রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপকধর্মী ও রোমান্টিক কবিতার এক অপূর্ব নিদর্শন হলো তাঁর বিখ্যাত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের এই ‘হৃদয় যমুনা’। এখানে কবি নিজের হৃদয়কে তুলনা করেছেন যমুনার অতল, নীল জলরাশির সাথে। আর সেই হৃদয়-যমুনার তীরে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর চিরকাঙ্ক্ষিত মানসী বা প্রিয়তমাকে। পুরো কবিতাটি যেন এক গভীর আকুলতা আর আত্মসমর্পণের গল্প।
কবিতার শুরুতেই এক বর্ষণমুখর দিনে কবি তাঁর প্রিয়তমাকে ডাকছেন। বলছেন, যদি জল ভরে নিতে চাও, তবে তোমার কাঁখের কলসটি নিয়ে আমার এই হৃদয়ের জলে নেমে এসো; জল ছলছল শব্দে তোমার সুকোমল দুটি পা জড়িয়ে ধরবে। আবার প্রিয়তমা যদি জল ভরার তাড়া ভুলে, কলসটি ভাসিয়ে দিয়ে শুধু একা একা নদীর কূলে বসে থাকতে চান, তার জন্যও কবির হৃদয়ের তীরে রয়েছে নরম সবুজ ঘাস আর ফুটে থাকা বুনো ফুল। যেখানে বসে অনায়াসে সব ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া যায়।
এরপর কবি ভালোবাসার গভীরতাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, যদি এই সুনীল জলে অবগাহন বা স্নান করতে চাও, তবে লোকলজ্জার সব আবরণ তীরে ফেলে দিয়ে নিঃসংকোচে নেমে এসো। এই জলের প্রতিটি সোহাগী তরঙ্গ পরম আদরে জড়িয়ে ধরবে, কখনো হেসে, কখনো কুলুকুলু শব্দে অভিমানে কেঁদে প্রিয়তমার চারপাশ ঘিরে রাখবে।
সবশেষে কবি ভালোবাসার এক চূড়ান্ত ও পরম রূপ দেখিয়েছেন, যা একাধারে রোমাঞ্চকর ও ভয়ংকর। কবি বলছেন, যদি এই ভালোবাসায় নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দিয়ে ‘মরণ’ বা মুক্তি পেতে চাও, তবে আমার এই হৃদয়ের অতল গভীরে ঝাঁপ দাও। যেখানে কোনো দিন-রাতের হিসাব নেই, কোনো কোলাহল বা পৃথিবীর নিয়মের বাঁধন নেই। সব সম্পর্ক আর জাগতিক কাজের হিসেব তীরে ফেলে দিয়ে এই শান্ত, স্নিগ্ধ ও সুগভীর নীল জলে হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই রয়েছে ভালোবাসার আসল সার্থকতা। চিরন্তন প্রেম, আকুলতা আর নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এই আশ্চর্য আকুতি রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় অত্যন্ত মেলোডিয়াস ও ছন্দময় ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
হৃদয় যমুনা কবিতা (Hridoy Jamuna Kobita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ
হৃদয়-যমুনা
যদি ভরিয়া লইবে কুম্ভ, এস ওগো এস, মোর
হৃদয়-নীরে!
তলতল ছলছল
কাঁদিবে গভীর জল
ওই দুটি সুকোমল
চরণ ঘিরে।
আজি বর্ষা গাঢ়তম;
নিবিড় কুন্তল সম
মেঘ নামিয়াছে মম
দুইটি তীরে।
ওই যে শবদ চিনি,
নুপুর রিনিকিঝিনি,
কে গো তুমি একাকিনী
আসিছ ধীরে!
যদি ভরিয়া লইবে কুন্ত, এস ওগো এস, মোর
হৃদয়-নীরে!
যদি কলস ভাসায়ে জলে বসিয়া থাকিতে চাও
আপনা ভুলে;
হেথা শ্যাম দূর্ব্বাদল,
নবনীল নভস্তল,
বিকশিত বনস্থল
বিকচ ফুলে।
দুটি কালো আঁখি দিয়া
মন যাবে বাহিরিয়া,
অঞ্চল খসিয়া গিয়া
পড়িবে খুলে,
চাহিয়া বঞ্জুল বনে
কি জানি পড়িবে মনে,
বসি কুঞ্জে তৃণাসনে
শ্যামল কূলে।
যদি কলস ভাসায়ে জলে বসিয়া থাকিতে চাও
আপনা ভুলে!
যদি গাহন করিতে চাহ, এস নেমে এস, হেথা
গহন-তলে!
নীলাম্বরে কিবা কাজ,
তীরে ফেলে এস আজ,
ঢেকে দিবে সব লাজ
সুনীল জলে।
সোহাগ-তরঙ্গরাশি
অঙ্গখানি দিবে গ্রাসি’,
উচ্ছ্বসি পড়িবে আসি’
ঊরসে গলে।
ঘুরে ফিরে চারিপাশে
কভু কাঁদে কভু হাসে,
কুলুকুলু কলভাষে
কত কি ছলে!
যদি গাহন করিতে চাহ, এস নেমে এস হেথা
গহন-তলে!
যদি মরণ লভিতে চাও, এস তবে ঝাঁপ দাও
সলিল মাঝে!
স্নিগ্ধ, শান্ত, সুগভীর,
নাহি তল, নাহি তীর,
মৃত্যুসম নীল নীর
স্থির বিরাজে!
নাহি রাত্রি, দিনমান,
আদি অন্ত পরিমাণ,
সে অতলে গীত গান
কিছু না বাজে।
যাও সব যাও ভুলে,
নিখিল বন্ধন খুলে
ফেলে দিয়ে এস কূলে
সকল কাজে!
যদি মরণ লভিতে চাও, এস তবে ঝাঁপ দাও
সলিল মাঝে!
