শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৭ সংখ্যক কবিতা হলো ‘অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া’। রক্তমাংসের মরণশীল দেহের খাঁচায় বন্দি মানবাত্মার দেহাতীত অসীমে মুক্তির আকুলতা, সুদূরপ্রসারী অজানার ডাক এবং মাটির নিচে সুপ্ত বীজের অঙ্কুরোদ্গমের মতো আত্মিক সম্ভাবনার প্রকাশ এ কবিতায় গভীর দার্শনিক উপলব্ধিতে মূর্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামঅঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া (৭ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও আধ্যাত্মিক দার্শনিক লিরিক (Philosophical Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে সীমার মাঝে অসীমের সাধনা এবং দেহের আবরণে সুপ্ত আত্মার অন্তর্লীন আর্তিকে তুলে ধরেছেন। মানুষের প্রাণ পার্থিব দেহের বাঁধনে আবদ্ধ থাকলেও তার অন্তরের সূক্ষ্ম চেতনা বারবার সীমানা পেরিয়ে যেতে চায়। খাঁচায় বন্দি পাখি যেমন খাঁচায় থেকেই তার পূর্বস্মৃতির অরণ্যমর্মর প্রকাশ করে, মানবচৈতন্যও তেমনি প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের ওপারে থাকা এক পরম সত্যকে স্পর্শ করতে ব্যাকুল হয়। মাটির অন্ধকারে সুপ্ত বীজ যেমন অনাগত পুষ্পিত রূপের স্বপ্ন দেখে, অপূর্ণ মানবসত্তাও তেমনি ভবিষ্যতে পরম সত্যে উন্মোচিত হওয়ার বিশ্বাসে স্পন্দিত হয়।

সম্পূর্ণ কবিতা:

অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া আমার প্রাণ

আকস্মিক চেতনার নিবিড়তায়

চঞ্চল হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে,

তখন কোন্‌ কথা জানাতে তার এত অধৈর্য।

–যে কথা দেহের অতীত।

খাঁচার পাখির কণ্ঠে যে বাণী

সে তো কেবল খাঁচারি নয়,

তার মধ্যে গোপনে আছে সুদূর অগোচরের অরণ্য-মর্মর,

আছে করুণ বিস্মৃতি।

সামনে তাকিয়ে চোখের দেখা দেখি–

এ তো কেবলি দেখার জাল-বোনা নয়।–

বসুন্ধরা তাকিয়ে থাকেন নির্নিমেষে

দেশ-পারানো কোন্‌ দেশের দিকে,

দিগ্বলয়ের ইঙ্গিতলীন

কোন্‌ কল্পলোকের অদৃশ্য সংকেতে।

দীর্ঘপথ ভালোমন্দয় বিকীর্ণ,

রাত্রিদিনের যাত্রা দুঃখসুখের বন্ধুর পথে।

শুধু কেবল পথ চলাতেই কি এ পথের লক্ষ্য?

ভিড়ের কলরব পেরিয়ে আসছে গানের আহ্বান,

তার সত্য মিলবে কোন্‌খানে?

মাটির তলায় সুপ্ত আছে বীজ।

তাকে স্পর্শ করে চৈত্রের তাপ,

মাঘের হিম, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা।

অন্ধকারে সে দেখছে অভাবিতের স্বপ্ন।

স্বপ্নেই কি তার শেষ?

উষার আলোয় তার ফুলের প্রকাশ;

আজ নেই, তাই বলে কি নেই কোনোদিনই?

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ongger bandhone bandhapora amar pran
Akossmik chetonar nibirotay
Chonchol hoye othe khone khone,
Tokhon kon kotha janate tar eto odhoirjo.
–Je kotha deher otit.
Khanchar pakhir konthe je bani
She to kebol khanchari noy,
Tar moddhye gopone achhe shudur ogochorer oronno-mormor,
Achhe korun bismriti.
Shamne takiye chokher dekha dekhi–
E to keboli dekhar jal-bona noy.–
Boshundhora takiye thaken nirnimeshe
Desh-parano kon desher dike,
Digboloyer inggitolin
Kon kolpoloker odrishsho shongkete.
Dirghopoth bhalomondoy bikirno,
Ratridiner jatra dukkhoshukher bondhur pothe.
Shudhu kebol poth cholatei ki e pother lokkho?
Bhirer kolorob periye ashchhe ganer ahwan,
Tar shotto milbe konkhane?
Matir tolay shupto achhe bij.
Take shporsho kore Choitrer tap,
Magher him, Shraboner brishtidhara.
Ondhokare she dekhchhe obhabiter swopno.
Swopnei ki tar shesh?
Ushar aloy tar phuler prokash;
Aj nei, tai bole ki nei konodini?

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • দেহের বন্ধন ও দেহাতীত চেতনা:
    “অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া আমার প্রাণ / আকস্মিক চেতনার নিবিড়তায় / চঞ্চল হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে, / … যে কথা দেহের অতীত।”
    — মানুষ দৈহিক কাঠামোর ভেতর আবদ্ধ হলেও তার অন্তরের প্রাণসত্তা আকস্মিক আত্মিক আলোড়নে চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে এমন এক পরম সত্য বা অনুভূতি প্রকাশ করতে ব্যাকুল হয়, যা রক্তমাংসের স্থূল সীমানার অতীত।
  • খাঁচার পাখি ও বসুন্ধরার রূপক:
    “খাঁচার পাখির কণ্ঠে যে বাণী / সে তো কেবল খাঁচারি নয়, / তার মধ্যে গোপনে আছে সুদূর অগোচরের অরণ্য-মর্মর, / আছে করুণ বিস্মৃতি।”
    — খাঁচায় বন্দি পাখি যেমন সম্পূর্ণ খাঁচার নয়—তার কণ্ঠে অরণ্যের স্মৃতি অনুরণিত হয়, তেমনি মানবাত্মাও নিছক পার্থিব জগতের নয়। এই ধরিত্রীও দৃশ্যমান জগতের ওপারে দিগন্তলীন কোনো এক কল্পলোকের ইশারার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
  • সুপ্ত বীজ ও পরম সার্থকতা:
    “মাটির তলায় সুপ্ত আছে বীজ। / … অন্ধকারে সে দেখছে অভাবিতের স্বপ্ন। / স্বপ্নেই কি তার শেষ? / উষার আলোয় তার ফুলের প্রকাশ; / আজ নেই, তাই বলে কি নেই কোনোদিনই?”
    — মাটির নিচের অন্ধকারের বীজ যেমন তাপ, শৈত্য ও বৃষ্টির মধ্য দিয়ে গোপনে প্রস্ফুটনের স্বপ্ন দেখে, মানবপ্রাণের যাত্রাও কেবল দুঃখ-সুখের বন্ধুর পথে হেঁটে চলায় শেষ হয় না। বর্তমান মুহূর্তে রূপহীন থাকলেও উষার আলোয় প্রস্ফুটিত ফুলের মতো একদিন অন্তরের সত্যও পূর্ণ মহিমায় প্রকাশিত হবে—এই পরম আশাবাদেই কবিতার সমাপ্তি।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন