বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ প্রকৃতি-দর্শনমূলক ও আধ্যাত্মিক কবিতা হলো ‘হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ’। এই কবিতায় হিমালয় পর্বতের সুউচ্চ স্তব্ধতাকে মানবজীবনের যৌবনের উদ্দামতা, আধ্যাত্মিক অন্বেষণ এবং পরিশেষে অসীমের কাছে সসীম সত্তার পরম সমর্পণের এক অপূর্ব রূপক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-দর্শন, আধ্যাত্মিক ও রূপকধর্মী কবিতা (Philosophical Nature, Spiritual and Allegorical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ – সম্পূর্ণ কবিতা
হে নিস্তব্ধ গিরি-রাজ, অভ্রভেদী তোমার সংগীত
তরঙ্গিয়া চলিয়াছে অনুদাত্ত উদাত্ত স্বরিত
প্রভাতের দ্বার হতে সন্ধ্যার পশ্চিমনীড়-পানে
দুর্গম দুরূহ পথে কী জানি কী বাণীর সন্ধানে!
দুঃসাধ্য উচ্ছ্বাস তব শেষ প্রান্তে উঠি আপনার
সহসা মুহূর্তে যেন হারায়ে ফেলেছে কণ্ঠ তার,
ভুলিয়া গিয়াছে সব সুর — সামগীত শব্দহারা
নিয়ত চাহিয়া শূন্যে বরষিছে নির্ঝরিণীধারা।
হে গিরি,যৌবন তব যে দুর্দম অগ্নিতাপবেগে
আপনারে উৎসারিয়া মরিতে চাহিয়াছিল মেঘে
সে তাপ হারায়ে গেছে, সে প্রচণ্ড গতি অবসান —
নিরুদ্দেশ চেষ্টা তব হয়ে গেছে প্রাচীন পাষাণ।
পেয়েছ আপন সীমা, তাই আজি মৌন শান্ত হিয়া
সীমাবিহীনের মাঝে আপনারে দিয়েছ সঁপিয়া।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- বাণীর সন্ধানে স্তব্ধ সংগীত:
“হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ, অভ্রভেদী তোমার সংগীত / তরঙ্গিয়া চলিয়াছে… দুর্গম দুরূহ পথে কী জানি কী বাণীর সন্ধানে! / দুঃসাধ্য উচ্ছ্বাস তব শেষ প্রান্তে উঠি আপনার / সহসা মুহূর্তে যেন হারায়ে ফেলেছে কণ্ঠ তার,”— কবির মনে হয়, আকাশছোঁয়া (অভ্রভেদী) পর্বতমালা যেন কোনো এক পরম বাণী খোঁজার জন্য উদাত্ত সুরে গান গাইতে গাইতে ওপরের দিকে উঠছিল। কিন্তু একেবারে চূড়ায় বা শেষ প্রান্তে উঠে সে যেন হঠাৎ করেই তার কণ্ঠ বা সুর হারিয়ে ফেলেছে। তাই তার বেদমন্ত্রের গান (সামগীত) এখন শব্দহীন হয়ে গেছে এবং কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ঝরনার জল (নির্ঝরিণীধারা) বর্ষণ করে কাঁদছে।
- যৌবনের উদ্দামতা ও পাষাণে পরিণতি:
“হে গিরি, যৌবন তব যে দুর্দম অগ্নিতাপবেগে / আপনারে উৎসারিয়া মরিতে চাহিয়াছিল মেঘে / সে তাপ হারায়ে গেছে, সে প্রচণ্ড গতি অবসান — / নিরুদ্দেশ চেষ্টা তব হয়ে গেছে প্রাচীন পাষাণ।”— পর্বতেরও একসময় যৌবন ছিল (আগ্নেয়গিরির উত্তাপ)। তখন সে প্রচণ্ড বেগে মেঘের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার সেই উত্তাপ ও প্রচণ্ড গতি শান্ত হয়ে গেছে এবং তার সেই লক্ষ্যহীন (নিরুদ্দেশ) উচ্ছ্বাস জমে গিয়ে প্রাচীন শান্ত পাথরে পরিণত হয়েছে।
- সীমা উপলব্ধি ও অসীমে সমর্পণ:
“পেয়েছ আপন সীমা, তাই আজি মৌন শান্ত হিয়া / সীমাবিহীনের মাঝে আপনারে দিয়েছ সঁপিয়া।”— এটি কবিতার মূল দার্শনিক দিক। পর্বত আকাশের দিকে উঠতে উঠতে তার নিজের সর্বোচ্চ সীমাটি খুঁজে পেয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, সে যতই বিশাল হোক না কেন, অসীম আকাশের কাছে সে সসীম বা সীমাবদ্ধ। আর এই সত্য উপলব্ধি করেই তার হৃদয় আজ নীরব ও শান্ত। সে কোনো আক্ষেপ না করে নিজেকে সেই সীমাহীন বা অসীম ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিয়েছে।
