বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতালি’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর মরমী, প্রলয়-চেতনানির্ভর ও রূপান্তরকামী গীতি-কবিতা হলো ‘যেতে যেতে একলা পথে’। এই কবিতায় জীবনের দীর্ঘ একা যাত্রাপথে বাতি নিভে যাওয়ার পর ঝড়ের মতো বিপদের মুখোমুখি হয়ে তাকেই সঙ্গী করে নেওয়ার এবং পুরোনো পথ হারিয়ে এক নতুন ও অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | যেতে যেতে একলা পথে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতালি |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধ্যাত্মিক, সংকট ও রূপান্তরভিত্তিক গীতি-কবিতা (Spiritual, Crisis and Transformation-based Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
যেতে যেতে একলা পথে কবিতা (সম্পূর্ণ)
যেতে -যেতে একলা পথে
নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে, ওরে, এবার
ঝড়কে পেলেম সাথি।
আকাশ-কোণে সর্বনেশে
ক্ষণে ক্ষণে উঠছে হেসে,
প্রলয় আমার কেশে বেশে
করছে মাতামাতি।
যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম
ভুলিয়ে দিল তারে,
আবার কোথা চলতে হবে
গভীর অন্ধকারে।
বুঝি বা এই বজ্ররবে
নূতন পথের বার্তা কবে,
কোন্ পুরীতে গিয়ে তবে
প্রভাত হবে রাতি।

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
বাতি নিভে যাওয়া ও ঝড়কে সাথী করা:
“যেতে -যেতে একলা পথে / নিবেছে মোর বাতি। / ঝড় এসেছে, ওরে, এবার / ঝড়কে পেলেম সাথি।”
— জীবনের একা চলার পথে যখন সমস্ত আলো বা প্রদীপ নিভে যায়, তখন বাহ্যিক কোনো সহায় সম্বল থাকে না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ঝড় এসে উপস্থিত হয়, সাধক তখন সেই বিপদ বা ঝড়কেই নিজের সাথী বানিয়ে নেয়।
প্রলয়ের মাতামাতি ও পুরোনো পথ হারানো:
“আকাশ-কোণে সর্বনেশে / ক্ষণে ক্ষণে উঠছে হেসে, / প্রলয় আমার কেশে বেশে / করেছে মাতামাতি। / যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম / ভুলিয়ে দিল তারে,”
— আকাশে সর্বনাশা প্রলয় যেন ক্ষণে ক্ষণে হেসে ওঠে এবং কবির সমস্ত সত্তা ও বেশভূষাকে গ্রাস করে মাতামাতি শুরু করে। এই ঝড়ের আঘাতে এতদিন যে চেনা পথে চলা হচ্ছিল, সে পথও সম্পূর্ণ মুছে বা ভুলে যায়।
গভীর অন্ধকারে নতুন পথের সন্ধান:
“আবার কোথা চলতে হবে / গভীর অন্ধকারে। / বুঝি বা এই বজ্ররবে / নূতন পথের বার্তা কবে, / কোন্ পুরীতে গিয়ে তবে / প্রভাত হবে রাতি।”
— পুরোনো পথ হারিয়ে এখন এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নতুন যাত্রার ডাক আসে। এই প্রলয় ও বজ্রপতনের মধ্য দিয়েই হয়তো কোনো নতুন পথের বার্তা লুকিয়ে আছে। রাতের বুক চিরে শেষ পর্যন্ত কোন অজানা পুরীতে গিয়ে নতুন প্রভাতের আলো ফুটবে—এই আশার কথাই কবিতার অন্তিমসুরে ধ্বনিত হয়েছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতালি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।






