আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থের ‘বেজি’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আকাশ প্রদীপ’ (১৯৩৯) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত চমৎকার, ঘরোয়া ও রসাত্মক কবিতা হলো ‘বেজি’। এই কবিতায় কবির লেখার ঘরের এক অলস বিকেল, টেবিলের ওপর ছড়ানো বইপত্র, ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা খোঁজার হিরিক এবং হঠাৎ ঘরে এক পোষা বেজির আবির্ভাব ও তার রসাত্মক প্রস্থানের দৃশ্য অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবেজি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থআকাশ প্রদীপ
প্রকাশের বছর১৯৩৯ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআত্মকথনমূলক ও হাস্যরসাত্মক গীতি-কবিতা (Narrative and Humorous Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে কবির স্মৃতিকাতরতা, পল্লিপ্রকৃতি এবং জীবনের প্রাত্যহিক ছোটোখাটো ঘটনার অপূর্ব রূপায়ন দেখা যায়। ‘বেজি’ কবিতায় কবির সৃষ্টিশীলতার মাঝেও জীবনের লঘু ও মজার মুহূর্তের এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে। বিকেলবেলা লেখার টেবিলে বসে যখন তিনি একটি কঠিন ইংরেজি শব্দের (‘Pantheism’ বা সর্বেশ্বরবাদ) বাংলা তর্জমা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক তখনই একটি পোষা বেজি ঘরে ঢুকে সব কিছু তদারকি করে চলে যায়—যা কবিতার পরিসরকে এক অনবদ্য নাট্যরূপ দেয়।

বেজি – সম্পূর্ণ কবিতা

অনেকদিনের এই ডেস্কো–

        আনমনা কলমের কালিপড়া ফ্রেস্কো

                   দিয়েছে বিস্তর দাগ ভুতূড়ে রেখার।

                         যমজ সোদর ওরা যে সব লেখার–

                            ছাপার লাইনে পেল ভদ্রবেশে ঠাঁই,

                                  তাদের স্মরণে এরা নাই।

                         অক্সফোর্ড ডিক্সনারি, পদকল্পতরু,

                            ইংরেজ মেয়ের লেখা “সাহারার মরু’

                                  ভ্রমণের বই, ছবি আঁকা,

                            এগুলোর একপাশে চা রয়েছে ঢাকা

                         পেয়ালায় মডার্‌ন্‌ রিভিয়ুতে চাপা।

                                  পড়ে আছে সদ্যছাপা

                            প্রুফগুলো কুঁড়েমির উপেক্ষায়।

                                      বেলা যায়,

                            ঘড়িতে বেজেছে সাড়ে পাঁচ,

                                  বৈকালী ছায়ার নাচ

        মেঝেতে হয়েছে শুরু, বাতাসে পর্দায় লেগে দোলা।

             খাতাখানি আছে খোলা।–

                   আধঘণ্টা ভেবে মরি,

             প্যান্থীজ্‌ম্‌ শব্দটাকে বাংলায় কী করি।

        পোষা বে’জি হেনকালে দ্রুতগতি এখানে সেখানে

             টেবিল চৌকির নীচে ঘুরে গেল কিসের সন্ধানে–

                   দুই চক্ষু ঔৎসুক্যের দীপ্তিজলা,

             তাড়াতাড়ি দেখে গেল আলমারির তলা

                         দামি দ্রব্য যদি কিছু থাকে;

                   ঘ্রাণ কিছু মিলিল না তীক্ষ্ন নাকে

             ঈপ্সিত বস্তুর।  ঘুরে ফিরে অবজ্ঞায় গেল চলে,

        এ ঘরে সকলি ব্যর্থ আরসুলার খোঁজ নেই ব’লে।

                            আমার কঠিন চিন্তা এই,

                         প্যান্থীজ্‌ম্‌ শব্দটার বাংলা বুঝি নেই।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version
Onekdiner ei desko–
Anmona kolomer kalipora fresko
Diyechhe bistoro dag bhuture rekhar.
Jomoj shodor ora je shob lekhar–
Chhapar laine pelo bhodrobeshe thai,
Tader shorone era nai.
Okxford dikshonari, podkalpotoru,
Ingrej meyer lekha “saharar moru’
Bhromoner boi, chhobi anka,
Eguler ekpashe cha royechhe dhoka
Peyalay modarn riviyute chapa.
Pore achhe shoddyochhapa
Prufgulo kuremir upekkhay.
Bela jay,
Ghorite bejechhe sare panchh,
Boikali chhayar nach
Mezete hoyechhe shuru, batashe porday lege dola.
Khata-khani achhe khola।–
Adh-ghonta bhebe mori,
Pantheiz’m shobdotake banglay ki kori.
    Posha beji henkale drutigoti ekhane sekhane
        Tebil choukir niche ghure gelo kiser shondhane--
                Dui chokkhu outsukyer diptijala,
        Taratari dekhe gelo almarir tola
                      Dami drobbyo jodi kichhu thake;
                Ghran kichhu mililo na tikkhno nake
        Ipshito bostur.  Ghure phire oboghnay gelo chole,
    E ghore sokoli byartho arshular khoj nei bole.
                        Amar kothin chinta ei,
                Pantheiz'm shobdotar bangla bujhi nei.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • লেখার টেবিলের বিশৃঙ্খলা ও অলস বিকেল:
    “অনেকদিনের এই ডেস্কো– / আনমনা কলমের কালিপড়া ফ্রেস্কো… ঘড়িতে বেজেছে সাড়ে পাঁচ”
    — কবির লেখার টেবিলটি পুরোনো, যেখানে কালির দাগে ভুতূড়ে রেখা সৃষ্টি হয়েছে। ডিকশনারি, পদকল্পতরু, ভ্রমণের বই আর চায়ের পেয়ালা ঢাকা মডার্ন রিভিউ পত্রিকা নিয়ে টেবিলটি cluttered (অগোছালো)। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, বৈকালিক ছায়ার নাচে ঘর তখন স্নিগ্ধ।
  • দার্শনিক সমস্যায় কবির বিভ্রান্তি:
    “আধঘণ্টা ভেবে মরি, / প্যান্থীজ্‌ম্‌ শব্দটাকে বাংলায় কী করি।”
    — কবি একটি উন্মুক্ত খাতার সামনে বসে গত আধ ঘণ্টা ধরে ভেবে মরছেন ‘Pantheism’ (সর্বেশ্বরবাদ) শব্দটির সুন্দর ও সঠিক বাংলা পরিভাষা কী হতে পারে।
  • পোষা বেজির আকস্মিক আগমন ও তদারকি:
    “পোষা বে’জি হেনকালে দ্রুতগতি এখানে সেখানে / টেবিল চৌকির নীচে ঘুরে গেল কিসের সন্ধানে–“
    — ঠিক সেই গম্ভীর চিন্তার মুহূর্তে ঘরের পোষা বেজিটি খপ করে এসে হাজির! টেবিল ও চৌকির নিচে সে অতি দ্রুতগতিতে মূল্যবান কিছু বা খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াল। আলমারির তলা পর্যন্ত সে তন্নতন্ন করে দেখল।
  • বেজির অবজ্ঞা ও কবির অটল চিন্তা:
    “ঘ্রাণ কিছু মিলিল না তীক্ষ্ন নাকে… এ ঘরে সকলি ব্যর্থ আরসুলার খোঁজ নেই ব’লে। / আমার কঠিন চিন্তা এই, / প্যান্থীজ্‌ম্‌ শব্দটার বাংলা বুঝি নেই।”
    — বেজিটি তীক্ষ্ণ নাকে কিছু খুঁজে না পেয়ে এবং এ ঘরে তেলাপোকা (আরসুলা) পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখে অবজ্ঞায় চলে গেল। আর এদিকে বেজির এই কৌতূহলী তদারকি সত্ত্বেও কবির একমাত্র কঠিন চিন্তা রয়ে গেল—’Pantheism’ শব্দের কোনো যথাযথ বাংলা পরিভাষা সত্যিই কি নেই! গাম্ভীর্য ও লঘু রসের এমন চমৎকার মিশ্রণ রবীন্দ্রকবিতায় এক অনন্য সৃষ্টি।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনামের অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাপোস্ট্রফি পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত