শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ভোরের আলো-আঁধারে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধুনিক গদ্যরীতির কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ সপ্তক’-এর একটি অনন্য নিসর্গচিত্রণ ও জীবনদর্শনের কবিতা হলো ‘ভোরের আলো-আঁধারে’ (কাব্যগ্রন্থের ১১ সংখ্যক কবিতা)। শান্তিনিকেতনের ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশ, গ্রামীণ প্রাত্যহিকতা, প্রকৃতির প্রাণস্পন্দন এবং শিল্পের চিরন্তন মৌনতার সাথে জীবন্ত প্রাণের তুলনামূলক অনুধ্যান এ কবিতায় অপরূপ গদ্যছন্দে ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামভোরের আলো-আঁধারে (শেষ সপ্তক কাব্যের ১১ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনআধুনিক মুক্ত গদ্যকবিতা ও দৃশ্যচিত্রধর্মী অনুধ্যানমূলক রচনা (Free-verse Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতায় গদ্যছন্দের সম্ভাবনাকে চরম উৎকর্ষে নিয়ে যান। ছন্দের কঠোর বাঁধন ভেঙে প্রতিদিনের দেখা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দৃশ্যগুলোকে গভীর জীবনবোধে জারিত করাই ছিল এই পর্বের বৈশিষ্ট্য। শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ভোর ছ’টা থেকে সাতটার মধ্যকার প্রাত্যহিক দৃশ্যপট কবিকে এই কবিতার প্রেরণা জোগায়। একদিকে কোকিলের ডাক, হাটের উদ্দেশ্যে চলা গোরুর গাড়ি, কচুশাক-কাঁচা আম নিয়ে যাওয়া গ্রাম্য বধূ-কন্যা; অন্যদিকে বাগানের করবীগাছের তলে বসে প্রকৃতির পরিবর্তন ও চৈত্রান্তের শুষ্কতাকে অবলোকন করা। এই চলমান সজীব প্রকৃতির মাঝে কবি স্থাপন করেছেন খেলা-পাহাড়ের গায়ে রাখা এক চতুর্মুখ পাথরের ভাস্কর্যকে—যা চিরন্তন শিল্প হলেও প্রকৃতির প্রাণের স্পন্দন ও আত্মীয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন। কবিতার শেষে রাজহাঁসের ছানাদের চরাতে আসা একটি ছোট মেয়ের অকৃত্রিম মাতৃস্নেহের দৃশ্য দেখে কবি উপলব্ধি করেন যে জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী সহজ মুহূর্তগুলোর কোনো মূল্য শোধ করতে হয় না, বিশ্ববিধাতা আগেই তাঁর অনন্ত আনন্দভাণ্ডার থেকে তা মানবহৃদয়কে উপহার দিয়েছেন।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ভোরের আলো-আঁধারে কবিতা সম্পূর্ণ কবিতা:

ভোরের আলো-আঁধারে

থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক

যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি।

ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়েছে আকাশে

একটু একটু সোনার লিখন নিয়ে।

হাটের দিন,

মাঠের মাঝখানকার পথে

চলেছে গোরুর গাড়ি।

কলসীতে নতুন আখের গুড়, চালের বস্তা,

গ্রামের মেয়ে কাঁখের ঝুড়িতে নিয়েছে

কচুশাক, কাঁচা আম, শজনের ডাঁটা।

ছটা বাজল ইস্কুলের ঘড়িতে।

ঐ ঘণ্টার শব্দ আর সকাল বেলাকার কাঁচা রোদ্দুরের রঙ

মিলে গেছে আমার মনে।

আমার ছোটো বাগানের পাঁচিলের গায়ে

বসেছি চৌকি টেনে

করবীগাছের তলায়।

পুবদিক থেকে রোদ্দুরের ছটা

বাঁকা ছায়া হানছে ঘাসের ‘পরে।

বাতাসে অস্থির দোলা লেগেছে

পাশাপাশি দুটি নারকেলের শাখায়।

মনে হচ্ছে যমজ শিশুর কলরবের মতো।

কচি দাড়িম ধরেছে গাছে

চিকন সবুজের আড়ালে।

চৈত্রমাস ঠেকল এসে শেষ হপ্তায়।

আকাশে ভাসা বসন্তের নৌকোয়

পাল পড়েছে ঢিলে হয়ে।

দূর্বাঘাস উপবাসে শীর্ণ;

কাঁকর-ঢালা পথের ধারে

বিলিতি মৌসুমি চারায়

ফুলগুলি রঙ হারিয়ে সংকুচিত।

হাওয়া দিয়েছে পশ্চিম দিক থেকে,–

বিদেশী হাওয়া চৈত্রমাসের আঙিনাতে।

গায়ে দিতে হল আবরণ অনিচ্ছায়।

বাঁধানো জলকুণ্ডে জল উঠছে শিরশিরিয়ে,

টলমল করছে নালগাছের পাতা,

লাল মাছ কটা চঞ্চল হয়ে উঠল।

নেবুঘাস ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে

খেলা-পাহাড়ের গায়ে।

তার মধ্যে থেকে দেখা যায়

গেরুয়া পাথরের চতুর্মুখ মূর্তি।

সে আছে প্রবহমান কালের দূর তীরে

উদাসীন;

ঋতুর স্পর্শ লাগে না তার গায়ে।

শিল্পের ভাষা তার,

গাছপালার বাণীর সঙ্গে কোনো মিল নেই।

ধরণীর অন্তঃপুর থেকে যে শুশ্রূষা

দিনে রাতে সঞ্চারিত হচ্ছে

সমস্ত গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায়,

ঐ মূর্তি সেই বৃহৎ আত্মীয়তার বাইরে।

মানুষ আপন গূঢ় বাক্য অনেক কাল আগে

যক্ষের মৃত ধনের মতো

ওর মধ্যে রেখেছে নিরুদ্ধ ক’রে,

প্রকৃতির বাণীর সঙ্গে তার ব্যবহার বন্ধ।

সাতটা বাজল ঘড়িতে।

ছড়িয়ে-পড়া মেঘগুলি গেছে মিলিয়ে।

সূর্য উঠল প্রাচীরের উপরে,

ছোটো হয়ে গেল গাছের যত ছায়া।

খিড়কির দরজা দিয়ে

মেয়েটি ঢুকল বাগানে।

পিঠে দুলছে ঝালরওআলা বেণী,

হাতে কঞ্চির ছড়ি;

চরাতে এনেছে

একজোড়া রাজহাঁস,

আর তার ছোটো ছোটো ছানাগুলিকে।

হাঁস দুটো দাম্পত্য দায়িত্বের মর্যাদায় গম্ভীর,

সকলের চেয়ে গুরুতর ঐ মেয়েটির দায়িত্ব

জীবপ্রাণের দাবি স্পন্দমান

ছোট ঐ মাতৃমনের স্নেহরসে।

আজকের এই সকালটুকুকে

ইচ্ছে করেছি রেখে দিতে।

ও এসেছে অনায়াসে,

অনায়াসেই যাবে চলে।

যিনি দিলেন পাঠিয়ে

তিনি আগেই এর মূল্য দিয়েছেন শোধ ক’রে

আপন আনন্দ-ভাণ্ডার থেকে।

Bhorer alo-andhare kobitar Romanized Version:

Bhorer alo-andhare
Theke theke uthhchhe kokiler dak
Jeno khone khone shobder atoshbaji.
Chhenra megh chhoriyechhe akashe
Ektu ektu shonar likhon niye.
Hater din,
Mather majhkhankar pothe
Cholechhe gorur gari.
Kolsite nuton akher gur, chaler bosta,
Gramer meye kankher jhurite niyechhe
Kochushak, kancha am, shojoner danta.
Chhota bajlo iskuler ghorite.
Oi ghontar shobdo ar shokal belakar kancha roddurer rong
Mile gechhe amar mone.
Amar chhoto baganer panchiler gaye
Bosechhi chouki tene
Korobigachher tolay.
Pubdik theke roddurer chhota
Banka chhaya hanchhe ghasher ‘pore.
Batase osthir dola legechhe
Pashapashi duti narkeler shakhay.
Mone hochchhe jomoj shishur kolorober moto.
Kochi darim dhorechhe gachhe
Chikon shobujer arale.
Choitromash theklo eshe shesh hoptay.
Akashe bhasha boshonter noukoy
Pal porechhe dhile hoye.
Durbaghash upobashe shirno;
Kankor-dhala pother dhare
Biliti moushumi charay
Phulguli rong hariye shongkuchito.
Hawa diyechhe poshchim dik theke,–
Bideshi hawa choitromasher anginate.
Gaye dite holo aborononichchhay.
Bandhano jolkunde jol uthhchhe shirshiriye,
Tolmol korchhe nalgachher pata,
Lal machh kota chonchol hoye uthhlo.
Nebughash jhankra hoye uthhechhe
Khela-paharier gaye.
Tar moddhe theke dekha jay
Gerua pathorer choturrmukh murti.
She achhe probohoman kaler dur tire
Udashin;
Ritur sporsho lage na tar gaye.
Shilper bhasha tar,
Gachhpalari banir shongge kono mil nei.
Dhoronir ontophur theke je shushrusha
Dine rate shoncharito hochchhe
Shomosto gachher dale dale patay patay,
Oi murti shei brihot atmiotar baire.
Manush apon gurhô bakko onek kal age
Jokkher mrito dhoner moto
Or moddhe rekhechhe niruddho ko’re,
Prokritir banir shongge tar byobohar bondho.
Satta bajlo ghorite.
Chhoriye-pora meghguli gechhe miliye.
Shurjo uthhlo prachirer upore,
Chhoto hoye gelo gachher joto chhaya.
Khirkir dorja diye
Meyeti dhuklo bagane.
Pithe dulchhe jhalorwala beni,
Hate konchir chhori;
Chorate enechhe
Ekjora rajhansh,
Ar tar chhoto chhoto chhanagulike.
Hansh duto dampotto dayitter morjaday gombhir,
Shokoler cheye gurutoro oi meyietir dayitto
Jibopraner dabi spondoman
Chhoto oi matrimoner snehoroshe.
Ajker ei shokaltukuke
Ichchhe korechhi rekhe dite.
O eshechhe onayishe,
Onayishei jabe chole.
Jhini dilen pathiye
Tini agei er mullo diyeechhen shodh ko’re
Apon anondo-bhandar theke.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রাত্যহিকতার জীবন্ত রূপ ও ঋতুসন্ধি:
    “ভোরের আলো-আঁধারে / থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক / যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি। / … চৈত্রমাস ঠেকল এসে শেষ হপ্তায়। / আকাশে ভাসা বসন্তের নৌকোয় / পাল পড়েছে ঢিলে হয়ে।”
    — কোকিলের ডাককে শব্দের আতশবাজির সঙ্গে তুলনা করে কবি ভোরের সূচনা এঁকেছেন। একই সাথে চৈত্রান্তের আগমনে বসন্তের বিদায়লগ্নের রুক্ষতা—শুকনো বাতাস, রোদ ও ফুলের সংকুচিত রূপ—প্রকৃতির রূপান্তরের বাস্তব ছবি তুলে ধরে।
  • শিল্প বনাম জীবন্ত প্রকৃতির বৈপরীত্য:
    “গেরুয়া পাথরের চতুর্মুখ মূর্তি। / সে আছে প্রবহমান কালের দূর তীরে / উদাসীন; / ঋতুর স্পর্শ লাগে না তার গায়ে। / শিল্পের ভাষা তার, / গাছপালার বাণীর সঙ্গে কোনো মিল নেই।”
    — পাথরের চতুর্মুখ ভাস্কর্যটি কালের ঊর্ধ্বে চিরস্থায়ী হলেও তা মৃত, স্থবির। প্রকৃতির শিরা-উপশিরায় যে প্রাণরস ও শুশ্রূষা প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে, পাথরটি সেই সজীব আত্মীয়তার বাইরে। মানবনির্মিত শিল্প অনেক সময় প্রকৃতির অবারিত প্রাণধারার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে একা হয়ে পড়ে।
  • প্রাণের সহজ মাধুর্য ও অহৈতুকী আনন্দ:
    “জীবপ্রাণের দাবি স্পন্দমান / ছোট ঐ মাতৃমনের স্নেহরসে। / আজকের এই সকালটুকুকে / ইচ্ছে করেছি রেখে দিতে। / … যিনি দিলেন পাঠিয়ে / তিনি আগেই এর মূল্য দিয়েছেন শোধ ক’রে / আপন আনন্দ-ভাণ্ডার থেকে।”
    — হাঁসের ছানাদের পাহারা দেওয়া ছোট্ট মেয়েটির মাতৃস্নেহের মধ্য দিয়ে জীবনের সহজ ধারাটি সবচেয়ে গভীরভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। সকালের এই সুন্দর মুহূর্তগুলো কোনো বৈষয়িক লেনদেনের অধীন নয়; পরম স্রষ্টা তাঁর অসীম আনন্দের অংশ হিসেবে নিখরচায় এ উপহার মানুষকে দান করেছেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন