায় আধ প্রেম, আধ খানা মন, / সমস্ত কে বুঝেছে কখন্‌!”
— কবিতার এই অন্তিম বাণীতে এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ পেয়েছে। ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষ হয়তো কিছুটা বুঝতে পারে, কিন্তু মানুষের মন বা গভীর প্রেমকে কি কখনো সম্পূর্ণ কেউ বুঝতে পেরেছে?

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন