আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

চৈতালী কাব্যগ্রন্থের ‘ঐশ্বর্য’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক, নিসর্গচেতনা ও কৃত্রিম ঐশ্বর্যের অসারতা তুলে ধরার চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘ঐশ্বর্য’। প্রকৃতির অতি তুচ্ছ তৃণদলের সাথে অনন্ত মহাবিশ্বের যে সহজ আত্মীয়তা ও চিরন্তন যোগসূত্র রয়েছে, তার বিপরীতে মানুষের রুদ্ধদ্বারের কৃত্রিম ধনদৌলত কতটা ক্ষণভঙ্গুর, নিঃসঙ্গ ও অর্থহীন—এ কবিতায় তারই এক তীক্ষ্ণ নৈতিক মূল্যায়ন ঘটেছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামঐশ্বর্য
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থচৈতালী (চিত্রা-চৈতালি পর্ব)
রচনাকাল/প্রকাশের বছরআশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনচতুর্দশপদী সনেটধর্মী দার্শনিক ও নীতিচেতনার কবিতা (Philosophical Nature Sonnet)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৬ সালে শিলাইদহে পদ্মা বোটের ওপর অবস্থানকালে রচিত ‘চৈতালী’ কাব্যের সনেটগুলোতে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন পল্লীপ্রকৃতির সারল্য ও বিশ্বচরাচরের সাথে প্রাণের নিবিড় মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। প্রকৃতির একটি অতি ক্ষুদ্র ঘাসের কণা বা তৃণদলের দিকে তাকালে দেখা যায়, সে কোনো কৃত্রিম অহংকার ছাড়াই ভোরের সূর্য কিংবা রাতের চাঁদের সাথে একই মহাজাগতিক আসনে সমান মর্যাদায় বসে থাকে। কবির সৃষ্টিশীল গানও প্রকৃতির এই সহজ ধারার সাথে একাত্ম হয়ে শ্রাবণের বৃষ্টি ও বনের মর্মরের মাঝে আপনার ঘর খুঁজে পায়। কিন্তু ধনকুবের বা বিলাসী মানুষের সঞ্চিত ঐশ্বর্য রুদ্ধ ঘরের অন্ধকূপে একাকী বন্দি থাকে; সেখানে প্রকৃতির আলো-বাতাস বা নিখিলের কোনো আশীর্বাদ পৌঁছায় না। মৃত্যুর এক ফুৎকারে সেই সমস্ত কৃত্রিম সম্পদের অহংকার মুহূর্তেই মিথ্যা ও পাংশুবর্ণ হয়ে মিলিয়ে যায়।

সম্পূর্ণ কবিতা:

ক্ষুদ্র এই তৃণদল ব্রহ্মাণ্ডের মাঝে
সরল মাহাত্ম্য লয়ে সহজে বিরাজে।
পূরবের নবসূর্য, নিশীথের শশী,
তৃণটি তাদেরি সাথে একাসনে বসি।
আমার এ গান এও জগতের গানে
মিশে যায় নিখিলের মর্মমাঝখানে;
শ্রাবণের ধারাপাত, বনের মর্মর
সকলের মাঝে তার আপনার ঘর।
কিন্তু, হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের ভার
ক্ষুদ্র রুদ্ধদ্বারে শুধু একাকী তোমার।
নাহি পড়ে সূর্যালোক, নাহি চাহে চাঁদ,
নাহি তাহে নিখিলের নিত্য আশীর্বাদ।
সম্মুখে দাঁড়ালে মৃত্যু মুহূর্তেই হায়
পাংশুপাণ্ডু শীর্ণম্লান মিথ্যা হয়ে যায়।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Khudro ei trinodol brohmander majhe
Shorol mahatmyo loye shohoje biraje.
Purober nobosurjo, nishither shoshi,
Trinoti taderi sathe ekashone bosi.
Amar e gan eo jogoter gane
Mishe jay nikhiler mormomajhkhane;
Shraboner dharapat, boner mormor
Shokoler majhe tar aponar ghor.
Kintu, he bilashi, tobo oishorjer bhar
Khudro ruddhodware shudhu ekaki tomar.
Nahi pore shurjalok, nahi chahe chand,
Nahi tahe nikhiler nitto ashirbad.
Shommukhe danrale mrittu muhurtei hay
Pangshupandu shirnomlan mittha hoye jay.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • তৃণদলের সহজ মাহাত্ম্য ও বিশ্বযোগ:
    “ক্ষুদ্র এই তৃণদল ব্রহ্মাণ্ডের মাঝে / সরল মাহাত্ম্য লয়ে সহজে বিরাজে। / পূরবের নবসূর্য, নিশীথের শশী, / তৃণটি তাদেরি সাথে একাসনে বসি।”
    — আপাতদৃষ্টিতে একটি ঘাসের ডগা অতি তুচ্ছ মনে হলেও মহাবিশ্বের কাছে তার অস্তিত্বের মূল্য সূর্য বা চন্দ্রের চেয়ে কম নয়। সে প্রকৃতির অংশ হয়ে কোনো অহংকার ছাড়াই মহাজাগতিক সৃষ্টির সাথে একাসনে আসন গ্রহণ করে।
  • কাব্য ও প্রকৃতির সুরের আত্মীয়তা:
    “আমার এ গান এও জগতের গানে / মিশে যায় নিখিলের মর্মমাঝখানে; / শ্রাবণের ধারাপাত, বনের মর্মর / সকলের মাঝে তার আপনার ঘর।”
    — কবির শিল্পসৃষ্টিও প্রকৃতির এই সহজতারই অংশ। বর্ষার বৃষ্টি বা বাতাসের মর্মরধ্বনির মতোই কবির গান সমগ্র বিশ্বের অন্তরঙ্গ সুরে অনায়াসে স্থান করে নেয়, কারণ তা নিখিলের সাথে বন্ধনযুক্ত।
  • পার্থিব ঐশ্বর্যের অসারতা ও মৃত্যুর আঘাত:
    “কিন্তু, হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের ভার / ক্ষুদ্র রুদ্ধদ্বারে শুধু একাকী তোমার। / … সম্মুখে দাঁড়ালে মৃত্যু মুহূর্তেই হায় / পাংশুপাণ্ডু শীর্ণম্লান মিথ্যা হয়ে যায়।”
    — মানুষ যখন ধনদৌলত ও বিলাসের বোঝা নিয়ে অহংকার করে, তখন সে নিজেকে সমস্ত বিশ্বজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি রুদ্ধ ঘরে বন্দি করে ফেলে। এই সঞ্চয় কৃত্রিম ও আত্মকেন্দ্রিক হওয়ায় নিখিলের কোনো আশীর্বাদ এতে থাকে না। সর্বগ্রাসী মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে সেই জাঁকজমক মুহূর্তেই সমস্ত দীপ্তি হারিয়ে বিবর্ণ ও মিথ্যা প্রমাণ হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির অনাবশ্যক হাইফেন ও যুক্তবর্ণের ভুল পরিহারপূর্বক প্রমিত রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত