Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | মহুয়া (নামকবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | নিসর্গপ্রধান রোমান্টিক লিরিক ও রূপকধর্মী কাব্যভাষ্য (Nature-Romantic Lyric / Titular Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
![]()
সম্পূর্ণ কবিতা:
বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি।
নাহি ঘুচিবে কি
অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান।
ক্লান্ত কি হবে না কবিগান
মালতীর মল্লিকার
অভ্যর্থনা রচি বারম্বার?
রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার,
উচ্চশিরে তবু রাজকুলবনিতার
গৌরব রাখিস ঊর্ধ্বে ধরে।
আমি তো দেখেছি তোরে
বনস্পতিগোষ্ঠী-মাঝে অরণ্যসভায়
অকুণ্ঠিত মর্যাদায়
আছিস দাঁড়ায়ে;
শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে
শাল তাল সপ্তপর্ণ অশ্বত্থের সাথে
প্রথম প্রভাতে
সূর্য-অভিনন্দনের তুলেছিস গম্ভীর বন্দন।
অপ্রসন্ন আকাশের ভ্রূভঙ্গে যখন
অরণ্য উদ্বিগ্ন করি তোলে,
সেই কালবৈশাখীর ক্রুদ্ধ কলরোলে
শাখাব্যূহে ঘিরে
আশ্বাস করিস দান শঙ্কিত বিহঙ্গ অতিথিরে।
অনাবৃষ্টিক্লিষ্ট দিনে,
বিশীর্ণ বিপিনে,
বন্যবুভুক্ষুর দল ফেরে রিক্ত পথে,
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তারা তোর সদাব্রতে।
বহুদীর্ঘ সাধনায় সুদৃঢ় উন্নত
তপস্বীর মতো
বিলাসের চাঞ্চল্যবিহীন,
সুগম্ভীর সেই তোরে দেখিয়াছি অন্যদিন
অন্তরে অধীরা
ফাল্গুনের ফুলদোলে কোথা হতে জোগাস মদিরা
পুষ্পপুটে;
বনে বনে মৌমাছিরা চঞ্চলিয়া উঠে।
তোর সুরাপাত্র হতে বন্যনারী
সম্বল সংগ্রহ করে পূর্ণিমার নৃত্যমত্ততারই।
রে অটল, রে কঠিন,
কেমনে গোপনে রাত্রিদিন
তরল যৌবনবহ্নি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভরে।
কানে কানে কহি তোরে–
বধূরে যেদিন পাব, ডাকিব “মহুয়া’ নাম ধরে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রচলিত সাহিত্যসংস্কারের প্রত্যাখ্যান:“বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি। / নাহি ঘুচিবে কি / অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান। / ক্লান্ত কি হবে না কবিগান / মালতীর মল্লিকার / অভ্যর্থনা রচি বারম্বার?”— বাংলা ও সংস্কৃত কাব্যে অশোক, কিংশুক ও মল্লিকার মতো ফুলগুলোর যে একাধিপত্য, কবি তা থেকে মুক্তি চেয়েছেন। অভিজাত প্রসাধনপ্রিয় ফুলের বিপরীতে বুনো মহুয়াকে সামনে এনে তিনি এক মৌলিক সৌন্দর্যচেতনার সূচনা করেন।
- মহীরুহের আত্মমর্যাদা ও কল্যাণব্রত:“বনস্পতিগোষ্ঠী-মাঝে অরণ্যসভায় / অকুণ্ঠিত মর্যাদায় / আছিস দাঁড়ায়ে; / … দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তারা তোর সদাব্রতে।”— মহুয়া কেবল ফুল নয়, সে শাল-তাল-অশ্বত্থের মতো বিশাল বনস্পতিদের সমান মর্যাদায় সূর্যের বন্দনা গায়। কালবৈশাখীর ঝড়ে পাখিদের বুকে আগলে রাখা এবং অনাবৃষ্টিতে দুর্ভিক্ষপীড়িত বনবাসীদের খাদ্য জুগিয়ে সে জীবনের অতন্দ্র আশ্রয়ে পরিণত হয়।
- তপস্যার অন্তরালে যৌবনবহ্নি:“রে অটল, রে কঠিন, / কেমনে গোপনে রাত্রিদিন / তরল যৌবনবহ্নি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভরে। / কানে কানে কহি তোরে– / বধূরে যেদিন পাব, ডাকিব ‘মহুয়া’ নাম ধরে।”— বাইরে থেকে মহুয়া কঠোর ও অটল তপস্বীর মতো শান্ত হলেও ফাল্গুনে তার পুষ্পপুটে সঞ্চিত হয় তরল আগুনের মতো উন্মাদিনী সুরা, যা বন্য নারীর রক্তে নাচের নেশা জাগায়। নারীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ সংযম এবং অন্তরের সুপ্ত প্রণয়োচ্ছ্বাসের এই সমন্বয়কেই কবি তাঁর প্রেমাস্পদের শ্রেষ্ঠ রূপ মনে করেন।