উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শক্তিশালী, গতিশীল ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী’। এই কবিতায় প্রমত্ত পদ্মা নদীকে এক ভয়ংকর, প্রলয়ংকরী ও সর্বগ্রাসী প্রেমিকার (রাক্ষসী প্রেয়সী) রূপে কল্পনা করা হয়েছে। পদ্মার বাইরে রুদ্ররূপ এবং অন্তরে এক নিভৃত, শান্ত ও সুগম্ভীর নির্জনতার যে বৈপরীত্য—তারই এক অনবদ্য চিত্রায়ন এই কবিতায় ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি-প্রেমমূলক ও রূপকধর্মী কবিতা (Nature, Romantic and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি নদী ও প্রকৃতির সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের নানা রূপ তুলে ধরেছেন। শিলাইদহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ পদ্মা নদীর যে বিশাল, উন্মত্ত এবং ধ্বংসাত্মক রূপ দেখেছিলেন, তা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। এই কবিতায় তিনি পদ্মাকে কেবল একটি নদী নয়, বরং এক আদিম, উদ্দাম ও সর্বগ্রাসী প্রেয়সী হিসেবে কল্পনা করেছেন, যে তার উন্মত্ত আলিঙ্গনে সবকিছু ধ্বংস করে নিজের বক্ষে মিলিয়ে নিতে চায়। নদী এখানে একাধারে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক।

ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী – সম্পূর্ণ কবিতা

ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী,
লুব্ধ বাহু বাড়াইয়া উচ্ছ্বসি উল্লসি
আমারে কি পেতে চাস চির আলিঙ্গনে।
শুধু এক মুহূর্তের উন্মত্ত মিলনে
তোর বক্ষোমাঝে চাস করিতে বিলয়
আমার বক্ষের যত সুখ দুঃখ ভয়?
আমিও তো কতদিন ভাবিয়াছি মনে
বসি তোর তটোপান্তে প্রশান্ত নির্জনে,
বাহিরে চঞ্চলা তুই প্রমত্তমুখরা,
শানিত অসির মতো ভীষণ প্রখরা,
অন্তরে নিভৃত স্নিগ্ধ শান্ত সুগম্ভীর–
দীপহীন রুদ্ধদ্বার অর্ধরজনীর
বাসরঘরের মতো নিষুপ্ত নির্জন–
সেথা কার তরে পাতা সুচির শয়ন।

Romanized Version

Ore podma, ore mor rakkhoshi preyoshi,
Lubdho bahu baraiya uchchhosi ulloshi
Amare ki pete chash chiro alingone.
Shudhu ek muhurter unmotto milone
Tor bokkhomajhe chash korite biloy
Amar bokkher joto shukh dukkho bhoy?
Amio to kotodin bhabiyachhi mone
Boshi tor totopante proshanto nirjone,
Bahire chonchola tui promottomukhora,
Shanito oshir moto bhishon prokhora,
Ontore nibhrito snigdho shanto shugombhir–
Diphin ruddhodwar ordhorojonir
Bashorghorer moto nishupto nirjon–
Shetha kar tore pata shuchiro shoyon.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সর্বগ্রাসী প্রেম ও ধ্বংসের রূপক:
“ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী, / লুব্ধ বাহু বাড়াইয়া উচ্ছ্বসি উল্লসি / আমারে কি পেতে চাস চির আলিঙ্গনে।”
— কবি উন্মত্ত পদ্মা নদীকে এক ‘রাক্ষসী প্রেয়সী’ বলে সম্বোধন করেছেন। পদ্মার প্রবল স্রোত ও ঢেউগুলোকে তার লুব্ধ বাহু হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা কবিকে চির আলিঙ্গনে বাঁধার জন্য বা গ্রাস করার জন্য প্রবল উল্লাসে ছুটে আসছে।
  • উন্মত্ত মিলনে বিলয়:
“শুধু এক মুহূর্তের উন্মত্ত মিলনে / তোর বক্ষোমাঝে চাস করিতে বিলয় / আমার বক্ষের যত সুখ দুঃখ ভয়?”
— এই রাক্ষসী প্রেয়সী চায় এক মুহূর্তের সেই প্রলয়ংকরী আলিঙ্গনের মাধ্যমে কবির অন্তরের সমস্ত জাগতিক অনুভূতি (সুখ, দুঃখ, ভয়) নিজের বিশাল বুকের মাঝে চিরতরে বিলীন বা ধ্বংস করে দিতে। এটি মূলত প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে মানুষের আত্মসমর্পণ ও বিলুপ্তির প্রতীক।
  • বাইরের রুদ্ররূপ ও ভেতরের প্রশান্তি:
“বাহিরে চঞ্চলা তুই প্রমত্তমুখরা, / শানিত অসির মতো ভীষণ প্রখরা, / অন্তরে নিভৃত স্নিগ্ধ শান্ত সুগম্ভীর–“
— বাইরে থেকে পদ্মাকে যতই চঞ্চল, ধারালো তরবারির (শানিত অসি) মতো প্রখর ও প্রমত্ত মনে হোক না কেন, কবি যখন এর নির্জন তীরে বসেন, তখন বুঝতে পারেন এর গভীরে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ও সুগম্ভীর শান্তি বিরাজমান। এই বাইরের চঞ্চলতা ও ভেতরের নীরবতার বৈপরীত্যই নদীটিকে এত রহস্যময় করে তুলেছে।
  • নিভৃত বাসরঘর ও অসীম শয়ন:
“দীপহীন রুদ্ধদ্বার অর্ধরজনীর / বাসরঘরের মতো নিষুপ্ত নির্জন– / সেথা কার তরে পাতা সুচির শয়ন।”
— পদ্মার গভীর তলদেশকে কবি একটি অন্ধকার, রুদ্ধদ্বার ও নিস্তব্ধ বাসরঘরের সাথে তুলনা করেছেন। সেই শান্ত ও নির্জন গভীরে কার জন্য অনন্তকালের শয্যা পাতা রয়েছে, সেই জিজ্ঞাসা বা রহস্যের মাধ্যমেই কবিতাটি শেষ হয়েছে। এটি মূলত মৃত্যু ও পরপারের অসীম শান্তির এক গভীর রূপক।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত ‘প-দ্মা’, ‘রা-ক্ষসী’, ‘উৎ-সর্গ’ ইত্যাদি শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেনগুলো পরিহার করে মূল পাঠ উপস্থাপন করা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন