বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর অতীন্দ্রিয় ও রোমান্টিক চেতনার কবিতা হলো ‘অনুমান’। এই কবিতায় দৃষ্টির আড়ালে থাকা পরম প্রিয়তম বা ঈশ্বরের রহস্যময় উপস্থিতি এবং তাঁর মিলনের প্রতীক্ষাকে এক অপূর্ব কল্পনার তুলিতে আঁকা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অনুমান |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | অতীন্দ্রিয় প্রেম ও রূপকধর্মী গীতি-কবিতা (Mystical, Romantic and Allegorical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
অনুমান – সম্পূর্ণ কবিতা
পাছে দেখি তুমি আস নি, তাই
আধেক আঁখি মুদিয়ে চাই,
ভয়ে চাই নে ফিরে।
আমি দেখি যেন আপন-মনে
পথের শেষে দূরের বনে
আসছ তুমি ধীরে।
যেন চিনতে পারি সেই অশান্ত
তোমার উত্তরীয়ের প্রান্ত
ওড়ে হাওয়ার ‘পরে।
আমি একলা বসে মনে গণি
শুনছি তোমার পদধ্বনি
মর্মরে মর্মরে।
ভোরে নয়ন মেলে অরুণরাগে
যখন আমার প্রাণে জাগে
অকারণের হাসি,
যখন নবীন তৃণে লতায় গাছে
কোন্ জোয়ারের স্রোতে নাচে
সবুজ সুধারাশি–
যখন নব মেঘের সজল ছায়া
যেন রে কার মিলন-মায়া
ঘনায় বিশ্ব জুড়ে,
যখন পুলকে নীল শৈল ঘেরি
বেজে ওঠে কাহার ভেরী,
ধ্বজা কাহার উড়ে–
তখন মিথ্যা সত্য কেই-বা জানে,
সন্দেহ আর কেই-বা মানে,
ভুল যদি হয় হোক!
ওগো, জানি না কি আমার হিয়া
কে ভুলালো পরশ দিয়া,
কে জুড়ালো চোখ।
সে কি তখন আমি ছিলেম একা,
কেউ কি মোরে দেয় নি দেখা।
কেউ আসে নাই পিছে?
তখন আড়াল হতে সহাস আঁখি
আমার মুখে চায় নি নাকি।
এ কি এমন মিছে।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি কল্পনা:
“পাছে দেখি তুমি আস নি, তাই / আধেক আঁখি মুদিয়ে চাই… আমি একলা বসে মনে গণি / শুনছি তোমার পদধ্বনি / মর্মরে মর্মরে।”— প্রিয়তম হয়তো আসেননি, এই ভয়ে কবি পুরোপুরি চোখ মেলতে চান না। তিনি নিজের মনেই কল্পনা করেন যে দূরের বন দিয়ে তাঁর প্রিয়তম ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন, বাতাসে তাঁর উত্তরীয় উড়ছে এবং পাতার মর্মর ধ্বনিতে তাঁর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
- প্রকৃতিতে পরম সত্তার প্রকাশ:
“ভোরে নয়ন মেলে অরুণরাগে… অকারণের হাসি… যখন নব মেঘের সজল ছায়া / যেন রে কার মিলন-মায়া / ঘনায় বিশ্ব জুড়ে,”— ভোরবেলার স্নিগ্ধ আলো, ঘাসের ডগায় প্রাণের জোয়ার কিংবা আকাশে ঘনীভূত হওয়া সজল মেঘ—প্রকৃতির এই প্রতিটি রূপের মাঝেই কবি তাঁর প্রিয়তমের ‘মিলন-মায়া’ এবং এক স্বর্গীয় স্পর্শ অনুভব করেন, যা তাঁর মনে অকারণ হাসির সঞ্চার করে।
- অনুমানের সত্যতা ও তৃপ্তি:
“তখন মিথ্যা সত্য কেই-বা জানে, / সন্দেহ আর কেই-বা মানে, / ভুল যদি হয় হোক! … আড়াল হতে সহাস আঁখি / আমার মুখে চায় নি নাকি। / এ কি এমন মিছে।”— কবির এই অনুভূতিগুলো সত্যি নাকি নিছকই কল্পনা (অনুমান), তা নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাতে চান না। তাঁর হৃদয় যে এক অদৃশ্য পরশে জুড়িয়ে গেছে, সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সত্য। কেউ আড়াল থেকে হেসে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে—এই মধুর অনুভবটি কবির কাছে কখনোই মিথ্যা হতে পারে না।