উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘তুমি আছ হিমাচল’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দেশপ্রেম, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক চেতনার কবিতা হলো ‘তুমি আছ হিমাচল’। এই কবিতায় হিমালয় পর্বতমালাকে প্রাচীন ভারতের অনন্ত সঞ্চিত তপস্যা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামতুমি আছ হিমাচল
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদেশপ্রেম, প্রকৃতি-দর্শন ও আধ্যাত্মিক কবিতা (Patriotic, Philosophical and Spiritual Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রাচীন ভারতের তপোবনের মুনি-ঋষিদের সাধনা ও আধ্যাত্মিক শক্তির বন্দনা করেছেন। হিমালয়ের স্তব্ধতা, দুর্গম নির্জনতা এবং আকাশচুম্বী তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলো যেন যুগ যুগ ধরে ভারতের বুকে ধ্বনিত হওয়া ‘ওঁ’ কার বা পরম সত্যের মহাবার্তাই বিশ্ববাসীর কাছে নীরবে প্রচার করছে। এই কবিতায় পাহাড়ের নিশ্চল পাথর ও বরফের মাঝে প্রবহমান এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক শক্তির দর্শন ফুটে উঠেছে।

তুমি আছ হিমাচল – সম্পূর্ণ কবিতা

তুমি আছ হিমাচল পুরো কবিতা

তুমি আছ হিমা-চল ভারতের অনন্তসঞ্চিত

তপস্যার মতো। স্তব্ধ ভূমানন্দ যেন রোমাঞ্চিত

নিবিড় নিগূঢ়-ভাবের পথশূন্য তোমার নির্জনে,

নিষ্কলঙ্ক নীহারের অভ্রভেদী আত্মবিসর্জনে।

তোমার সহস্র শৃঙ্গ বাহু তুলি কহিছে নীরবে

ঋষির আশ্বাসবাণী, “শুন শুন বিশ্বজন সবে,

জেনেছি, জেনেছি আমি।’ যে ওঙ্কার আনন্দ-আলোতে

উঠেছিল ভারতের বিরাট গভীর বক্ষ হতে

আদি-অন্ত-বিহীনের অখণ্ড অমৃতলোক-পানে,

সে আজি উঠিছে বাজি, গিরি, তব বিপুল পাষাণে।

একদিন এ ভারতে বনে বনে হোমাগ্নি-আহুতি

ভাষাহারা মহাবার্তা প্রকাশিতে করেছে আকূতি,

সেই বহ্নিবাণী আজি অচল প্রস্তরশিখারূপে

শৃঙ্গে শৃঙ্গে কোন্‌ মন্ত্র উচ্ছ্বাসিছে মেঘধুম্রস্তূপে।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Tumi achho himachol bharoter onontoshonchito
Toposhshar moto. Stobdho bhumanondo jeno romanchito
Nibiro nigurho-bhaber pothoshunno tomar nirjone,
Nishkolonko niharer obhrobhedi atmobishorjone.
Tomar shohoshro shringo bahu tuli kohichhe nirobe
Rishir ashashbani, “Shuno shuno bishwojon shobe,
Jenechhi, jenechhi ami.’ Je onkar anondo-alote
Uthechhilo bharoter birat gobhir bokkho hote
Adi-onto-bihiner okhondo omritolok-pane,
She aji uthichhe baji, giri, tobo bipul pashane.
Ekdin e bharote bone bone homagni-ahuti
Bhashahara mohabarta prokashite korechhe akuti,
Shei bohnbani aji ochol proshtorshikharupe
Shringge shringge kon montro uchchhashichhe meghdhumrostupe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • হিমালয় ও ভারতের তপস্যা:
“তুমি আছ হিমাচল ভারতের অনন্তসঞ্চিত / তপস্যার মতো। স্তব্ধ ভূমানন্দ যেন রোমাঞ্চিত”
— হিমালয় পর্বতমালা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, কবির চোখে এটি ভারতের হাজার বছরের প্রাচীন মুনি-ঋষিদের নীরব তপস্যা ও সাধনার এক জমাটবদ্ধ রূপ। এর দুর্গম ও নিষ্কলঙ্ক তুষারাবৃত চূড়াগুলো যেন অহংকারহীন আত্মবিসর্জনের প্রতীক।
  • ওঙ্কার ও মহাবার্তা:
“যে ওঙ্কার আনন্দ-আলোতে / উঠেছিল ভারতের বিরাট গভীর বক্ষ হতে … সে আজি উঠিছে বাজি, গিরি, তব বিপুল পাষাণে।”
— প্রাচীনকালে ভারতের বুক থেকে আদি-অন্ত-বিহীন অমৃতলোকের সন্ধানে যে ‘ওঁ’ কার ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল, সেই শাশ্বত আধ্যাত্মিক বার্তাই যেন আজ হিমালয়ের বিশাল পাথরে পাথরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এর সহস্র চূড়া যেন হাত তুলে বিশ্ববাসীকে সত্য জানার আশ্বাসবাণী শোনাচ্ছে।
  • হোমাগ্নির শিখা ও প্রস্তররূপ:
“একদিন এ ভারতে বনে বনে হোমাগ্নি-আহুতি / ভাষাহারা মহাবার্তা প্রকাশিতে করেছে আকূতি, / সেই বহ্নিবাণী আজি অচল প্রস্তরশিখারূপে”
— প্রাচীন ভারতের তপোবনগুলোতে সত্যের সন্ধানে যে হোমাগ্নির আগুন জ্বালানো হতো, সেই আগুনের ঊর্ধ্বমুখী শিখাগুলোই যেন আজ কালের বিবর্তনে শক্ত পাথরের চূড়া বা পর্বতের রূপ ধারণ করে মেঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতার জন্য আপনার প্রদত্ত ‘হিমা-চল’ বা ‘নিগূঢ়-ভাবের’ অংশের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেনগুলো প্রামাণ্য রূপ অনুযায়ী পরিহার করা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন