বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের এক অনন্যসাধারণ, আত্মত্যাগোদ্ভাসিত ও বৈপ্লবিক সৃষ্টি “আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী”। প্রেমমূলক গানে রবীন্দ্র-ভাবনা কোনো সহজিয়া বা প্রচলিত সামাজিক সংস্কারের পথে হাঁটে না; বরং তা দার্শনিক গভীরতায় পুষ্ট এক অবিনাশী রূপ ধারণ করে। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-ভাবের সাথে আত্মিক সংযোগ ঘটিয়ে কবি এখানে সামাজিক লোকনিন্দা, শুচিতার অহংকার এবং যাবতীয় বিধিবিধানের বন্ধন ছিন্ন করে ভালোবাসার জন্য নির্দ্বিধায় কলঙ্ককে বরণ করে নেওয়ার পরম প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সমাজ যাকে ‘পঙ্ক’ বা কলঙ্ক বলে দূরে ঠেলে দেয়, খাঁটি অনুরাগের স্পর্শে তা-ই যে বক্ষে ধারণ করার মতো অমূল্য ধন হয়ে ওঠে—গানটি সেই চরম আত্মনিবেদনের এক চিরন্তন দলিল।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী |
| পর্যায় | প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ২৩৫) |
| উপ-পর্যায় | প্রেম-বৈচিত্র্য |
| রাগ | ভৈরবী |
| তাল | দাদরা (ছয় মাত্রা) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১৩১৭ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ |
| স্বরলিপিকার | সাহানা দেবী |
| আকর গ্রন্থ | গীতবিতান (প্রেম পর্যায়) ও স্বরবিতান |
| মূল উপজীব্য | নিঃশর্ত সমর্পণ, লোকনিন্দাকে অলংকার জ্ঞান করা, সংস্কারমুক্তি ও পরম অনুরাগ |
আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী | Ami tomar preme hobo sobar lyrics :
আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।
আমি সকল দাগে হব দাগি॥
তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন, যেথা তোমার ধুলার শয়ন
সেথা আঁচল পাতব আমার তোমার রাগে অনুরাগী॥
আমি শুচি-আসন টেনে টেনে বেড়াব না বিধান মেনে,
যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি॥
Ami Tomar Preme Hobo Sobar Kolonkobhagi — Romanized Version
Ami tomar preme hobo sobar kolonkobhagi।
Ami sokol dage hobo dagi॥
Tomar pother kanta korbo chayon, jetha tomar dhular shayon
setha anchol patbo amar tomar rage onuragi॥
Ami shuchi-ason tene tene berabo na bidhan mene,
je panke oi charan pore tahari chhap bokshe magi॥

গানের মূল ভাব

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. সামাজিক কলঙ্কের বরণডালা
- “আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী / আমি সকল দাগে হব দাগি…”গানটির সূচনাই এক সাহসী উচ্চারণ দিয়ে। তথাকথিত সামাজিক বিশুদ্ধতার চেয়ে প্রেমের সত্য অনেক উঁচুতে। প্রিয়জনের ভালোবাসার কারণে যদি সমাজ ‘কলঙ্ক’ বা ‘দাগ’ লেপন করে, তবে সেই দাগকেই প্রেমিক শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হিসেবে বক্ষে ধারণ করতে প্রস্তুত।
২. কণ্টক দূরীকরণ ও ধুলার শয্যা
- “তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন, যেথা তোমার ধুলার শয়ন / সেথা আঁচল পাতব আমার তোমার রাগে অনুরাগী…”নিঃস্বার্থ সেবার পরাকাষ্ঠা। প্রেমাস্পদের চলার পথকে মসৃণ করতে নিজের হাতে কাঁটা তোলা এবং যেখানে প্রিয়জন ধুলায় আসন নেবে, সেখানে নিজের স্নিগ্ধ আঁচল বিছিয়ে দেওয়ার সংকল্প প্রকাশ করে যে, প্রিয়তমের দুঃখের অংশীদার হওয়াই প্রেমের পরম সার্থকতা।
৩. কৃত্রিম শুচিতার প্রত্যাখ্যান ও পঙ্কের মহিমা
- “আমি শুচি-আসন টেনে টেনে বেড়াব না বিধান মেনে / যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি…”সামাজিক ভণ্ডামি ও আচারসর্বস্ব ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ। আচারনিষ্ঠ মানুষ পবিত্রতার নামে আলাদা ‘শুচি-আসন’ পেতে দূরত্ব বজায় রাখে; কিন্তু প্রেমিক সেই কৃত্রিম শুচিতা মানতে নারাজ। প্রেমাস্পদের চরণস্পর্শে যে কাদা বা পঙ্ক পবিত্র হয়ে উঠেছে, সেই ধূলি-কাদার চিহ্ন নিজ বক্ষে ধারণ করাই তার কাছে পরম আশীর্বাদ।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- বৈষ্ণব ভাবধারার নবজন্ম: রাধার অপবাদ বরণের চিরন্তন পদাবলী রসকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কাব্যিক রূপ দিয়েছেন, যেখানে ভক্তি ও পার্থিব প্রেমের ভেদরেখা মুছে যায়।
- তীব্র বৈপরীত্যের অলংকার (Antithesis): ‘শুচি-আসন’ বনাম ‘ধুলার শয়ন’ এবং ‘বিধান’ বনাম ‘পঙ্ক’—এই পরস্পরবিরোধী রূপকের মধ্য দিয়ে ভণ্ড শুচিতার বিরুদ্ধে খাঁটি ভালোবাসার জয়গান গাওয়া হয়েছে।
- দাদরা তালের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ: ছয় মাত্রার দাদরা তালের দোলা গানটির বাণীর বলিষ্ঠতাকে এক ধরনের সাবলীল নৃত্যময়তা ও সংকল্পবদ্ধ রূপ দিয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- ভৈরবী রাগের সর্বজনীন আবেদন: গানটিতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বশ্রেষ্ঠ আর্তিপ্রধান রাগ ‘ভৈরবী’-র আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ভৈরবীর করুণ ও নিবেদিত সুর চরণের ভেতরের ত্যাগ ও নিঃশর্ত ভালোবাসার গভীরতাকে শ্রোতার হৃদয়ে প্রগাঢ়ভাবে পৌঁছে দেয়।
- সাহানা দেবীর স্বরলিপি: প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সাহানা দেবীর করা স্বরলিপিতে গানটির রাগাঙ্গ গাম্ভীর্য ও আর্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। সুরের মৃদু তান ও মীড়ের ব্যবহার গানটিকে এক অপূর্ব প্রার্থনাগীতির রূপ দেয়।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯১০ সালে (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) গানটি যখন রচিত হয়, তখন কবির জীবনে গীতাঞ্জলি পর্বের গভীর আত্মিক রূপান্তর চলছিল। এই পর্বে রচিত প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কেবল মানব-মানবীর সাধারণ প্রেমের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা পরমাত্মার সাথে আত্মার মিলনের রূপক হিসেবেও এক গভীর রূপ পরিগ্রহ করেছে।
- সাহানা দেবী (১৮৯৭–১৯৯০): রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ও বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসংগীতের প্রাচীন ও বিশুদ্ধ ধারা সংরক্ষণে তাঁর স্বরলিপি ও কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (৩৭তম খণ্ড), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্র-জীবনী ও রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।








![সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘সুপ্তোত্থিতা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুপ্তোত্থিতা কবিতা [ সোনার তরী ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/03/সুপ্তোত্থিতা-কবিতা-1024x536.gif)
![বাসাবাড়ি basabari [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাসাবাড়ি basabari [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বাসাবাড়ি-basabari-কবিতা--1024x536.gif)