বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছড়ার ছবি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শান্ত, সন্ধ্যা-চেতনানির্ভর ও ঘরহারা প্রবাসীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটিয়ে তোলা কবিতা হলো ‘ঘরের-খেয়া’। এই কবিতায় সন্ধ্যার আবছা আলোয় মাঝনদীতে বাঁধা নৌকো থেকে নিজের ঘর ও চেনা জনপদের দূরত্ব অনুভব করা এবং অন্যদের আপন ঠিকানায় ফিরে যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত মরমী ও সুনিপুণ ছন্দে তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ঘরের-খেয়া |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ছড়ার ছবি |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৭ (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | নিসর্গ-প্রকৃতি ও আত্মমগ্ন গীতি-কবিতা (Nature and Introspective Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘ছড়ার ছবি’ কাব্যগ্রন্থটিতে পল্লিপ্রকৃতির শান্ত রূপ এবং মানুষের অন্তরের নিভৃত আকুতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে। ‘ঘরের-খেয়া’ কবিতায় কবি সন্ধ্যার প্রাক্কালে নদী ও প্রান্তরের এক নির্জন দৃশ্য এঁকেছেন। শ্রাবণ-ভাদ্রের বর্ষা শেষে যখন খেতগুলো প্লাবনে ডুবে থাকে এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, তখন মাঝনদীতে নৌকো নিয়ে একা বসে থাকা কবির মনে আপন ঘরের ঠিকানা হারানোর বেদনা জাগে। আর অন্য নৌকাগুলো বা পরিযায়ী পাখিরা যখন ঠিক চেনা নীড় বা গাঁয়ের পানে ফিরে যায়, তখন সেই দৃশ্য কবির নিঃসঙ্গতাকে আরও গভীর করে তোলে।
ঘরের খেয়া কবিতা (সম্পূর্ণ)
সন্ধ্যা হয়ে আসে;
সোনা-মিশোল ধূসর আলো ঘিরল চারিপাশে।
নৌকোখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে
অস্তরবির কাছে নয়ন কী যেন ধন মাঙে।
আপন গাঁয়ে কুটীর আমার দূরের পটে লেখা,
ঝাপসা আভায় যাচ্ছে দেখা বেগনি রঙের রেখা।
যাব কোথায় কিনারা তার নাই,
পশ্চিমেতে মেঘের গায়ে একটু আভাস পাই।
হাঁসের দলে উড়ে চলে হিমালয়ের পানে,
পাখা তাদের চিহ্নবিহীন পথের খবর জানে।
শ্রাবণ গেল, ভাদ্র গেল, শেষ হল জল-ঢালা,
আকাশতলে শুরু হল শুভ্র আলোর পালা।
খেতের পরে খেত একাকার প্লাবনে রয় ডুবে,
লাগল জলের দোলযাত্রা পশ্চিমে আর পুবে।
আসন্ন এই আঁধার মুখে নৌকোখানি বেয়ে
যায় কারা ঐ, শুধাই, “ওগো নেয়ে,
চলেছ কোন্খানে।”
যেতে যেতে জবাব দিল, “যাব গাঁয়ের পানে।”
অচিন শূন্যে ওড়া পাখি চেনে আপন নীড়,
জানে বিজনমধ্যে কোথায় আপন জনের ভিড়।
অসীম আকাশ মিলেছে ওর বাসার সীমানাতে,
ঐ অজানা জড়িয়ে আছে জানাশোনার সাথে|
তেমনি ওরা ঘরের পথিক ঘরের দিকে চলে
যেথায় ওদের তুলসিতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে।
দাঁড়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে যায় ধীরে,
মিলায় সুদূর নীরে।
সেদিন দিনের অবসানে সজল মেঘের ছায়ে
আমার চলার ঠিকানা নাই, ওরা চলল গাঁয়ে।
ঘরের খেয়া কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
সন্ধ্যার নির্জনতা ও মাঝনদীর নৌকো:
“সন্ধ্যা হয়ে আসে; / সোনা-মিশোল ধূসর আলো ঘিরল চারিপাশে। / নৌকোখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে”
— সন্ধ্যার সোনালী ও ধূসর আলোয় চারপাশ যখন ঢেকে আসছে, তখন কবির নৌকোটি মাঝনদীতে বাঁধা রয়েছে। প্রকৃতির এই শান্ত ও মরমী রূপ কবির মনকে অন্তর্মুখী করে তোলে।
ঘরের দূরবর্তী রেখা ও অজানা যাত্রা:
“আপন গাঁয়ে কুটীর আমার দূরের পটে লেখা, / ঝাপসা আভায় যাচ্ছে দেখা বেগনি রঙের রেখা। / যাব কোথায় কিনারা তার নাই,”
— কবির আপন কুঁড়েঘরটি যেন দূরের কোনো ছবির মতো ঝাপসা আভায় বেগনি রেখায় দেখা যাচ্ছে। তার কোনো নির্দিষ্ট কিনারা বা যাওয়ার ঠিকানা নেই, কেবল পশ্চিমের মেঘের মাঝে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।
পাখিদের নীড়ে ফেরা ও পরিযায়ী স্বত্বা:
“হাঁসের দলে উড়ে চলে হিমালয়ের পানে, / পাখা তাদের চিহ্নবিহীন পথের খবর জানে।”
— রাজহাঁসের দল হিমালয়ের পানে উড়ে চলেছে। অচেনা পথে তাদের চলাার সঠিক নিশানা জানা আছে, ঠিক যেমন অচিন শূন্যে ওড়া পাখি নিজের নীড়কে চিনতে পারে।
অন্যদের ঘরের টানে ফেরা:
“আসন্ন এই আঁধার মুখে নৌকোখানি বেয়ে / যায় কারা ঐ, শুধাই, ‘ওগো নেয়ে, / চলেছ কোন্খানে।’ / যেতে যেতে জবাব দিল, ‘যাব গাঁয়ের পানে।'”
— সন্ধ্যার অন্ধকার নামার মুখে অন্য মানুষদের নৌকো বাইতে দেখে কবি যখন তাদের গন্তব্য জিজ্ঞেস করেন, তখন তারা উত্তর দেয় যে তারা তাদের নিজ গাঁয়ের পানে ফিরে চলেছে।
কবির গৃহহীনতা ও নিঃসঙ্গতা:
“সেদিন দিনের অবসানে সজল মেঘের ছায়ে / আমার চলার ঠিকানা নাই, ওরা চলল গাঁয়ে।”
— সবারই যখন নিজস্ব তুলসীতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে ওঠে এবং তারা ঘরের টানে ফিরে যায়, তখন দিন শেষের সজল মেঘের ছায়ায় কবির নিজের কোনো নির্দিষ্ট চলার ঠিকানা থাকে না—এই গভীর হাহাকার ও নিঃসঙ্গতাই কবিতার মূল বার্তা।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ছড়ার ছবি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![আতঙ্ক atonko [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আতঙ্ক atonko [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/আতঙ্ক-atonko-1024x536.gif)





![খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের বাদশার মুখখানা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাদশার মুখখানা কবিতা [ খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Badshar mukhkhana kobita ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2024/03/বাদশার-মুখখানা-কবিতা-1-1024x536.gif)