আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী তব , প্রেম পর্যায়, ২৩৩ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের এক অনুপম, ধ্যানমগ্ন ও অতীন্দ্রিয় রোমান্টিক সৃষ্টি “ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী”। গানটিতে প্রেম রক্ত-মাংসের পার্থিব সীমানা অতিক্রম করে স্মৃতি, স্বপ্ন ও চিরন্তন নান্দনিক অনুভবে রূপ নিয়েছে। বসন্তের সমীরণ, মাধবীকুঞ্জের চিরচেনা সুবাস, ঝিঁঝিঁ পোকার অবিশ্রান্ত গুঞ্জন এবং গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় বেজে ওঠা পরজ রাগের সুরের মধ্য দিয়ে স্মৃতিচারণ ও বিরহের এক শান্ত, মহিমান্বিত রূপ এখানে প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়জন বাস্তবে ধরা না দিলেও অন্তরের নিভৃত মন্দিরে স্বপ্নরূপে যে নিত্য জাগ্রত থাকে—গানটি সেই শাশ্বত অনুরাগেরই কাব্যিক ভাষ্য।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামওগো স্বপ্নস্বরূপিণী
পর্যায়প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ২৩৩)
রাগপরজ-বসন্ত
তালদাদরা (ছয় মাত্রা)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)২৮ ফাল্গুন, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)১২ মার্চ, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকারশৈলজারঞ্জন মজুমদার
মূল উপজীব্যঅতীন্দ্রিয় প্রেম, স্মৃতিচারণ, বসন্তের রজনীতে বিরহ ও নিভৃত নৈবেদ্য

ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী, তব অভিসারের পথে পথে – বাংলা লিরিক

ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী, তব অভিসারের পথে পথে

স্মৃতির দীপ জ্বালা ॥

সেদিনেরই মাধবীবনে আজও তেমনি ফুল ফুটেছে

তেমনি গন্ধ ঢালা ॥

আজি তন্দ্রাবিহীন রাতে ঝিল্লিঝঙ্কারে স্পন্দিত পবনে

তব অঞ্চলের কম্পন সঞ্চারে।

আজি পরজে বাজে বাঁশি

যেন হৃদয়ে বহুদূরে আবেশবিহ্বল সুরে।

বিকচ মল্লিমাল্যে তোমারে স্মরিয়া রেখেছি ভরিয়া ডালা ॥

 

Ogo Swapnaswarupini, Tabo Abhisarer Pothe Pothe — Romanized Version

Ogo swapnaswarupini, tabo abhisarer pothe pothe
smritir deep jwala॥

Sedin-er-i madhabibone aajo temni phul futechhe
temni gandha dhala॥

Aaji tandra-bihin rate jhillijhankare spondhito pabone
tabo ancholer kompon sanchare।

Aaji Paraje baje banshi
jeno hridoye bohu-dure abesh-bihwal sure।

Bikach mallimalye tomare smoria rekhechhi bhoria dala॥

 

গানের মূল ভাব

“ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী” গানটির মূল ভিত্তি হলো স্মৃতিমেদুরতা ও ভালোবাসার আত্মিক রূপান্তর। এখানে প্রিয় মানুষটি কোনো স্থূল বা ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতিতে বন্দি নয়; সে চেতনায় বিরাজমান এক ‘স্বপ্নস্বরূপিণী’। মিলনের অতীত মুহূর্তগুলো হয়তো কালের নিয়মে অতীতে বিলীন হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির ঋতুবৈচিত্র্যে তারা চিরকাল অমলিন।

যে বসন্তে প্রথম প্রণয় জেগেছিল, সেই মাধবীবনে আজও ফুল ফোটে এবং বাতাস সুরভিত হয়। বাইরের প্রকৃতিতে প্রেমিকার কোনো পদচিহ্ন দেখা না গেলেও রাতের নির্জনতায় বাতাসের প্রতি কম্পনে তার বসনাঞ্চলের ছোঁয়া অনুভূত হয়। ভালোবাসা এখানে বিরহক্লিষ্ট কোনো হাহাকার নয়, বরং দূরবর্তী বাঁশির করুণ সুর এবং সদ্য ফোটা মল্লিকা ফুলের ডালা দিয়ে সাজানো এক পবিত্র আত্মনিবেদন।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. অভিসার পথে স্মৃতির আলোকবর্তিকা

  • “ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী, তব অভিসারের পথে পথে স্মৃতির দীপ জ্বালা…”
    প্রেমাস্পদকে ‘স্বপ্নস্বরূপিণী’ সম্বোধন করে কবি অনুরাগের অতীন্দ্রিয় রূপ উন্মোচন করেছেন। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার অভিসারের মতো এখানে কোনো শারীরিক যাত্রা নেই; এটি স্মৃতির আলোকোজ্জ্বল পথ ধরে অন্তরের অভিসার।

২. প্রকৃতির পুনরাবৃত্তি ও রূপময় চিরন্তনতা

  • “সেদিনেরই মাধবীবনে আজও তেমনি ফুল ফুটেছে, তেমনি গন্ধ ঢালা…”
    মানুষের জীবনে পরিবর্তন এলেও প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের উপাচার নিয়ে অটল থাকে। অতীতের প্রেমের সাক্ষী মাধবীলতা আজও সমভাবে পুষ্পিত ও সুবাসিত হয়ে পূর্বস্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।

৩. নিদ্রাহীন রজনী ও বাতাসের কম্পন

  • “আজি তন্দ্রাবিহীন রাতে ঝিল্লিঝঙ্কারে স্পন্দিত পবনে তব অঞ্চলের কম্পন সঞ্চারে…”
    রাতের নিঃশব্দতাকে মুখরিত করছে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম ঝংকার। এই বিনিদ্র রজনীতে মৃদু বাতাসে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, স্পর্শকাতর কবিমন তাতে প্রিয়তমার শাড়ির আঁচলের দোলা বা উপস্থিতি অনুভব করে।

৪. পরজ রাগের মায়াবী আর্তি ও পুষ্পার্ঘ্য

  • “আজি পরজে বাজে বাঁশি যেন হৃদয়ে বহুদূরে আবেশবিহ্বল সুরে / বিকচ মল্লিমাল্যে তোমারে স্মরিয়া রেখেছি ভরিয়া ডালা…”
    রাতের শেষ প্রহরে পরজ রাগের উদাসী সুর দূর থেকে ভেসে আসে এবং হৃদয়কে এক গভীর আচ্ছন্নতায় আচ্ছন্ন করে। সেই সুরের সাথে মিলিয়ে সদ্য প্রস্ফুটিত মল্লিকা ফুলের মালা দিয়ে বিরহী প্রেমিক তার স্মৃতির ডালা সাজিয়ে রাখে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে প্রত্যক্ষ মিলনের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; রয়েছে চিরন্তন বিদায় ও অদর্শনের গভীর দীর্ঘশ্বাস। চাক্ষুষ সাক্ষাতের আশাহীন দৃষ্টি তখন বাইরের জগৎ থেকে সরে এসে নিজের ভেতরেই প্রেয়সীকে খুঁজতে শুরু করে। বিদায়ের অবর্ণনীয় ক্ষত এখানে কোনো উচ্চকিত আর্তনাদ তৈরি করে না; বরং তা এক স্নিগ্ধ, নিভৃত ও পবিত্র রূপ ধারণ করে। অপূর্ণতার বেদনাকে কবি প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ এবং বাঁশির মায়াবী সুরে বিলীন করে দিয়ে আত্মিক শান্তিতে রূপান্তরিত করেছেন।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • ধ্রুপদী ও চিত্রল শব্দচয়ন: ‘স্বপ্নস্বরূপিণী’, ‘ঝিল্লিঝঙ্কার’, ‘স্পন্দিত পবন’, ‘বিকচ মল্লিমাল্য’-এর মতো মার্জিত সংস্কৃতানুসারী শব্দের সমন্বয় গানটিকে এক অনন্য গাম্ভীর্য ও নান্দনিক সৌন্দর্য দান করেছে।
  • ইন্দ্রিয়ানুভূতির সংমিশ্রণ (Synesthesia): গানের প্রতিটি স্তবকে সুবাস (মাধবীর গন্ধ), শ্রবণ (ঝিঁঝিঁর ঝঙ্কার ও বাঁশি), এবং স্পর্শ (পবনের কম্পন)-এর এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
  • রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার চূড়ান্ত পরিণতি: কবির পরিণত বয়সের সৃষ্টি হওয়ায় এতে আবেগের অতিরেক নেই; রয়েছে সংহত রূপ ও অনুভূতির পরম পরিপক্বতা।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • পরজ-বসন্ত রাগের প্রয়োগ: গানটিতে মধ্যরাত ও শেষ রাতের মেলবন্ধনকারী রাগ ‘পরজ-বসন্ত’-এর স্নিগ্ধ করুণ ও গম্ভীর ছায়া ব্যবহার করা হয়েছে। বসন্তের আনন্দের মাঝেও যে এক গভীর বৈরাগ্য ও বিচ্ছেদ লুকিয়ে থাকে, এই রাগ তা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
  • দাদরা তালের ছন্দদোলা: ছয় মাত্রার দাদরা তালের মৃদু গতি গানটির স্মৃতিমেদুর ভাবটিকে দোলায়িত রাখে। সুরের ওঠানামায় কোনো আকস্মিক চমক নেই, বরং তা নদীর শান্ত তরঙ্গের মতো বয়ে চলে।
  • স্বরলিপির বিশুদ্ধতা: প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সংগৃহীত স্বরলিপিতে গানটির রাগাঙ্গ মেজাজ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সংরক্ষিত হয়েছে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতীয় শিল্প ও সাহিত্যের যুগান্তকারী দিশারী। ১৯১৫টি গানের মাধ্যমে তিনি যে ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামক স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তন করেছিলেন, তা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকসুরকে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৩৯ সালে জীবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছে শান্তিনিকেতনের শান্ত পরিবেশে তিনি এই গানটি রচনা করেন।
  • গীতবিতানের বিন্যাস: রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী গীতসংকলন ‘গীতবিতান’-এর প্রেম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত এই গানটি কবির পরিণত আত্মিক অনুরাগের এক প্রামাণ্য স্মারক।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী” কেবল একটি গান নয়, এটি রবীন্দ্র-নান্দনিকতার এমন এক রূপ যা স্থূল ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আত্মিক পূজার মহিমা শিক্ষা দেয়। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব, শাস্ত্রীয় রবীন্দ্রসংগীতের আসর এবং বিভিন্ন মার্জিত সংগীতানুষ্ঠানে এটি উচ্চাঙ্গ রবীন্দ্র সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে নিয়মিত পরিবেশিত হয়। অনুভূতির পরিশীলন ও নান্দনিক রুচি গঠনে এই গানের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  2. স্বরবিতান (৪৫তম খণ্ড), রবীন্দ্রসংগীতের প্রামাণ্য স্বরলিপি সংকলন।
  3. রবীন্দ্র-জীবনী (চতুর্থ খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত