বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম ম্রিয়মাণ, রূপকধর্মী ও গভীর আবেগময় লিরিক কবিতা হলো ‘একটি মাত্র’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় তীব্র তৃষ্ণা, মরুভূমির মতো শুষ্ক জীবনের পটভূমিতে সামান্য প্রাপ্তি বা আশার প্রতীক হিসেবে একটিমাত্র আঙুর ফলের গল্প এবং পরিশেষে তা হারিয়ে যাওয়ার বেদনা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | একটি মাত্র |
| কবি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও রূপকধর্মী লিরিক কবিতা (Romantic and Allegorical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক বিশেষ চঞ্চল ও মননশীল সময়ের সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের হালকা-ফুলকা আনন্দের পাশাপাশি মাঝে মাঝে মানবজীবনের অতৃপ্তি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব এবং গভীর মরমী বেদনাও প্রকাশ পেয়েছে। ‘একটি মাত্র’ কবিতায় কবি এক ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত পথিকের প্রতীক হয়ে মরুভূমি ও শুষ্ক বনের মধ্যে একটিমাত্র আঙুর ফল পাওয়ার গল্প বলেছেন—যা মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল বা অমূল্য প্রাপ্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তা রক্ষা করা যায় না।
একটি মাত্র – সম্পূর্ণ কবিতা
গিরিনদী বালির মধ্যে
যাচ্ছে বেঁকে বেঁকে,
একটি ধারে স্বচ্ছ ধারায়
শীর্ণ রেখা এঁকে।
মরু-পাহাড়-দেশে
শুষ্ক বনের শেষে
ফিরেছিলেম দুই প্রহরে
দগ্ধ চরণতল।
বনের মধ্যে পেয়েছিলেম
একটি আঙুর ফল।
রৌদ্র তখন মাথার ‘পরে
পায়ের তলায় মাটি
জলের তরে কেঁদে মরে
তৃষায় ফাটি ফাটি।
পাছে ক্ষুধার ভরে
তুলি মুখের ‘পরে
আকুল ঘ্রাণে নিই নি তাহার
শীতল পরিমল।
রেখেছিলেম লুকিয়ে আমার
একটি আঙুর ফল।
বেলা যখন পড়ে এল,
রৌদ্র হল রাঙা,
নিশ্বাসিয়া উঠল হু হু
ধূ ধূ বালুর ডাঙা–
থাকতে দিনের আলো
ঘরে ফেরাই ভালো,
তখন খুলে দেখনু চেয়ে
চক্ষে লয়ে জল
মুঠির মাঝে শুকিয়ে আছে
একটি আঙুর ফল।
একটি মাত্র Romanized Version
Girinodi balir modhye
Jachche benke benke,
Ekti dhare shachchho dharay
Shirno rekha enke.
Moru-pahar-deshe
Shushko boner sheshe
Firechhilam dui prohore
Dogdho choron-tol.
Boner modhye peyechhilam
Ekti angur fol.
Roudro tokhon mathar ‘pore
Payer tolay mati
Joler tore kende more
Trishay fati fati.
Pachhe khudhar bhore
Tuli mukher ‘pore
Akul ghrane ni ni tahar
Shitol porimol.
Rekhechhilam lukiye amar
Ekti angur fol.
Bela jokhon pore elo,
Roudro holo ranga,
Nishshiya uthlo hu hu
Dhu dhu balur danga–
Thakte diner alo
Ghore ferai bhalo,
Tokhon khule dekhnu cheye
Chokhe loye jol
Muthi-r majhe shukiye ache
Ekti angur fol.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- তৃষ্ণার্ত জীবন ও পরম প্রাপ্তি:
“মরু-পাহাড়-দেশে / শুষ্ক বনের শেষে / ফিরেছিলেম দুই প্রহরে / দগ্ধ চরণতল। / বনের মধ্যে পেয়েছিলেম / একটি আঙুর ফল।”— মরুভূমি সদৃশ রুক্ষ ও শুষ্ক জীবনের পথে চলতে চলতে ক্লান্ত পথিক হঠাৎ বনের মধ্যে একটিমাত্র আঙুর ফল খুঁজে পায়। চরম তৃষ্ণার্ত সময়ে এটি তার একমাত্র সান্ত্বনা ও অমূল্য সম্পদ।
- সংযম ও আকুল অপেক্ষা: আঙুর ফলটি এতই প্রিয় ও মূল্যবান যে, অতিরিক্ত ক্ষুধার তাড়নায় তৎক্ষণাৎ তা খেয়ে না ফেলে পথিক পরম যত্নে ও ঘ্রাণে তা মুঠোয় লুকিয়ে রাখে—ভাবir বিষয়, সঠিক সময়ে পরম তৃপ্তিতে তা ভোগ করবে।
- প্রাপ্তির অবসান ও শূন্যতা:
“তখন খুলে দেখনু চেয়ে / চক্ষে লয়ে জল / মুঠির মাঝে শুকিয়ে আছে / একটি আঙুর ফল।”— কিন্তু সময় গড়িয়ে যখন দিনশেষে সে মুঠো খুলে দেখে, তখন জীবনের নির্মম বাস্তবতায় সেই কাঙ্ক্ষিত আঙুর ফলটি আর তাজা থাকে না; মুঠোর মাঝে তা শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের জীবনে চরম প্রাপ্তি বা আশাগুলো অনেক সময়ই অধরা থেকে যায়—এই সুগভীর বেদনাবোধই এই কবিতার মূল বার্তা।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।