গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ‘আজ বারি ঝরে ঝর ঝর’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র একটি অন্যতম গতিশীল, প্রকৃতি-প্রেমমূলক ও আধ্যাত্মিক বর্ষাবন্দনার লিরিক কবিতা (এবং গান) হলো ‘আজ বারি ঝরে ঝর ঝর’। ১৯১০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় ভাদ্র মাসের প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ের তাণ্ডবের সাথে মানবহৃদয়ের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এবং পরম সত্তার রুদ্র রূপের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআজ বারি ঝরে ঝর ঝর
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থগীতাঞ্জলি
প্রকাশের বছর১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি-প্রেমমূলক, আধ্যাত্মিক ও বর্ষাবন্দনার লিরিক কবিতা (Nature, Spiritual and Monsoon Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে বর্ষা ঋতু এক বিশেষ ও গভীর স্থান দখল করে আছে। ‘আজ বারি ঝরে ঝর ঝর’ কবিতায় শ্রাবণের শান্ত রূপের বদলে ভাদ্র মাসের উন্মত্ত ও রুদ্র রূপের প্রকাশ ঘটেছে। বাইরের প্রকৃতির প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, শালের বনে বাতাসের মাতামাতি এবং আকাশ-ভাঙা জলের ধারা যেন কবির অন্তরেও এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির এই উন্মাতাল রূপের মাঝেই কবি পরম ঈশ্বরের মহাদেব-সম ‘নটরাজ’ রূপের (মেঘের জটা উড়িয়ে নৃত্য) উপস্থিতি অনুভব করেছেন, যাঁর প্রলয় নাচের তালে কবির নিজের হৃদয়ও পাগলপারা হয়ে উঠেছে।

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর – সম্পূর্ণ কবিতা

আজ        বারি-ঝরে ঝর ঝর

                                   ভরা বাদরে।

                            আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা

                                   কোথাও না ধরে।

                            শালের বনে থেকে থেকে

                            ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে,

                            জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে

                                   মাঠের ‘পরে।

              আজ        মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে

                                   নৃত্য কে করে।

ওরে        বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন,

                    লুটেছে ওই ঝড়ে,

              বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর

                    কাহার পায়ে পড়ে।

                           অন্তরে আজ কী কলরোল,

                           দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,

                           হৃদয়-মাঝে জাগল পাগল

                                  আজি ভাদরে।

               আজ              এমন করে কে মেতেছে

                                  বাহিরে ঘরে।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Aj bari jhore jhor jhor
Bhora badore.
Akash-bhanga akul dhara
Kothao na dhore.
Shaler bone theke theke
Jhor dola dey henke henke,
Jol chhute jay enkebenke
Mather ‘pore.
Aj megher jota uriye diye
Nrityo ke kore.
Ore brishtite mor chhutechhe mon,
Lutechhe oi jhore,
Buk chhapiye torongo mor
Kahar paye pore.
Ontore aj ki kolorol,
Dware dware bhanglo agol,
Hridoy-majhe jaglo pagol
Aji bhadore.
Aj emon kore ke metechhe
Bahire ghore.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ভাদ্রের রুদ্র প্রকৃতি:
“আজ বারি ঝরে ঝর ঝর / ভরা বাদরে। / আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা / কোথাও না ধরে।”
— ভাদ্র মাসের আকাশে মেঘ ভেঙে প্রবল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির এই অবারিত ধারা চারপাশের প্রকৃতিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কোথাও যেন এই বিপুল জলের ঠাঁই হচ্ছে না।
  • প্রকৃতি ও পরম সত্তার নটরাজ রূপ:
“শালের বনে থেকে থেকে / ঝড় দোলা দেয়… আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে / নৃত্য কে করে।”
— শালবনে ঝড়ের মাতামাতি দেখে কবির মনে হচ্ছে যেন পরম ঈশ্বর মহাদেবের মতো মেঘের জটা উড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে প্রলয় নৃত্য করছেন।
  • অন্তরের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস:
“বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর / কাহার পায়ে পড়ে। / অন্তরে আজ কী কলরোল, / দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,”
— বাইরের প্রকৃতির উন্মাদনার মতো কবির অন্তরের সমস্ত বাঁধ বা আগলও আজ ভেঙে গেছে। তাঁর উন্মত্ত হৃদয় যেন পাগলের মতো ছুটে গিয়ে সেই পরম নটরাজের পায়ে আছড়ে পড়তে চাইছে। বাইরে ও ভেতরে একাকার হয়ে যাওয়া এই উন্মত্ততাই কবিতার মূল আকর্ষণ।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত ‘আজবারি’ এবং ‘বারি-ঝরে’ অংশের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেন ও ত্রুটি পরিহার করে ‘আজ বারি ঝরে’ হিসেবে মূল পাঠ উপস্থাপন করা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন