বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর, রূপকধর্মী ও বেদনাবিধুর কবিতা (যা রবীন্দ্রসংগীত হিসেবেও সমাদৃত) হলো ‘আলো নাই, দিন শেষ হল’। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় দিনের শেষে ক্লান্ত পথিকের বিশ্রাম খোঁজা এবং মানবজীবনের অন্তিম যাত্রার এক শাশ্বত রূপক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী সুরে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আলো নাই, দিন শেষ হল |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী, অতীন্দ্রিয় ও গীতিমূলক লিরিক কবিতা (Allegorical, Mystical and Lyrical Poem/Song) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে জীবন, মৃত্যু ও অসীমের প্রতি মানবাত্মার আকুলতা গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘আলো নাই, দিন শেষ হল’ কবিতায় কবি মানবজীবনকে একটি দীর্ঘ যাত্রাপথ হিসেবে কল্পনা করেছেন। দিনশেষে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ যখন ঘরে ফিরে বিশ্রামের আয়োজন করে, তখনো এক ‘বিদেশী পান্থ’ বা ক্লান্ত পথিক তার জীবনের বোঝা নিয়ে অন্তহীন পথে হেঁটে চলে। এই পথিক মূলত আমাদের মানবাত্মা, আর দিনশেষ হলো জীবনের অন্তিম পর্যায়। মানুষের চিরন্তন একাকিত্ব ও পরম বিশ্রামের সন্ধানের কথাই এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে বলা হয়েছে।
আলো নাই, দিন শেষ হল – সম্পূর্ণ কবিতা
আ-লো নাই, দিন শেষ হল, ওরে
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
ঘন্টা বাজিল দূরে
ও পারের রাজপুরে,
এখনো যে পথে চলেছিস তুই
হায় রে পথশ্রান্ত
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
দেখ্ সবে ঘরে ফিরে এল, ওরে
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
পূজা সারি দেবালয়ে
প্রসাদী কুসুম লয়ে,
এখন ঘুমের কর্ আয়োজন
হায় রে পথশ্রান্ত
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
রজনী আঁধার হয়ে আসে, ওরে
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
ওই-যে গ্রামের ‘পরে
দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে–
দীপহীন পথে কী করিবি একা
হায় রে পথশ্রান্ত
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
এত বোঝা লয়ে কোথা যাস, ওরে
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
নামাবি এমন ঠাঁই
পাড়ায় কোথা কি নাই।
কেহ কি শয়ন রাখে নাই পাতি
হায় রে পথশ্রান্ত
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
পথের চিহ্ন দেখা নাহি যায়
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
কোন্ প্রান্তরশেষে
কোন্ বহুদূর দেশে
কোথা তোর রাত হবে যে প্রভাত
হায় রে পথশ্রান্ত
পান্থ, বিদেশী পান্থ।
Romanized Version
A-lo nai, din shesh holo, ore
Pantho, bideshi pantho.
Ghonta bajilo dure
O parer rajpure,
Ekhono je pothe cholechhish tui
Hay re pothshranto
Pantho, bideshi pantho.
Dekh shobe ghore phire elo, ore
Pantho, bideshi pantho.
Puja shari debaloye
Proshadi kushum loye,
Ekhon ghumer kor ayojon
Hay re pothshranto
Pantho, bideshi pantho.
Rojoni andhar hoye ashe, ore
Pantho, bideshi pantho.
Oi-je gramer ‘pore
Dip jwole ghore ghore–
Diphin pothe ki koribi eka
Hay re pothshranto
Pantho, bideshi pantho.
Eto bojha loye kotha jash, ore
Pantho, bideshi pantho.
Namabi emon thain
Paray kotha ki nai.
Keho ki shoyon rakhe nai pati
Hay re pothshranto
Pantho, bideshi pantho.
Pother chinho dekha nahi jay
Pantho, bideshi pantho.
Kon prantorsheshe
Kon bohudur deshe
Kotha tor rat hobe je probhat
Hay re pothshranto
Pantho, bideshi pantho.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- জীবনের দিনাবসান ও ক্লান্ত পথিক:
“আ-লো নাই, দিন শেষ হল, ওরে / পান্থ, বিদেশী পান্থ। / ঘন্টা বাজিল দূরে / ও পারের রাজপুরে,”— কবিতার শুরুতেই দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা মানবজীবনের অন্তিম লগ্ন বা বার্ধক্যের প্রতীক। সুদূরের রাজপ্রাসাদে বেজে ওঠা ঘণ্টা যেন পরপারের বা অনন্তের ডাক, যা ক্লান্ত পথিকের (বিদেশী পান্থ) জাগতিক যাত্রার সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়।
- বিশ্রামের আয়োজন ও একাকিত্ব:
“দেখ্ সবে ঘরে ফিরে এল, ওরে… / পূজা সারি দেবালয়ে / প্রসাদী কুসুম লয়ে, / এখন ঘুমের কর্ আয়োজন”— চারপাশের মানুষ যখন দেবালয়ে পুজো শেষে প্রসাদ নিয়ে ঘরে ফিরে ঘুমের আয়োজন করছে, তখনো সেই পথশ্রান্ত পথিক একাকী অন্ধকার পথে হেঁটে চলেছে। এই দৃশ্য মানুষের পার্থিব ব্যস্ততা শেষে পরম শান্তির আশ্রয়ের অভাব ও আত্মার নিদারুণ একাকিত্বকে তুলে ধরে।
- অচেনা গন্তব্য ও অন্তহীন যাত্রা:
“পথের চিহ্ন দেখা নাহি যায়… / কোন্ প্রান্তরশেষে / কোন্ বহুদূর দেশে / কোথা তোর রাত হবে যে প্রভাত”— পথিক এত বোঝা নিয়ে কোথায় যাচ্ছে, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। পথ চিহ্নহীন, প্রান্তর অসীম। কবে তার এই অন্ধকার রাতের প্রভাত হবে বা সে শান্তির ঘুম ঘুমাবে, সেই ব্যাকুল জিজ্ঞাসার মাধ্যমেই মানবাত্মার অন্তহীন যাত্রার শাশ্বত সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে। (বি.দ্র. আপনার প্রদত্ত পাঠের বিন্যাস এবং পাবলিক ডোমেইনে থাকা রবীন্দ্রনাথের রচনার সম্পূর্ণ প্রামাণ্য রূপটিই এখানে অপরিবর্তিতভাবে তুলে ধরা হলো)।