পলাতকা কাব্যগ্রন্থের হারিয়ে-যাওয়া কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ভাবগম্ভীর কবিতা হলো ‘হারিয়ে-যাওয়া’। গৃহকোণে প্রদীপ নিভে এক শিশুর সাময়িক অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আর্তনাদকে কবি এখানে মহাজাগতিক রূপকে উন্নীত করেছেন—যেখানে অনন্ত নীলাকাশে নক্ষত্রের আলো বাঁচিয়ে চলা বিশ্বচৈতন্যের অস্তিত্বের সংকট ও চিরন্তন বিস্ময় এক সূত্রে গ্রথিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামহারিয়ে-যাওয়া
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপলাতকা
প্রকাশের বছর১৯১৮ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআখ্যানমূলক মনস্তাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক লিরিক (Cosmic Allegorical Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ আটপৌরে কথ্যরীতির পয়ার ছন্দে সংসারের প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা থেকে চিরন্তন ভাবসত্যের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। কন্যাসম এক ছোট্ট মেয়ের হাতের প্রদীপ নিভে যাওয়া এবং অন্ধকারে ভীত হয়ে তার কাতর উক্তি—”হারিয়ে গেছি আমি”—কবির মনে এক গভীর ভাবান্তর সৃষ্টি করে। ছাদ থেকে রাতের তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে কবি উপলব্ধি করেন, এই সমগ্র সৃষ্টিও যেন অনন্ত মহাশূন্যের অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আলোর এক শিখা বাঁচিয়ে নিঃসঙ্গ পথ চলছে; সেই আলোকশিখা নিভে গেলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বই অন্ধকারে হারিয়ে কেঁদে উঠবে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

              ছোট্ট আমার মেয়ে

         সঙ্গিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে

     সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে

         অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে থেমে থেমে।

             হাতে ছিল প্রদীপখানি,

     আঁচল দিয়ে আড়াল ক’রে চলছিল সাবধানী।

              আমি ছিলাম ছাতে

         তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে।

         হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে, উঠে

             দেখতে গেলেম ছুটে।

                 সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে

         প্রদীপটা তার নিবে গেছে বাতাসেতে।

               শুধাই তারে, “কী হয়েছে, বামী।”

সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, “হারিয়ে গেছি আমি।”

              তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে

                   ফিরে গিয়ে ছাতে

               মনে হল আকাশপানে চেয়ে

আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে

               নীলাম্বরের আঁচল্‌খানি ঘিরে

   দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।

      নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি

আকাশ ভরে উঠত কেঁদে, “হারিয়ে গেছি আমি।”

 

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

          Chhotto amar meye
     Shongginider dak shunte peye
 Shinri diye nicher tolay jachchhilo she neme
     Ondhokare bhoye bhoye theme theme.
         Hate chhilo prodipkhani,
 Anchol diye aral ko're cholchhilo shabdhani.
          Ami chhilam chhate
     Taray bhora Choitromasher rate.
     Hothat meyer kanna shune, uthe
         Dekhte gelem chhute.
             Shinrir moddhye jete jete
     Prodipta tar nibe gechhe batashete.
           Shudhai tare, "Ki hoyechhe, Bami."
She kende koy niche theke, “Hariye gechhi ami.”
Taray bhora Choitromasher rate
Phire giye chhate
Mone holo akashpane cheye
Amar Bamir motoi jeno omni ke ek meye
Nilamborer ancholkhani ghire
Dipshikhati banchiye eka cholchhe dhire dhire.
Niboto jodi alo, jodi hothat jeto thami
Akash bhore uthto kende, “Hariye gechhi ami.”
হারিয়ে-যাওয়া hariye jaoya [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • আলোর বিলোপ ও অস্তিত্বের সংকট:
    “সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে / প্রদীপটা তার নিবে গেছে বাতাসেতে। / শুধাই তারে, ‘কী হয়েছে, বামী।’ / সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, ‘হারিয়ে গেছি আমি।'”
    — আলো যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ চারপাশের স্থান ও নিজের অস্তিত্ব সুস্পষ্ট থাকে। কিন্তু আলো নিভে যাওয়া মাত্রই ভৌগোলিকভাবে চেনা ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থেকেও বালিকাটি সম্পূর্ণ দিকভ্রান্ত হয়ে নিজের অস্তিত্বকেই হারানো বলে ঘোষণা করে।
  • ক্ষুদ্র গৃহকোণ থেকে মহাজাগতিক রূপক:
    “মনে হল আকাশপানে চেয়ে / আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে / নীলাম্বরের আঁচল্‌খানি ঘিরে / দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।”
    — কবির দৃষ্টি সিঁড়ির অন্ধকার থেকে আকাশের মহাশূন্যে প্রসারিত হয়। নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশ যেন নীল বসন পরিহিতা এক মহাজাগতিক বালিকা, যে অনন্ত অন্ধকারের মহাসমুদ্রে আলো বাঁচিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে।
  • মহাজাগতিক আলোর শাশ্বত দ্যোতনা:
    “নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি / আকাশ ভরে উঠত কেঁদে, ‘হারিয়ে গেছি আমি।'”
    — যদি কোনোদিন এই মহাবিশ্বের নক্ষত্রালোক বা সৃষ্টির প্রাণশিখা স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই এক পরম শূন্যতা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে একই অস্তিত্বহীনতার হাহাকারে কেঁদে উঠবে। একটি সাধারণ পারিবারিক মুহূর্তের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসৃষ্টির আলো ও অন্ধকারের শাশ্বত সত্যকে উন্মোচন করেছেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পলাতকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন