পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের শালিখ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধুনিক গদ্যরীতির পথপ্রদর্শক কাব্যগ্রন্থ ‘পুনশ্চ’-এর একটি অসাধারণ সংবেদনশীল, মনস্তাত্ত্বিক ও নিঃসঙ্গতাবোধের কবিতা হলো ‘শালিখ’। মানুষের সমাজজীবনের মতোই পক্ষীকুলের মাঝেও নির্বাসন, একাকীত্ব ও আত্মমর্যাদার যে নীরব বেদনা লুকিয়ে থাকে—এক দলছুট, খুঁড়িয়ে চলা সাধারণ শালিখের রূপকে এ কবিতায় তা অপরিসীম মমতায় উন্মোচিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশালিখ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক নিসর্গ-লিরিক (Psychological Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র ও অবহেলিত প্রাণীদের অন্তর্জগৎকে মানবিক অনুভূতির আলোকে নিরীক্ষণ করেছেন। কবির শান্তিনিকেতনের বাগানে প্রতিদিন সকালে দেখা মেলে এক সঙ্গীহারা, খুঁড়িয়ে চলা শালিখের। অন্য শালিখেরা যখন দল বেঁধে কোলাহল ও লাফালাফিতে মত্ত, এই পাখিটি তখন সম্পূর্ণ নির্বিকার ও উদাসীন। কোনো কৃত্রিম বৈরাগ্যের ভান বা নালিশ ছাড়াই সে নিজের ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু দিনের আলোর এই প্রশান্ত নির্লিপ্ততার আড়ালে সন্ধ্যার অন্ধকারে একাকী বাসায় ফিরে যাওয়ার যে অব্যক্ত হাহাকার লুকিয়ে থাকতে পারে, কবি দূর আকাশের একাকী সন্ধ্যাতারার রূপকে সেই নীরব বেদনার গভীরতা অনুভব করেছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

শালিখটার কী হল তাই ভাবি।

        একলা কেন থাকে দলছাড়া।

    প্রথম দিন দেখেছিলেম শিমুল গাছের তলায়,

               আমার বাগানে,

    মনে হল একটু যেন খুঁড়িয়ে চলে।

তার পরে ওই রোজ সকালে দেখি–

        সঙ্গীহারা, বেড়ায় পোকা শিকার ক’রে।

           উঠে আসে আমার বারান্দায়–

        নেচে নেচে করে সে পায়চারি,

           আমার ‘পরে একটুকু নেই ভয়।

                   কেন এমন দশা।

সমাজের কোন্‌ শাসনে নির্বাসনের পালা,

               দলের কোন্‌ অবিচারে

                   জাগল অভিমান।

    কিছু দূরেই শালিখগুলো

           করছে বকাবকি,

        ঘাসে ঘাসে তাদের লাফালাফি,

উড়ে বেড়ায় শিরীষ গাছের ডালে ডালে–

        ওর দেখি তো খেয়াল কিছুই নেই।

জীবনে ওর কোন্‌খানে যে গাঁঠ পড়েছে

        সেই কথাটাই ভাবি।

সকালবেলার রোদে যেন সহজ মনে

        আহার খুঁটে খুঁটে

    ঝরে-পড়া পাতার উপর

        লাফিয়ে বেড়ায় সারাবেলা।

    কারো উপর নালিশ কিছু আছে

        মনে হয় না একটুও তা।

    বৈরাগ্যের গর্ব তো নেই ওর চলনে,

           কিম্বা দুটো আগুন-জ্বলা চোখ।

    কিন্তু ওকে দেখি নি তো সন্ধেবেলায়–

           একলা যখন যায় বাসাতে ডালের কোণে,

        ঝিল্লি যখন ঝিঁ ঝিঁ করে অন্ধকারে,

           হাওয়ায় আসে বাঁশের পাতার ঝর্‌ঝরানি।

               গাছের ফাঁকে তাকিয়ে থাকে

                          ঘুমভাঙানো

                   সঙ্গীবিহীন সন্ধ্যাতারা।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Shalikhtar ki holo tai bhabi.
Ekla keno thake dolchhara.
Prothom din dekhechhilem shimul gachher tolay,
Amar bagane,
Mone holo ektu jeno khunriye chole.
Tar pore oi roj shokale dekhi–
Shonggihara, beray poka shikar ko’re.
Uthe ashe amar baranday–
Neche neche kore she paychari,
Amar ‘pore ektuku nei bhoy.
Keno emon dosha.
Shomajer kon shashone nirbashoner pala,
Doler kon obichare
Jaglo obhiman.
Kichhu durei shalikhgulo
Korchhe bokaboki,
Ghashe ghashe tader laphalaphi,
Ure beray shirish gachher dale dale–
Or dekhi to kheyal kichhui nei.
Jibone or konkhane je ganth porechhe
Shei kothatai bhabi.
Shokalbelar rode jeno shohoj mone
Ahar khunte khunte
Jhore-pora patar upor
Laphiye beray sharabela.
Karo upor nalish kichhu achhe
Mone hoy na ektuo ta.
Boiragger gorbo to nei or cholone,
Kimba duto agun-jwala chokh.
Kintu oke dekhi ni to shondhebelay–
Ekla jokhon jay bashate daler kone,
Jhilli jokhon jhin jhin kore ondhokare,
Haway ashe bansher patar jhorjhorani.
Gachher phanke takiye thake
Ghumbhangano
Shonggibihin shondhyatara.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • দলছুট নিঃসঙ্গতা ও মানবিক কল্পনা:
    “সমাজের কোন্‌ শাসনে নির্বাসনের পালা, / দলের কোন্‌ অবিচারে / জাগল অভিমান। / কিছু দূরেই শালিখগুলো / করছে বকাবকি, / … ওর দেখি তো খেয়াল কিছুই নেই।”
    — একটি পাখির নির্জন আচরণে কবি মানবসমাজের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও বর্জনের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। মানুষের সমাজে যেমন নিয়মভাঙা বা শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিকে সমাজ একঘরে করে দেয়, এই পাখিটির ক্ষেত্রেও দলের কোনো অবিচার বা অভিমান কাজ করেছে কি না, কবি তা মমতাভরে ভেবেছেন।
  • সহজ চলন ও নালিশহীন আত্মমর্যাদা:
    “কারো উপর নালিশ কিছু আছে / মনে হয় না একটুও তা। / বৈরাগ্যের গর্ব তো নেই ওর চলনে, / কিম্বা দুটো আগুন-জ্বলা চোখ।”
    — পাখিটির আচরণে কোনো উগ্র ক্রোধ, ক্ষোভ কিংবা অহংকারী ত্যাগের আড়ম্বর নেই। সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সকালের রোদে ঝরা পাতার ওপর আহার খুঁজে ফেরে। এই নালিশহীন নির্লিপ্ততাই তার নিঃসঙ্গতাকে এক শান্ত আত্মমর্যাদা দান করেছে।
  • সন্ধ্যার অন্ধকার ও একাকী তারার প্রতীক:
    “কিন্তু ওকে দেখি নি তো সন্ধেবেলায়– / একলা যখন যায় বাসাতে ডালের কোণে, / … গাছের ফাঁকে তাকিয়ে থাকে / ঘুমভাঙানো / সঙ্গীবিহীন সন্ধ্যাতারা।”
    — দিনের কোলাহলে নিঃসঙ্গতাকে আড়াল করা গেলেও রাতের আঁধারে তা গভীর হয়। বাঁশপাতার ঝরঝরানি আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মাঝে ডালের কোণে একাকী আশ্রয় নেওয়া শালিখটির দিকে চেয়ে থাকে আকাশের একাকী সন্ধ্যাতারা। সৃষ্টির এই চিরন্তন নিঃসঙ্গতাকে এক সূত্রে গেঁথে কবিতাটি শেষ হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন