আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থের ‘শ্যামা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামশ্যামা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থআকাশ প্রদীপ
প্রকাশের বছর১৯৩৯ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনস্মৃতিচারণমূলক ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Nostalgic / Reflective Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ দশকের এক অনন্য আত্মজীবনীমূলক ও স্মৃতিকাতর সৃষ্টি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে কবির শৈশব ও কৈশোরের ঝরাপাতা দিনগুলো অপূর্ব সুন্দরে ভেসে উঠেছে। ‘শ্যামা’ কবিতায় কবি তাঁর কিশোর বয়সের এক চেনা বালিকার স্মৃতিরোমন্থন করেছেন। উজ্জ্বল শ্যামলবর্ণা, গলায় পলার হার ও সাদা শাড়ির কালো পাড় পরিহিতা সেই নবকৈশোরের মেয়েটি কবির বাল্যবেলার স্বপ্নের কিনারে এক মায়ালোক তৈরি করেছিল। পুতুলের বিয়েতে আমন্ত্রণ, সংকোচে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা, পরবর্তীতে জানাশোনা হওয়া, পরিহাস ও মানভঞ্জনের দিনগুলো পেরিয়ে জীবনের এক অদ্ভুত দূরত্বের উপলব্ধি এই কবিতার মূল সুর। কাছে পেয়েও পুরোপুরি না পাওয়ার বেদনা এবং সুন্দরের দূরত্বের কখনো ক্ষয় হয় না—এই শাশ্বত সত্যটি অত্যন্ত সুচারুভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

শ্যামা কবিতা (সম্পূর্ণ)

উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ, গলায় পলার হারখানি।

                         চেয়েছি অবাক মানি

                              তার পানে।

                 বড়ো বড়ো কাজল নয়ানে

             অসংকোচে ছিল চেয়ে

                         নবকৈশোরের মেয়ে,

             ছিল তারি কাছাকাছি বয়স আমার।

        স্পষ্ট মনে পড়ে ছবি। ঘরের দক্ষিণে খোলা দ্বার,

             সকালবেলার রোদে বাদামগাছের মাথা

        ফিকে আকাশের নীলে মেলেছে চিকন ঘন পাতা।

             একখানি সাদা শাড়ি কাঁচা কচি গায়ে,

        কালো পাড় দেহ ঘিরে ঘুরিয়া পড়েছে তার পায়ে।

             দুখানি সোনার চুড়ি নিটোল দু হাতে,

                   ছুটির মধ্যাহ্নে পড়া কাহিনীর পাতে

        ওই মূর্তিখানি ছিল। ডেকেছে সে মোরে মাঝে মাঝে

             বিধির খেয়াল যেথা নানাবিধ সাজে

        রচে মরীচিকালোক নাগালের পারে

             বালকের স্বপ্নের কিনারে।

                   দেহ ধরি মায়া

        আমার শরীরে মনে ফেলিল অদৃশ্য ছায়া

                   সূক্ষ্ণ স্পর্শময়ী।

             সাহস হল না কথা কই।

        হৃদয় ব্যথিল মোর অতিমৃদু গুঞ্জরিত সুরে–

             ও যে দূরে, ও যে বহুদূরে,

        যত দূরে শিরীষের ঊর্ধ্বশাখা যেথা হতে ধীরে

             ক্ষীণ গন্ধ নেমে আসে প্রাণের গভীরে।

                         একদিন পুতুলের বিয়ে,

                              পত্র গেল দিয়ে।

                   কলরব করেছিল হেসে খেলে

                   নিমন্ত্রিত দল। আমি মুখচোরা ছেলে

             একপাশে সংকোচে পীড়িত। সন্ধ্যা গেল বৃথা,

        পরিবেশনের ভাগে পেয়েছিনু মনে নেই কী তা।

             দেখেছিনু, দ্রুতগতি দুখানি পা আসে যায় ফিরে,

                   কালো পাড় নাচে তারে ঘিরে।

               কটাক্ষে দেখেছি, তার কাঁকনে নিরেট রোদ

        দু হাতে পড়েছে যেন বাঁধা। অনুরোধ উপরোধ

                   শুনেছিনু তার স্নিগ্ধ স্বরে।

             ফিরে এসে ঘরে

                   মনে বেজেছিল তারি প্রতিধ্বনি

                         অর্ধেক রজনী।

                   তার পরে একদিন

             জানাশোনা হল বাধাহীন।

        একদিন নিয়ে তার ডাকনাম

                               তারে ডাকিলাম।

                   একদিন ঘুচে গেল ভয়,

        পরিহাসে পরিহাসে হল দোঁহে কথা-বিনিময়।

             কখনো বা গড়ে-তোলা দোষ

                   ঘটায়েছে ছল-করা রোষ।

        কখনো বা শ্লেষবাক্যে নিষ্ঠুর কৌতুক

                   হেনেছিল দুখ।

             কখনো বা দিয়েছিল অপবাদ

                   অনবধানের অপরাধ।

        কখনো দেখেছি তার অযত্নের সাজ–

             রন্ধনে ছিল সে ব্যস্ত, পায় নাই লাজ।

                   পুরুষসুলভ মোর কত মূঢ়তারে

        ধিক্‌কার দিয়েছে নিজ স্ত্রীবুদ্ধির তীব্র অহংকারে।

             একদিন বলেছিল, “জানি হাত দেখা।”

        হাতে তুলে নিয়ে হাত নতশিরে গণেছিল রেখা–

             বলেছিল, “তোমার স্বভাব

        প্রেমের লক্ষণে দীন।” দিই নাই কোনোই জবাব।

             পরশের সত্য পুরস্কার

        খণ্ডিয়া দিয়েছে দোষ মিথ্যা সে নিন্দার।

                         তবু ঘুচিল না

                   অসম্পূর্ণ চেনার বেদনা।

             সুন্দরের দূরত্বের কখনো হয় না ক্ষয়,

        কাছে পেয়ে না পাওয়ার দেয় অফুরন্ত পরিচয়।

        পুলকে বিষাদে মেশা দিন পরে দিন

             পশ্চিমে দিগন্তে হয় লীন।

        চৈত্রের আকাশতলে নীলিমার লাবণ্য ঘনাল,

                         আশ্বিনের আলো

                   বাজাল সোনার ধানে ছুটির সানাই।

        চলেছে মন্থর তরী নিরুদ্দেশে স্বপ্নেতে বোঝাই।

Amar Rabindranath Logo

শ্যামা কবিতার Romanized Version:

Ujjwolo shamol borno, golay polar harkhani.
Cheyechi obak mani
tar pane।
Boro boro kajol noyane
Oshongkoche chhilo cheye
Nobokaishorer meye,
Chhilo tari kachakachi boyosh amar।
Sporsho mone pore chhobi. Gorer dokhine khola dwar,
Shokalbelar rode badamgacher matha
Fike akasher nile meleche chikon ghono pata।
Ekhani shada shari kacha kochi gaye,
Kalo par deho ghure ghuriya poreche tar paye।
Dukhkhani shonar churi nitol du hate,
Chhutir modhyahne pora kahinir pate
Oi murtikhani chhilo. Dekeche se more majhe majhe
Bidhir kheyal jetha nanavidho shaje
Roche morichikalok nagaler pare
Baloker shopner kinare।
Deho dhori maya
Amar shorire mone felilo odrishyo chhaya
Sukkho sporshomoyi।
Sahosh holo na kotha koi।
Hridoy byathil mor otimridu gunjrito shure–
O je dure, o je bohudure,
Joto dure shirisher urddhashakha jetha hote dhire
Khin gondho neme ashe praner gobhire।
                            Din ekdin putuler biye,
                                        Potro gelo diye।
                        Kolorob korechhilo hese khele
                        Nimontrito dol. Ami mukhchora chele
                Ekpashe shongkoche pirito. Shondhya gelo britha,
    Poribeshoner vhage peyechhinu mone nei ki ta।
                Dekhechhinu, drutogoti dukhani pa ashe jay fire,
                        Kalo par nache tare ghure।
                Kotakkhe dekechi, tar konkone nirote rod
    Du hate poreche jeno badha। Onurodh uporodh
                        Shunechhinu tar snigdho shore।
                Fire ese ghore
                        Mone bejechhilo tari protodhoni
                                Ordhek rojoni।
                        Tar pore ekdin
                Janashona holo badhhahin।
    Ekdin niye tar daknam
                                        Tare dakilam।
                        Ekdin ghuche gelo voy,
    Porihase porihase holo donhe kotha-binimoy।
                Kokhono ba gore-tola dosh
                        Ghotayeche chol-kora rosh।
    Kokhono ba shleshbakye nishthur koutuk
                        henechhilo dukh।
                Kokhono ba diyechhilo opobad
                        Onobdhaner oporadh।
                Kokhono dekechi tar ojotner shaj--
    Rondhone chhilo se byasto, pay nai laj।
                        Purushshulobh mor koto murhutare
    Dhikkar diyeche nij stribuddher tibro ohongkare।
                Ekdin bolechhilo, "jani hat deka।"
    Hate tule niye hat notoshire gonechhilo rekha--
                Bolechhilo, "tomar shobhab
    Premer lokhone din।" Di-i nai konoi jobab।
                Porsher shotto purushkar
    Khondiya diyeche dosh mithya se nindar।

                                Tobu ghuchilo na
                    Oshompurto chenar bedona।
                Shunderer durutter kokhono hoy na khoy,
    Kache peye na paowar dey ofuronto porichoy।
    Puloke bishade mesha din pore din
                Poshchime digonte hoy lin।
    Choiter akashtole nilimar labonyo ghonal,
                                Ashwiner alo
                    Bajalo shonar dhane chhutir shanai।
    Choleche montro tori niruddeshe shopnete bojhai।

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • কৈশোরের প্রথম প্রেম ও স্মৃতি: শৈশব বা কৈশোরের পটভূমিতে কোনো সাধারণ বালিকার উপস্থিতি কীভাবে কবির মনে মায়ালোক তৈরি করেছিল, তার এক সুতীব্র নস্টালজিয়া এই কবিতার মূল ভিত্তি।
  • অসম্পূর্ণতার সৌন্দর্য: জীবনসঙ্গী হিসেবে কাছে পাওয়ার পরেও মানুষের মন ও হৃদয়ের গভীরের দূরত্ব এবং সেই ‘অসম্পূর্ণ চেনার বেদনা’ কবিতার শেষাংশে এক গভীর দার্শনিক দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত