বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দর্শনমূলক ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়’। এই কবিতায় মানবজীবনকে একটি সুবিশাল নাট্যমঞ্চ বা ‘নাট-বেদী’ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে মোহমুক্ত হয়ে দূর থেকে জীবনের খেলা অবলোকন করার মাঝেই প্রকৃত অর্থ নিহিত।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায় |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দর্শনমূলক ও রূপকধর্মী লিরিক কবিতা (Philosophical and Allegorical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায় – সম্পূর্ণ কবিতা
আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়,
আঁধারেতে চলে যায় বাহিরে।
ভাবে মনে, বৃথা এই আসা আর যাওয়া,
অর্থ কিছুই এর নাহি রে।
কেন আসি, কেন হাসি,
কেন আঁখিজলে ভাসি,
কার কথা বলে যাই, কার গান গাহি রে–
অর্থ কিছুই তার নাহি রে।
ওরে মন, আয় তুই সাজ ফেলে আয়,
মিছে কী করিস নাট-বেদীতে।
বুঝিতে চাহিস যদি বাহিরেতে আয়,
খেলা ছেড়ে আয় খেলা দেখিতে।
ওই দেখ্ নাটশালা
পরিয়াছে দীপমালা,
সকল রহস্য তুই চাস যদি ভেদিতে
নিজে না ফিরিলে নাট-বেদীতে।
নেমে এসে দূরে এসে দাঁড়াবি যখন–
দেখিবি কেবল, নাহি খুঁজিবি,
এই হাসি-রোদনের মহানাটকের
অর্থ তখন কিছু বুঝিবি।
একের সহিত একে
মিলাইয়া নিবি দেখে,
বুঝে নিবি, বিধাতার সাথে নাহি যুঝিবি–
দেখিবি কেবল, নাহি খুঁজিবি।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- জীবনের নাট্যমঞ্চ ও অর্থহীনতার ভ্রান্তি:
“আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়, / আঁধারেতে চলে যায় বাহিরে। / ভাবে মনে, বৃথা এই আসা আর যাওয়া,”— কবিতাটিতে মানবজীবনকে একটি নাটকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ‘আলোকে’ বা পৃথিবীতে এসে লীলা করা বলতে মানুষের জন্ম ও কর্মময় জীবনকে বোঝানো হয়েছে এবং ‘আঁধারেতে’ চলে যাওয়া বলতে মৃত্যুকে নির্দেশ করা হয়েছে। মানুষ যখন কেবলই জাগতিক কর্মকাণ্ডে ডুবে থাকে, তখন তার মনে হয় জীবনের এই হাসি-কান্না, আসা-যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।
- মোহমুক্তি ও নির্লিপ্ততা:
“ওরে মন, আয় তুই সাজ ফেলে আয়, / মিছে কী করিস নাট-বেদীতে। / বুঝিতে চাহিস যদি বাহিরেতে আয়, / খেলা ছেড়ে আয় খেলা দেখিতে।”— জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে জাগতিক মোহ ও অহংকারের ‘সাজ’ ফেলে দিতে হবে। নিজেকে কেবলই ঘটনাক্রমের অংশ বা অভিনেতা না ভেবে, জীবনের এই ‘নাট-বেদী’ থেকে একটু দূরে সরে এসে একজন নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কবি।
- মহানাটকের অর্থ সন্ধান ও আত্মসমর্পণ:
“নেমে এসে দূরে এসে দাঁড়াবি যখন– / দেখিবি কেবল, নাহি খুঁজিবি, / এই হাসি-রোদনের মহানাটকের / অর্থ তখন কিছু বুঝিবি। … বুঝে নিবি, বিধাতার সাথে নাহি যুঝিবি–“— যখন মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে এই হাসি-কান্নার মহানাটকের সামগ্রিক রূপটি দেখবে, তখন আর সে বৃথা প্রশ্ন করবে না। জীবনের প্রতিটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে (একের সহিত একে) একসাথে মিলিয়ে দেখলেই সে জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারবে এবং বুঝতে পারবে যে বিধাতার অমোঘ বিধানের সাথে বৃথা যুদ্ধ (যুঝিবি) করার কোনো মানে নেই।