Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | শীতের রোদ্দুর (২৩ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও অস্তিত্ববাদী দার্শনিক লিরিক (Existential / Philosophical Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
শীতের রোদ্দুর।
সোনা-মেশা সবুজের ঢেউ
স্তম্ভিত হয়ে আছে সেগুন বনে।
বেগনি-ছায়ার ছোঁওয়া-লাগা
ঝুরি-নামা বৃদ্ধ বট
ডাল মেলেছে রাস্তার ওপার পর্যন্ত।
ফলসাগাছের ঝরা পাতা
হঠাৎ হাওয়ায় চমকে বেড়ায় উড়ে
ধুলোর সাঙাত হয়ে।
কাজ-ভোলা এই দিন
উধাও বলাকার মতো
লীন হয়ে চলেছে নিঃসীম নীলিমায়।
ঝাউগাছের মর্মরধ্বনিতে মিশে
মনের মধ্যে এই কথাটি উঠছে বেজে,
“আমি আছি।”
কুয়োতলার কাছে
সামান্য ঐ আমের গাছ;
সারা বছর ও থাকে আত্মবিস্মৃত,
বনের সাধারণ সবুজের আবরণে
ও থাকে ঢাকা।
এমন সময় মাঘের শেষে
হঠাৎ মাটির নিচে
শিকড়ে শিকড়ে তার শিহর লাগে,
শাখায় শাখায় মুকুলিত হয়ে ওঠে বাণী–
“আমি আছি,”
চন্দ্রসূর্যের আলো আপন ভাষায়
স্বীকার করে তার সেই ভাষা।
অলস মনের শিয়রে দাঁড়িয়ে
হাসেন অন্তর্যামী,
হঠাৎ দেন ঠেকিয়ে সোনার কাঠি
প্রিয়ার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি দিয়ে,
কবির গানের সুর দিয়ে,
তখন যে-আমি ধূলিধূসর সামান্য দিনগুলির
মধ্যে মিলিয়ে ছিল,
সে দেখা দেয় এক নিমেষের অসমান্য আলোকে।
সে-সব দুর্মূল্য নিমেষ
কোনো রত্নভাণ্ডারে থেকে যায় কি না জানিনে;
এইটুকু জানি–
তারা এসেছে আমার আত্মবিস্মৃতির মধ্যে,
জাগিয়েছে আমার মর্মে
বিশ্বমর্মের নিত্যকালের সেই বাণী
“আমি আছি।”
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- শীতের স্তব্ধ নিসর্গ ও অস্তিত্বের অনুরণন:“কাজ-ভোলা এই দিন / উধাও বলাকার মতো / লীন হয়ে চলেছে নিঃসীম নীলিমায়। / ঝাউগাছের মর্মরধ্বনিতে মিশে / মনের মধ্যে এই কথাটি উঠছে বেজে, / ‘আমি আছি।'”— সেগুনবনের রোদ, বটের ছায়া আর ঝাউগাছের বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি এক পরম বিশ্রামের স্তব্ধতায় ডুবে যায়। সেই বাহ্যিক নীরবতার ভেতরেই কবির অন্তরে প্রবলভাবে বেজে ওঠে অস্তিত্বের মৌলিকতম উপলব্ধি—’আমি আছি’।
- আমগাছের জাগরণ ও প্রকৃতির স্বীকৃতি:“সারা বছর ও থাকে আত্মবিস্মৃত, / … এমন সময় মাঘের শেষে / হঠাৎ মাটির নিচে / শিকড়ে শিকড়ে তার শিহর লাগে, / শাখায় শাখায় মুকুলিত হয়ে ওঠে বাণী– / ‘আমি আছি,'”— কুয়োতলার সাধারণ আমগাছটি সারা বছর নিজের বিশেষত্ব ভুলে থাকে। কিন্তু মাঘের শেষে বসন্তের আগমনে মুকুলিত হয়ে সে নিজের অনন্য অস্তিত্ব ঘোষণা করে, আর আকাশ-বাতাসও সেই বাণীর মর্যাদা দেয়।
- সোনার কাঠির স্পর্শ ও আত্ম-আবিষ্কার:“তখন যে-আমি ধূলিধূসর সামান্য দিনগুলির / মধ্যে মিলিয়ে ছিল, / সে দেখা দেয় এক নিমেষের অসমান্য আলোকে। / … জাগিয়েছে আমার মর্মে / বিশ্বমর্মের নিত্যকালের সেই বাণী / ‘আমি আছি।'”— প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ধুলায় ঢাকা পড়ে থাকা মানুষের সাধারণ জীবন প্রেমিকার মুগ্ধ দৃষ্টি কিংবা গানের সুরের মতো ‘সোনার কাঠির’ ছোঁয়ায় হঠাৎ দিব্য মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এই ক্ষণিক অনুভূতিই মানুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শাশ্বত অস্তিত্বের সাথে একাত্ম করিয়ে দেয়।