বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর মর্মস্পর্শী, করুণরসে সমৃদ্ধ ও মাতৃত্বচেতনানির্ভর কবিতা হলো ‘দরিদ্রা’। এই কবিতায় ধরিত্রী মায়ের অপার স্নেহ, তাঁর অন্তহীন ত্যাগতিতিক্ষা, দারিদ্র্যের মাঝেও সন্তানের প্রতি তাঁর বুকভরা ভালোবাসা এবং বিষাদের এক অপূর্ব রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | দরিদ্রা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সোনার তরী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-নির্ভর, মাতৃত্ববাদী ও মরমী গীতি-কবিতা (Nature-conscious, Maternal and Mystical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে কবির মানবপ্রেম ও প্রকৃতিচেতনা এক গভীর রূপ লাভ করেছে। ‘দরিদ্রা’ কবিতায় কবি এই ধরণী বা পৃথিবীকে একজন দুঃখিনী, দরিদ্রা মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। সংসারের সমস্ত অভাব ও কষ্ট সত্ত্বেও যিনি তিল তিল করে নিজের রস-রক্ত দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করেন। এই পৃথিবীর রূপ যতই সুন্দর হোক না কেন, তার পেছনে রয়েছে এক গভীর বেদনা ও অশ্রুজল—যা এই কবিতাকে এক অনন্য দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতা দিয়েছে।
দরিদ্রা কবিতা (সম্পূর্ণ)
দরি-দ্রা বলিয়া তোরে বেশি ভালোবাসি
হে ধরিত্রী, স্নেহ তোর বেশি ভালো লাগে,
বেদনাকাতর মুখে সকরুণ হাসি,
দেখে মোর মর্ম-মাঝে বড়ো ব্যথা জাগে।
আপনার বক্ষ হতে রস-রক্ত নিয়ে
প্রাণটুকু দিয়েছিস সন্তানের দেহে,
অহর্নিশি মুখে তার আছিস তাকিয়ে,
অমৃত নারিস দিতে প্রাণপণ স্নেহে।
কত যুগ হতে তুই বর্ণগন্ধগীতে
সৃজন করিতেছিস আনন্দ-আবাস,
আজো শেষ নাহি হল দিবসে নিশীথে–
স্বর্গ নাই, রচেছিস স্বর্গের আভাস।
তাই তোর মুখখানি বিষাদ-কোমল,
সকল সৌন্দর্যে তোর ভরা অশ্রুজল।
দরিদ্রা কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
দরিদ্রা ধরণীর প্রতি বিশেষ টান:
“দরি-দ্রা বলিয়া তোরে বেশি ভালোবাসি / হে ধরিত্রী, স্নেহ তোর বেশি ভালো লাগে, / বেদনা-কাতর মুখে সকরুণ হাসি, / দেখে মোর মর্ম-মাঝে বড়ো ব্যথা জাগে।”
— এই পৃথিবী বাহ্যিকভাবে দরিদ্র ও রিক্ত মনে হতে পারে, কিন্তু তার এই দুঃখিনী রূপ ও সকরুণ হাসির আড়ালে যে গভীর স্নেহ লুকিয়ে আছে, কবি তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন এবং তাঁর হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠেছে।
মায়ের ত্যাগের রূপ:
“আপনার বক্ষ হতে রস-রক্ত নিয়ে / প্রাণটুকু দিয়েছিস সন্তানের দেহে, / অহর্নিশি মুখে তার আছিস তাকিয়ে, / অমৃত নারিস দিতে প্রাণপণ স্নেহে।”
— একজন দরিদ্র মা যেমন নিজের কষ্ট সহ্য করেও সন্তানকে মুখে তুলে খাওয়ান এবং তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, এই ধরিত্রীও ঠিক তেমনই নিজের বুক চিরে সন্তানকে প্রাণ দান করেছেন এবং সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রাণপণ স্নেহে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
স্বর্গের আভাস ও বেদনার রূপ:
“কত যুগ হতে তুই বর্ণগন্ধগীতে / সৃজন করিতেছিস আনন্দ-আবাস, / আজো শেষ নাহি হল দিবসে নিশীথে– / স্বর্গ নাই, রচেছিস স্বর্গের আভাস। / তাই তোর মুখখানি বিষাদ-কোমল, / সকল সৌন্দর্যে তোর ভরা অশ্রুজল।”
— যুগ যুগ ধরে ফুল, পাখি ও প্রকৃতির বর্ণ-গন্ধের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবী যে আনন্দলোক রচনা করেছে, তা স্বর্গের চেয়েও সুন্দর। কিন্তু এত সৃষ্টির পরেও তার সেই অপূর্ণতা ও কষ্টের অন্ত নেই। তাই এই পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যের গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিষাদ-কোমল রূপ এবং চোখের জলের অমলিন ধারা।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।







![প্রকৃতি পর্ব ১৬ – মধ্যদিনে যবে গান [ Madhyadine Jobe Gan Gaan ] প্রকৃতি পর্ব ১৬ - মধ্যদিনে যবে গান [ Madhyadine Jobe Gan Gaan ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/মধ্যদিনে-যবে-গান-1024x576.gif)
![ভালোবেসে সখী নিভৃতে [ Bhalobese sokhi nibhrite jatane ] প্রেম ৩৪ ভালোবেসে সখী নিভৃতে [ Bhalobese sokhi nibhrite jatane ] প্রেম ৩৪](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/11/ভালোবেসে-সখী-নিভৃতে-1024x536.gif)
![ভগ্নহৃদয় চতুর্থ সর্গ bhagno hriday chothurtho sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগ্নহৃদয় চতুর্থ সর্গ bhagno hriday chothurtho sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভগ্নহৃদয়-চতুর্থ-সর্গ-bhagno-hriday-chothurtho-sorgo-কবিতা--1024x536.gif)