আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ (১৮৭৮) | গ্রন্থপরিচয় ও কবিতা | পর্যায় : সূচনা (১৮৭৮ – ১৮৮১) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থটি তাঁর ষোল বছর বয়সে ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। “বনফুল” কাব্যগ্রন্থটি পূর্ববর্তী হলেও, “কবি-কাহিনী”-ই তাঁর প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। এর কবিতাগুলি “ভারতী” সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ৫৩-টি পৃষ্ঠা রয়েছে। এতে বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রভাব সুস্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয়। রবীন্দ্রনাথের বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষ হলেন গ্রন্থটির প্রকাশক।

 

কাব্যগ্রন্থ - কবি কাহিনী - পর্যায় সূচনা (১৮৭৮ – ১৮৮১) - প্রকাশকাল ১৮৭৮ - - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্ররচনাবলী অচলিত সংগ্রহ প্রথম খণ্ডের (মাঘ ১৩৯২) গ্রন্থ পরিচয় অংশে লিখিত এই গ্রন্থ সম্পর্কিত পাঠ :

রচনার দিক দিয়া ‘বন-ফুল’ পূর্ববর্তী হইলেও ‘কবি-কাহিনী’ই পুস্তকাকারে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের সর্বপ্রথম রচনা এবং ইহা একটি সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। সংবৎ ১৯৩৫ [৫ নভেম্বর ১৮৭৮] ইহা প্রকাশিত হয়। পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫৩। ইহা পুনর্‌মুদ্রিত হয় নাই।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি-কাহিনী প্রথম বৎসরের ‘ভারতী’র (১২৮৪ সাল) পৌষ হইতে চৈত্র সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। কবির বয়স তখন ষোলো বৎসর। এই পুস্তক সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাঁহার ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখিয়াছেন–

এই কবি-কাহিনী কাব্যই আমার রচনাবলীর মধ্যে প্রথম গ্রন্থ-আকারে বাহির হয়। আমি যখন মেজদার নিকট আমেদাবাদে ছিলাম তখন আমার কোনো উৎসাহী বন্ধু এই বইখানি ছাপাইয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিয়া আমাকে বিস্মিত করিয়া দেন। –প্রথম সংস্করণ, পৃ, ১০৮

এই উক্তির মধ্যে সামান্য একটু ভুল আছে; রবীন্দ্রনাথ আমেদাবাদে থাকিতে এই পুস্তক প্রকাশিত হয় নাই। ১৮৭৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বিলাত যাত্রা করেন। ‘কবি-কাহিনী’ ৫ নবেম্বর প্রকাশিত হয়। মুদ্রিত পুস্তক তিনি দেখিয়া যাইতে পারেন নাই। রবীন্দ্রনাথ-উল্লিখিত “উৎসাহী বন্ধু”ই ‘কবি-কাহিনী’র প্রকাশক প্রবোধচন্দ্র ঘোষ।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ (১৮৭৮)

 

 

কবি কাহিনী প্রথম সর্গ কবিতা | কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি কাহিনী প্রথম সর্গ | Kobi Kahini, Prothom Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শুন কলপনা বালা, ছিল কোন কবি

বিজন কুটীর-তলে। ছেলেবেলা হোতে

তোমার অমৃত-পানে আছিল মজিয়া।

তোমার বীণার ধ্বনি ঘুমায়ে ঘুমায়ে

শুনিত, দেখিত কত সুখের স্বপন।

একাকী আপন মনে সরল শিশুটি

তোমারি কমল-বনে করিত গো খেলা,

মনের কত কি গান গাহিত হরষে,

বনের কত কি ফুলে গাঁথিত মালিকা।

একাকী আপন মনে কাননে কাননে

যেখানে সেখানে শিশু করিত ভ্রমণ;

একাকী আপন মনে হাসিত কাঁদিত।

জননীর কোল হতে পালাত ছুটিয়া,

প্রকৃতির কোলে গিয়া করিত সে খেলা–

ধরিত সে প্রজাপতি, তুলিত সে ফুল,

বসিত সে তরুতলে, শিশিরের ধারা

ধীরে ধীরে দেহে তার পড়িত ঝরিয়া।

বিজন কুলায়ে বসি গাহিত বিহঙ্গ,

হেথা হোথা উঁকি মারি দেখিত বালক

কোথায় গাইছে পাখী। ফুলদলগুলি,

কামিনীর গাছ হোতে পড়িলে ঝরিয়া

ছড়ায়ে ছড়ায়ে তাহা করিত কি খেলা!

প্রফুল্ল উষার ভূষা অরুণকিরণে

বিমল সরসী যবে হোত তারাময়ী,

ধরিতে কিরণগুলি হইত অধীর।

যখনি গো নিশীথের শিশিরাশ্রু-জলে

ফেলিতেন উষাদেবী সুরভি নিশ্বাস,

গাছপালা লতিকার পাতা নড়াইয়া

ঘুম ভাঙাইয়া দিয়া ঘুমন্ত নদীর

যখনি গাহিত বায়ু বন্য-গান তার,

তখনি বালক-কবি ছুটিত প্রান্তরে,

দেখিত ধান্যের শিষ দুলিছে পবনে।

দেখিত একাকী বসি গাছের তলায়,

স্বর্ণময় জলদের সোপানে সোপানে

উঠিছেন উষাদেবী হাসিয়া হাসিয়া।

নিশা তারে ঝিল্লীরবে পাড়াইত ঘুম,

পূর্ণিমার চাঁদ তার মুখের উপরে

তরল জোছনা-ধারা দিতেন ঢালিয়া,

স্নেহময়ী মাতা যথা সুপ্ত শিশুটির

মুখপানে চেয়ে চেয়ে করেন চুম্বন।

প্রভাতের সমীরণে, বিহঙ্গের গানে

উষা তার সুখনিদ্রা দিতেন ভাঙ্গায়ে।

এইরূপে কি একটি সঙ্গীতের মত,

তপনের স্বর্ণময়-কিরণে প্লাবিত

প্রভাতের একখানি মেঘের মতন,

নন্দন বনের কোন অপ্সরা-বালার

সুখময় ঘুমঘোরে স্বপনের মত

কবির বালক-কাল হইল বিগত।

                 —

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

যৌবনে যখনি কবি করিল প্রবেশ,

প্রকৃতির গীতধ্বনি পাইল শুনিতে,

বুঝিল সে প্রকৃতির নীরব কবিতা।

প্রকৃতি আছিল তার সঙ্গিনীর মত।

নিজের মনের কথা যত কিছু ছিল

কহিত প্রকৃতিদেবী তার কানে কানে,

প্রভাতের সমীরণ যথা চুপিচুপি

কহে কুসুমের কানে মরমবারতা।

নদীর মনের গান বালক যেমন

বুঝিত, এমন আর কেহ বুঝিত না।

বিহঙ্গ তাহার কাছে গাইত যেমন,

এমন কাহারো কাছে গাইত না আর।

তার কাছে সমীরণ যেমন বহিত

এমন কাহারো কাছে বহিত না আর।

যখনি রজনীমুখ উজলিত শশী,

সুপ্ত বালিকার মত যখন বসুধা

সুখের স্বপন দেখি হাসিত নীরবে,

বসিয়া তটিনীতীরে দেখিত সে কবি–

স্নান করি জোছনায় উপরে হাসিছে

সুনীল আকাশ, হাসে নিম্নে স্রোতস্বিনী;

সহসা সমীরণের পাইয়া পরশ

দুয়েকটি ঢেউ কভু জাগিয়া উঠিছে।

ভাবিত নদীর পানে চাহিয়া চাহিয়া,

নিশাই কবিতা আর দিবাই বিজ্ঞান।

দিবসের আলোকে সকলি অনাবৃত,

সকলি রয়েছে খোলা চখের সমুখে–

ফুলের প্রত্যেক কাঁটা পাইবে দেখিতে।

দিবালোকে চাও যদি বনভূমি-পানে,

কাঁটা খোঁচা কর্দ্দমাক্ত বীভৎস জঙ্গল

তোমার চখের ‘পরে হবে প্রকাশিত;

দিবালোকে মনে হয় সমস্ত জগৎ

নিয়মের যন্ত্রচক্রে ঘুরিছে ঘর্ঘরি।

কিন্তু কবি নিশাদেবী কি মোহন-মন্ত্র

পড়ি দেয় সমুদয় জগতের ‘পরে,

সকলি দেখায় যেন স্বপ্নের মতন;

ঐ স্তব্ধ নদীজলে চন্দ্রের আলোকে

পিছলিয়া চলিতেছে যেমন তরণী,

তেমনি সুনীল ঐ আকাশসলিলে

ভাসিয়া চলেছে যেন সমস্ত জগৎ;

সমস্ত ধরারে যেন দেখিয়া নিদ্রিত,

একাকী গম্ভীর-কবি নিশাদেবী ধীরে

তারকার ফুলমালা জড়ায়ে মাথায়,

জগতের গ্রন্থ কত লিখিছে কবিতা।

এইরূপে সেই কবি ভাবিত কত কি।

হৃদয় হইল তার সমুদ্রের মত,

সে সমুদ্রে চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারকার

প্রতিবিম্ব দিবানিশি পড়িত খেলিত,

সে সমুদ্র প্রণয়ের জোছনা-পরশে

লঙ্ঘিয়া তীরের সীমা উঠিত উথলি,

সে সমুদ্র আছিল গো এমন বিস্তৃত

সমস্ত পৃথিবীদেবী, পারিত বেষ্টিতে

নিজ স্নিগ্ধ আলিঙ্গনে। সে সিন্ধু-হৃদয়ে

দুরন্ত শিশুর মত মুক্ত সমীরণ

হু হু করি দিবানিশি বেড়াত খেলিয়া।

নির্ঝরিণী, সিন্ধুবেলা, পর্ব্বতগহ্বর,

সকলি কবির ছিল সাধের বসতি।

তার প্রতি তুমি এত ছিলে অনুকূল

কল্পনা! সকল ঠাঁই পাইত শুনিতে

তোমার বীণার ধ্বনি, কখনো শুনিত

প্রস্ফুটিত গোলাপের হৃদয়ে বসিয়া

বীণা লয়ে বাজাইছ অস্ফুট কি গান।

কনককিরণময় উষার জলদে

একাকী পাখীর সাথে গাইতে কি গীত

তাই শুনি যেন তার ভাঙ্গিত গো ঘুম!

অনন্ত-তারা-খচিত নিশীথগগনে

বসিয়া গাইতে তুমি কি গম্ভীর গান,

তাহাই শুনিয়া যেন বিহ্বলহৃদয়ে

নীরবে নিশীথে যবে একাকী রাখাল

সুদূর কুটীরতলে বাজাইত বাঁশী

তুমিও তাহার সাথে মিলাইতে ধ্বনি,

সে ধ্বনি পশিত তার প্রাণের ভিতর।

নিশার আঁধার-কোলে জগৎ যখন

দিবসের পরিশ্রমে পড়িত ঘুমায়ে

তখন সে কবি উঠি তুষারমন্ডিত

সমুচ্চ পর্ব্বতশিরে গাইত একাকী

প্রকৃতিবন্দনাগান মেঘের মাঝারে।

সে গম্ভীর গান তার কেহ শুনিত না,

কেবল আকাশব্যাপী স্তব্ধ তারকারা

এক দৃষ্টে মুখপানে রহিত চাহিয়া।

কেবল, পর্ব্বতশৃঙ্গ করিয়া আঁধার,

সরল পাদপরাজি নিস্তব্ধ গম্ভীর

ধীরে ধীরে শুনিত গো তাহার সে গান;

কেবল সুদূর বনে দিগন্তবালায়

হৃদয়ে সে গান পশি প্রতিধ্বনিরূপে

মৃদুতর হোয়ে পুন আসিত ফিরিয়া।

কেবল সুদূর শৃঙ্গে নির্ঝরিণী বালা

সে গম্ভীর গীতি-সাথে কণ্ঠ মিশাইত,

নীরবে তটিনী যেত সমুখে বহিয়া,

নীরবে নিশীথবায়ু কাঁপাত পল্লব।

গম্ভীরে গাইত কবি–“হে মহাপ্রকৃতি,

কি সুন্দর, কি মহান্‌ মুখশ্রী তোমার,

শূন্য আকাশের পটে হে প্রকৃতিদেবি

কি কবিতা লিখেছে যে জ্বলন্ত অক্ষরে,

যত দিন রবে প্রাণ পড়িয়া পড়িয়া

তবু ফুরাবে না পড়া; মিটিবে না আশ!

শত শত গ্রহ তারা তোমার কটাক্ষে

কাঁপি উঠে থরথরি, তোমার নিশ্বাসে

ঝটিকা বহিয়া যায় বিশ্বচরাচরে।

কালের মহান্‌ পক্ষ করিয়া বিস্তার,

অনন্ত আকাশে থাকি হে আদি জননি,

শাবকের মত এই অসংখ্য জগৎ

তোমার পাখার ছায়ে করিছ পালন!

সমস্ত জগৎ যবে আছিল বালক,

দুরন্ত শিশুর মত অনন্ত আকাশে

করিত গো ছুটাছুটি না মানি শাসন,

স্তনদানে পুষ্ট করি তুমি তাহাদের

অলঙ্ঘ্য সখ্যের ডোরে দিলে গো বাঁধিয়া।

এ দৃঢ় বন্ধন যদি ছিঁড়ে একবার,

সে কি ভয়ানক কাণ্ড বাঁধে এ জগতে,

কক্ষচ্ছিন্ন কোটি কোটি সূর্য্য চন্দ্র তারা

অনন্ত আকাশময় বেড়ায় মাতিয়া,

মণ্ডলে মণ্ডলে ঠেকি লক্ষ সূর্য্য গ্রহ

চূর্ণ চূর্ণ হোয়ে পড়ে হেথায় হোথায়;

এ মহান্‌ জগতের ভগ্ন অবশেষ

চূর্ণ নক্ষত্রের স্তূপ, খণ্ড খণ্ড গ্রহ

বিশৃঙ্খল হোয়ে রহে অনন্ত আকাশে!

অনন্ত আকাশ আর অনন্ত সময়,

যা ভাবিতে পৃথিবীর কীট মানুষের

ক্ষুদ্র বুদ্ধি হোয়ে পড়ে ভয়ে সঙ্কুচিত,

তাহাই তোমার দেবি সাধের আবাস।

তোমার মুখের পানে চাহিতে হে দেবি

ক্ষুদ্র মানবের এই স্পর্ধিত জ্ঞানের

দুর্ব্বল নয়ন যায় নিমীলিত হোয়ে।

হে জননি আমার এ হৃদয়ের মাঝে

অনন্ত-অতৃপ্তি-তৃষ্ণা জ্বলিছে সদাই,

তাই দেবি পৃথিবীর পরিমিত কিছু

পারে না গো জুড়াইতে হৃদয় আমার,

তাই ভাবিয়াছি আমি হে মহাপ্রকৃতি,

মজিয়া তোমার সাথে অনন্ত প্রণয়ে

জুড়াইব হৃদয়ের অনন্ত পিপাসা!

প্রকৃতি জননি ওগো, তোমার স্বরূপ

যত দূর জানিবারে ক্ষুদ্র মানবেরে

দিয়াছ গো অধিকার সদয় হইয়া,

তত দূর জানিবারে জীবন আমার

করেছি ক্ষেপণ আর করিব ক্ষেপণ।

ভ্রমিতেছি পৃথিবীর কাননে কাননে–

বিহঙ্গও যত দূর পারে না উড়িতে

সে পর্ব্বতশিখরেও গিয়াছি একাকী;

দিবাও পশে নি দেবি যে গিরিগহ্বরে,

সেথায় নির্ভয়ে আমি করেছি প্রবেশ।

যখন ঝটিকা ঝঞ্ঝা প্রচণ্ড সংগ্রামে

অটল পর্ব্বতচূড়া করেছে কম্পিত,

সুগম্ভীর অম্বুনিধি উন্মাদের মত

করিয়াছে ছুটাছুটি যাহার প্রতাপে,

তখন একাকী আমি পর্ব্বত-শিখরে

দাঁড়াইয়া দেখিয়াছি সে ঘোর বিপ্লব,

মাথার উপর দিয়া অজস্র অশনি

সুবিকট অট্টহাসে গিয়াছে ছুটিয়া,

প্রকাণ্ড শিলার স্তূপ পদতল হোতে

পড়িয়াছে ঘর্ঘরিয়া উপত্যকা-দেশে,

তুষারসঙ্ঘাতরাশি পড়েছে খসিয়া

শৃঙ্গ হোতে শৃঙ্গান্তরে উলটি পালটি।

অমানিশীথের কালে নীরব প্রান্তরে

বসিয়াছি, দেখিয়াছি চৌদিকে চাহিয়া,

সর্ব্বব্যাপী নিশীথের অন্ধকার গর্ভে

এখনো পৃথিবী যেন হতেছে সৃজিত।

স্বর্গের সহস্র আঁখি পৃথিবীর ‘পরে

নীরবে রয়েছে চাহি পলকবিহীন,

স্নেহময়ী জননীর স্নেহ-আঁখি যথা

সুপ্ত বালকের পরে রহে বিকসিত।

এমন নীরবে বায়ু যেতেছে বহিয়া,

নীরবতা ঝাঁ ঝাঁ করি গাইছে কি গান–

মনে হয় স্তব্ধতার ঘুম পাড়াইছে।

কি সুন্দর রূপ তুমি দিয়াছ উষায়,

হাসি হাসি নিদ্রোত্থিতা বালিকার মত

আধঘুমে মুকুলিত হাসিমাখা আঁখি!

কি মন্ত্র শিখায়ে দেছ দক্ষিণ-বালারে–

যে দিকে দক্ষিণবধূ ফেলেন নিঃশ্বাস,

সে দিকে ফুটিয়া উঠে কুসুম-মঞ্জরী,

সে দিকে গাহিয়া উঠে বিহঙ্গের দল,

সে দিকে বসন্ত-লক্ষ্মী উঠেন হাসিয়া।

কি হাসি হাসিতে জানে পূর্ণিমাশর্ব্বরী–

সে হাসি দেখিয়া হাসে গম্ভীর পর্ব্বত,

সে হাসি দেখিয়া হাসে উথল জলধি,

সে হাসি দেখিয়া হাসে দরিদ্র কুটীর।

হে প্রকৃতিদেবি তুমি মানুষের মন

কেমন বিচিত্র ভাবে রেখেছ পূরিয়া,

করুণা, প্রণয়, স্নেহ, সুন্দর শোভন–

ন্যায়, ভক্তি, ধৈর্য্য আদি সমুচ্চ মহান্‌–

ক্রোধ, দ্বেষ, হিংসা আদি ভয়ানক ভাব,

নিরাশা মরুর মত দারুণ বিষণ্ণ–

তেমনি আবার এই বাহির জগৎ

বিচিত্র বেশভূষায় করেছ সজ্জিত।

তোমার বিচিত্র কাব্য-উপবন হোতে

তুলিয়া সুরভি ফুল গাঁথিয়া মালিকা,

তোমারি চরণতলে দিব উপহার!”

এইরূপে সুনিস্তব্ধ নিশীথ-গগনে

প্রকৃতি-বন্দনা-গান গাইত সে কবি।

Amar Rabindranath Logo

 

 

কবি কাহিনী দ্বিতীয় স্বর্গ কবিতা | কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি কাহিনী দ্বিতীয় সর্গ | Kabi Kahini, Ditio Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

   “এত কাল হে প্রকৃতি        করিনু তোমার সেবা,

             তবু কেন এ হৃদয় পূরিল না দেবি?

   এখনো বুকের মাঝে           রয়েছে দারুণ শূন্য,

             সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর?

      মনের মন্দির মাঝে           প্রতিমা নাহিক যেন,

             শুধু এ আঁধার গৃহ রয়েছে পড়িয়া–

      কত দিন বল দেবি           রহিবে এমন শূন্য,

             তা হোলে ভাঙিয়ে যাবে এ মনোমন্দির!

      কিছু দিন পরে আর          দেখিব সেখানে চেয়ে

             পূর্ব্ব হৃদয়ের আছে ভগ্ন-অবশেষ,

    সে ভগ্ন-অবশেষে–           সুখের সমাধি ‘পরে

             বসিয়া দারুণ দুখে কাঁদিতে কি হবে?

      মনের অন্তর-তলে            কি যে কি করিছে হুহু,

             কি যেন আপন ধন নাইকো সেখানে,

   সে শূন্য পূরাবে দেবি            ঘুরিছে পৃথিবীময়

             মরুভূমে তৃষাতুর মৃগের মতন।

      কত মরীচিকা দেবী           করেছে ছলনা মোরে,

             কত ঘুরিয়াছি তার পশ্চাতে পশ্চাতে,

      অবশেষে শ্রান্ত হয়ে           তোমারে শুধাই দেবি

             এ শূন্য পূরিবে না কি কিছুতে আমার?

      উঠিছে তপন শশী,           অস্ত যাইতেছে পুনঃ,

             বসন্ত শরত শীত চক্রে ফিরিতেছে;

      প্রতি পদক্ষেপে আমি         বাল্যকাল হোতে দেবি

             ক্রমে ক্রমে কত দূর যেতেছি চলিয়া–

     বাল্যকাল গেছে চলে,          এসেছে যৌবন এবে,

  যৌবন যাইবে চলি আসিবে বার্দ্ধক্য–

      তবু এ মনের শূন্য             কিছুতে কি পূরিবে না?

             মন কি করিবে হুহু চিরকাল তরে?

      শুনিয়াছিলাম কোন্‌            উদাসী যোগীর কাছে–

             “মানুষের মন চায় মানুষেরি মন;

      গম্ভীর সে নিশীথিনী,           সুন্দর সে উষাকাল,

             বিষণ্ণ সে সায়াহ্নের ম্লান মুখচ্ছবি,

      বিস্তৃত সে অম্বুনিধি,           সমুচ্চ সে গিরিবর,

  আঁধার সে পর্ব্বতের গহ্বর বিশাল,

      তটিনীর কলধ্বনি,              নির্ঝরের ঝর ঝর,

  আরণ্য বিহঙ্গদের স্বাধীন সঙ্গীত,

      পারে না পূরিতে তারা  বিশাল মনুষ্য-হৃদি–

  মানুষের মন চায় মানুষেরি মন।’

      শুনিয়া, প্রকৃতিদেবি,          ভ্রমিণু পৃথিবীময়;

  কত লোক দিয়েছিল হৃদি-উপহার–

      আমার মর্ম্মের গান            যবে গাহিতাম দেবি

    কত লোক কেঁদেছিল শুনিয়া সে গীত।

      তেমন মনের মত              মন পেলাম না দেবি,

             আমার প্রাণের কথা বুঝিল না কেহ,

      তাইতে নিরাশ হোয়ে         আবার এসেছি ফিরে,

             বুঝি গো এ শূন্য মন পূরিল না আর।”

      এইরূপে কেঁদে কেঁদে         কাননে কাননে কবি

             একাকী আপন-মনে করিত ভ্রমণ।

      সে শোক-সঙ্গীত শুনি         কাঁদিত কাননবালা,

             নিশীথিনী হাহা করি ফেলিত নিশ্বাস,

     বনের হরিণগুলি                আকুল নয়নে আহা

             কবির মুখের পানে রহিত চাহিয়া।

     “হাহা দেবি একি হোলো,     কেন পূরিল না প্রাণ”

             প্রতিধ্বনি হোতো তার কাননে কাননে।

     শীর্ণ নির্ঝরিণী যেথা           ঝরিতেছে মৃদু মৃদু,

             উঠিতেছে কুলু কুলু জলের কল্লোল,

     সেখানে গাছের তলে          একাকী বিষণ্ণ কবি

             নীরবে নয়ন মুদি থাকিত শুইয়া–

    তৃষিত হরিণশিশু               সলিল করিয়া পান

             দেখি তার মুখপানে চলিয়া যাইত।

    শীতরাত্রে পর্ব্বতের            তুষারশয্যার ‘পরে

             বসিয়া রহিত স্তব্ধ প্রতিমার মত,

    মাথার উপরে তার             পড়িত তুষারকণা,

             তীব্রতম শীতবায়ু যাইত বহিয়া।

    দিনে দিনে ভাবনায়             শীর্ণ হোয়ে গেল দেহ,

             প্রফুল্ল হৃদয় হোলো বিষাদে মলিন,

   রাক্ষসী স্বপ্নের তরে           ঘুমালেও শান্তি নাই,

             পৃথিবী দেখিত কবি শ্মশানের মত

   এক দিন অপরাহ্নে              বিজন পথের প্রান্তে

             কবি বৃক্ষতলে এক রহিছে শুইয়া,

   পথ-শ্রমে শ্রান্ত দেহ,            চিন্তায় আকুল হৃদি,

             বহিতেছে বিষাদের আকুল নিশ্বাস।

   হেন কালে ধীরি ধীরি           শিয়রের কাছে আসি

             দাঁড়াইল এক জন বনের বালিকা,

   চাহিয়া মুখের পানে             কহিল করুণ স্বরে,

             “কে তুমি গো পথশ্রান্ত বিষণ্ণ পথিক?

   অধরে বিষাদ যেন               পেতেছে আসন তার

             নয়ন কহিছে যেন শোকের কাহিনী।

   তরুণ হৃদয় কেন                অমন বিষাদময়?

             কি দুখে উদাস হোয়ে করিছ ভ্রমণ?”

   গভীর নিশ্বাস ফেলি             গম্ভীরে কহিল কবি,

             “প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না বালা?”

   একে একে কত কথা    কহিল বালিকা কাছে,

             যত কথা রুদ্ধ ছিল হৃদয়ে কবির–

   আগ্নেয় গিরির বুকে            জ্বলন্ত অগ্নির মত

             যত কথা ছিল কবি কহিলা গম্ভীরে।

   “নদ নদী গিরি গুহা              কত দেখিলাম, তবু

             প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না দেবি।”

   বালার কপোল বাহি              নীরবে অশ্রুর বিন্দু

             স্বর্গের শিশির-সম পড়িল ঝরিয়া,

   সেই এক অশ্রুবিন্দু               অমৃতধারার মত

             কবির হৃদয় গিয়া প্রবেশিল যেন;

   দেখি সে করুণবারি              নিরশ্রু কবির চোখে

             কত দিন পরে হোল অশ্রুর উদয়।

   শ্রান্ত হৃদয়ের তরে              যে আশ্রয় খুঁজে খুঁজে

             পাগল ভ্রমিতেছিল হেথায় হোথায়–

   আজ যেন এইটুকু               আশ্রয় পাইল হৃদি,

             আজ যেন একটুকু জুড়ালো যন্ত্রণা।

   যে হৃদয় নিরাশায়                মরুভূমি হোয়েছিল

             সেথা হোতে হল আজ অশ্রু উৎসারিত।

   শ্রান্ত সে কবির মাথা             রাখিয়া কোলের ‘পরে,

             সরলা মুছায়ে দিল অশ্রুবারিধারা।

   কবি সে ভাবিল মনে,           তুমি কোথাকার দেবী

             কি অমৃত ঢালিলে গো প্রাণের ভিতর!

   ললনা তখন ধীরে               চাহিয়া কবির মুখে

             কহিল মমতাময় করুণ কথায়,–

   “হোথায় বিজন বনে             দেখেছ কুটীর ওই,

             চল পান্থ ওইখানে যাই দুজনায়।

   বন হোতে ফল মূল             আপনি তুলিয়া দিব,

  নির্ঝর হইতে তুলি আনিব সলিল,

   যতনে পর্ণের শয্যা              দিব আমি বিছাইয়া,

             সুখনিদ্রা-কোলে সেথা লভিবে বিরাম,

   আমার বীণাটি লয়ে              গান শুনাইব কত,

             কত কি কথায় দিন যাইবে কাটিয়া।

   হরিণশাবক এক                 আছে ও গাছের তলে,

             সে যে আসি কত খেলা খেলিবে পথিক।

   দূরে সরসীর ধারে               আছে এক চারু কুঞ্জ,

  তোমারে লইয়া পান্থ দেখাব সে বন।

   কত পাখী ডালে ডালে  সারাদিন গাইতেছে,

             কত যে হরিণ সেথা করিতেছে খেলা।

   আবার দেখাব সেই               অরণ্যের নির্ঝরিণী,

  আবার নদীর ধারে লয়ে যাব আমি,

   পাখী এক আছে মোর        সে যে কত গায় গান–

             নাম ধোরে ডাকে মোরে “নলিনী’ “নলিনী’।

   যা আছে আমার কিছু           সব আমি দেখাইব,

             সব আমি শুনাইব যত জানি গান–

   আসিবে কি পান্থ ওই           বনের কুটীরমাঝে?”

             এতেক শুনিয়া কবি চলিল কুটীরে।

   কি সুখে থাকিত কবি,  বিজন কুটীরে সেই

             দিনগুলি কেটে যেত মুহূর্তের মত–

   কি শান্ত সে বনভূমি,             নাই লোক নাই জন,

             শুধু সে কুটীরখানি আছে এক ধারে।

   আঁধার তরুর ছায়ে–            নীরব শান্তির কোলে

             দিবস যেন রে সেথা রহিত ঘুমায়ে।

   পাখীর অস্ফুট গান,              নির্ঝরের ঝরঝর

             স্তব্ধতারে আরো যেন দিত মিষ্ট করি।

   আগে এক দিন কবি              মুগ্ধ প্রকৃতির রূপে

             অরণ্যে অরণ্যে একা করিত ভ্রমণ,

   এখন দুজনে মিলি                ভ্রমিয়া বেড়ায় সেথা,

             দুই জন প্রকৃতির বালক বালিকা।

   সুদূর কাননতলে                 কবিরে লইয়া যেত

             নলিনী, সে যেন এক বনেরি দেবতা।

   শ্রান্ত হোলে পথশ্রমে             ঘুমাত কবির কোলে,

             খেলিত বনের বায়ু কুন্তল লইয়া,

   ঘুমন্ত মুখের পানে                চাহিয়া রহিত কবি–

             মুখে যেন লিখা আছে আরণ্য কবিতা।

   “একি দেবি কলপনা,            এত সুখ প্রণয়ে যে

             আগে তাহা জানিতাম না ত!

   কি এক অমৃতধারা               ঢেলেছ প্রাণের ‘পরে

             হে প্রণয় কহিব কেমনে?

   অন্য এক হৃদয়েরে                হৃদয় করা গো দান,

             সে কি এক স্বর্গীয় আমোদ।

   এক গান গায় যদি                 দুইটি হৃদয়ে মিলি,

             দেখে যদি একই স্বপন,

   এক চিন্তা এক আশা              এক ইচ্ছা দুজনার,

             এক ভাবে দুজনে পাগল,

   হৃদয়ে হৃদয়ে হয়                  সে কি গো সুখের মিল–

             এ জনমে ভাঙ্গিবে না তাহা।

   আমাদের দুজনের                 হৃদয়ে হৃদয়ে দেবি

             তেমনি মিশিয়া যায় যদি–

   এক সাথে এক স্বপ্ন              দেখি যদি দুই জনে

             তা হইলে কি হয় সুন্দর!

   নরকে বা স্বর্গে থাকি,            অরণ্যে বা কারাগারে

             হৃদয়ে হৃদয়ে বাঁধা হোয়ে–

   কিছু ভয় করি নাকো–বিহ্বল প্রণয়ঘোরে

             থাকি সদা মরমে মজিয়া।

   তাই হোক্‌–হোক্‌ দেবি আমাদের দুই জনে

             সেই প্রেম এক কোরে দিক্‌।

   মজি স্বপনের ঘোরে               হৃদয়ের খেলা খেলি

             যেন যায় জীবন কাটিয়া।”

   নিশীথে একেলা হোলে  এইরূপ কত গান

             বিরলে গাইত কবি বসিয়া বসিয়া।

   সুখ বা দুখের কথা                বুকের ভিতরে যাহা

             দিন রাত্রি করিতেছে আলোড়িত-প্রায়,

   প্রকাশ না হোলে তাহা,মরমের গুরুভারে

             জীবন হইয়া পড়ে দারুণ ব্যথিত।

   কবি তার মরমের                 প্রণয় উচ্ছ্বাস-কথা

             কি করি যে প্রকাশিবে পেত না ভাবিয়া।

   পৃথিবীতে হেন ভাষা             নাইক, মনের কথা

             পারে যাহা পূর্ণভাবে করিতে প্রকাশ।

   ভাব যত গাঢ় হয়,                প্রকাশ করিতে গিয়া

             কথা তত না পায় খুঁজিয়া খুঁজিয়া।

   বিষাদ যতই হয়                   দারুণ অন্তরভেদী,

             অশ্রুজল তত যায় শুকায়ে যেমন!

   মরমের ভার-সম                  হৃদয়ের কথাগুলি

             কত দিন পারে বল চাপিয়া রাখিতে?

   একদিন ধীরে ধীরে               বালিকার কাছে গিয়া

             অশান্ত বালক-মত কহিল কত কি!

   অসংলগ্ন কথাগুলি,             মরমের ভাব আরো

             গোলমাল করি দিল প্রকাশ না করি।

   কেবল অশ্রুর জলে,              কেবল মুখের ভাবে

             পড়িল বালিকা তার মনের কি কথা!

   এই কথাগুলি যেন                পড়িল বালিকা ধীরে–

             “কত ভাল বাসি বালা কহিব কেমনে!

    তুমিও সদয় হোয়ে               আমার সে প্রণয়ের

             প্রতিদান দিও বালা এই ভিক্ষা চাই।”

   গড়ায়ে পড়িল ধীরে                বালিকার অশ্রুজল,

             কবির অশ্রুর সাথে মিশিল কেমন–

   স্কন্ধে তার রাখি মাথা            কহিল কম্পিত স্বরে,

             “আমিও তোমারে কবি বাসি না কি ভাল?”

   কথা না স্ফুরিল আর, শুধু অশ্রুজলরাশি

             আরক্ত কপোল তার করিল প্লাবিত।

   এইরূপ মাঝে মাঝে              অশ্রুজলে অশ্রুজলে

             নীরবে গাইত তারা প্রণয়ের গীত।

   অরণ্যে দুজনে মিলি              আছিল এমন সুখে

             জগতে তারাই যেন আছিল দুজন–

   যেন তারা সুকোমল              ফুলের সুরভি শুধু,

             যেন তারা অপ্সরার সুখের সঙ্গীত।

   আলুলিত চুলগুলি               সাজাইয়া বনফুলে

             ছুটিয়া আসিত বালা কবির কাছেতে,

   একথা ওকথা লয়ে                কি যে কি কহিত বালা

             কবি ছাড়া আর কেহ বুঝিতে নারিত।

   কভু বা মুখের পানে              সে যে কি রহিত চেয়ে,

             ঘুমায়ে পড়িত যেন হৃদয় কবির।

   কভু বা কি কথা লয়ে            সে যে কি হাসিত হাসি,

             তেমন সরল হাসি দেখ নি কেহই।

   আঁধার অমার রাত্রে               একাকী পর্ব্বতশিরে

             সেও গো কবির সাথে রহিত দাঁড়ায়ে,

   উনমত্ত ঝড় বৃষ্টি                   বিদ্যুৎ আশনি আর

             পর্ব্বতের বুকে যবে বেড়াত মাতিয়া,

   তাহারো হৃদয় যেন               নদীর তরঙ্গ-সাথ

             করিত গো মাতামাতি হেরি সে বিপ্লব–

   করিত সে ছুটাছুটি,              কিছুতে সে ডরিত না,

             এমন দুরন্ত মেয়ে দেখি নি ত আর!

   কবি যা কহিত কথা              শুনিত কেমন ধীরে,

             কেমন মুখের পানে রহিত চাহিয়া।

   বনদেবতার মত                   এমন সে এলোথেলো,

             কখনো দুরন্ত অতি ঝটিকা যেমন,

   কখনো এমন শান্ত                 প্রভাতের বায়ু যথা

             নীরবে শুনে গো যবে পাখীর সঙ্গীত।

   কিন্তু, কলপনা, যদি              কবির হৃদয় দেখ

             দেখিবে এখনো তাহা পূর্ণ হয় নাই।

   এখনো কহিছে কবি,              “আরো দাও ভালবাসা,

             আরো ঢালো’ ভালবাসা হৃদয়ে আমার।”

   প্রেমের অমৃতধারা                 এত যে করেছে পান,

             তবু মিটিল না কেন প্রণয়পিপাসা?

   প্রেমের জোছনাধারা               যত ছিল ঢালি বালা

             কবির সমুদ্র-হৃদি পারে নি পূরিতে।

   স্বাধীন বিহঙ্গ-সম,                 কবিদের তরে দেবি

             পৃথিবীর কারাগার যোগ্য নহে কভু।

   অমন সমুদ্র-সম                    আছে যাহাদের মন

             তাহাদের তরে দেবি নহে এ পৃথিবী।

   তাদের উদার মন                  আকাশে উড়িতে যায়,

             পিঞ্জরে ঠেকিয়া পক্ষ নিম্নে পড়ে পুনঃ,

   নিরাশায় অবশেষে                 ভেঙ্গে চুরে যায় মন,

             জগৎ পূরায় তার আকুল বিলাপে।

   কবির সমুদ্র-বুক                   পূরাতে পারিবে কিসে

             প্রেম দিয়া ক্ষুদ্র ওই বনের বালিকা।

   কাতর ক্রন্দনে আহা               আজিও কাঁদিল কবি,

             “এখনও পূরিল না প্রাণের শূন্যতা।”

   বালিকার কাছে গিয়া               কাতরে কহিল কবি,

             “আরো দাও ভালবাসা হৃদয়ে ঢালিয়া।

   আমি যত ভালবাসি                তত দাও ভালবাসা,

             নহিলে গো পূরাবে না এ প্রাণের শূন্যতা।”

   শুনিয়া কবির কথা                 কাতরে কহিল বালা,

             “যা ছিল আমার কবি দিয়েছি সকলি–

   এ হৃদয়, এ পরাণ,                সকলি তোমার কবি,

             সকলি তোমার প্রেমে দেছি বিসর্জ্জন।

   তোমার ইচ্ছার সাথে              ইচ্ছা মিশায়েছি মোর,

             তোমার সুখের সাথে মিশায়েছি সুখ।”

   সে কথা শুনিয়া কবি               কহিল কাতর স্বরে,

             “প্রাণের শূন্যতা তবু ঘুচিল না কেন?

   ওই হৃদয়ের সাথে                  মিশাতে চাই এ হৃদি,

             দেহের আড়াল তবে রহিল গো কেন?

   সারাদিন সাধ যায়                  সুধাই মনের কথা,

             এত কথা তব কেন পাই না খুঁজিয়া?

   সারাদিন সাধ যায়                  দেখি ও মুখের পানে,

             দেখেও মিটে না কেন আঁখির পিপাসা?

   সাধ যায় এ জীবন                  প্রাণ ভোরে ভাল বাসি,

             বেসেও প্রাণের শূন্য ঘুচিল না কেন?

   আমি যত ভালবাসি                তত দাও ভালবাসা,

             নহিলে গো পূরিবে না প্রাণের শূন্যতা।

   একি দেবি! একি তৃষ্ণা জ্বলিছে হৃদয়ে মোর,

             ধরার অমৃত যত করিয়াছি পান,

   প্রকৃতির কাছে যত               তরল স্বর্গীয় গীতি,

             সকলি হৃদয়ে মোর দিয়াছি ঢালিয়া–

   শুধু দেবি পৃথিবীর                হলাহল আছে যত

             তাহাই করি নি পান মিটাতে পিপাসা!

   শুধু দেবি ঐশ্বর্য্যের               কনকশৃঙ্খল দিয়া

             বাঁধি নাই আমার এ স্বাধীন হৃদয়!

   শুধু দেবি মিটাইতে               মনের বীরত্ব-গর্ব্ব

             লক্ষ মানবের রক্তে ধুই নি চরণ!

   শুধু দেবি এ জীবনে               নিশাচর বিলাসেরে

             সুখ-স্বাস্থ্য অর্ঘ্য দিয়া করি নাই সেবা!

   তবু কেন হৃদয়ের                 তৃষা মিটিল না মোর,

             তবু কেন ঘুচিল না প্রাণের শূন্যতা?

   শুনেছি বিলাসসুরা                 বিহ্বল করিয়া হৃদি

             ডুবাইয়া রাখে সদা বিস্মৃতির ঘুমে!

   কিন্তু দেবি– কিন্তু দেবি–         এত যে পেয়েছি কষ্ট,

             বিস্মৃতি চাই নে তবু বিস্মৃতি চাই নে!–

   সে কি ভয়ানক দশা,              কল্পনাও শিহরে গো–

             স্বর্গীয় এ হৃদয়ের জীবনে মরণ!

   আমার এ মন দেবি                 হোক্‌ মরুভূমি-সম

             তৃণলতা-জল-শূন্য জ্বলন্ত প্রান্তর,

   তবুও তবুও আমি                 সহিব তা প্রাণপণে,

             বহিব তা যত দিন রহিব বাঁচিয়া,

   মিটাতে মনের তৃষা                ত্রিভুবন পর্য্যটিব,

             হত্যা করিব না তবু হৃদয় আমার।

   প্রেম ভক্তি স্নেহ আদি  মনের দেবতা যত

             যতনে রেখেছি আমি মনের মন্দিরে,

   তাঁদের করিতে পূজা              ক্ষমতা নাইকো ব’লে

             বিসর্জ্জন করিবারে পারিব না আমি।

   কিন্তু ওগো কলপনা                আমার মনের কথা

             বুঝিতে কে পারিবেক বল দেখি দেবি?

   আমার ব্যথার মর্ম্ম                কারে বুঝাইবে বল–

             বুঝাইতে না পারিলে বুক যায় ফেটে।

   যদি কেহ বলে দেবি                “তোমার কিসে দুখ,

             হৃদয়ের বিনিময়ে পেয়েছ হৃদয়,

   তবে কাল্পনিক দুখে              এত কেন ম্রিয়মাণ?’

             তবে কি বলিয়া আমি দিব গো উত্তর?

   উপায় থাকিতে তবু               যে সহে বিষাদজ্বালা

             পৃথিবী তাহারি কষ্টে হয় গো ব্যথিত–

   আমার এ বিষাদের                 উপায় নাইক কিছু,

             কারণ কি তাও দেবি পাই না খুঁজিয়া।

   পৃথিবী আমার কষ্ট                 বুঝুক্‌ বা না বুঝুক্‌,

             নলিনীরে কি বলিয়া বুঝাইব দেবি?

   তাহারে সামান্য কথা              গোপন করিলে পরে

             হৃদয়ে কি কষ্ট হয় হৃদয় তা জানে।

   এত তারে ভালবাসি,             তবু কেন মনে হয়

             ভালবাসা হইল না আশ মিটাইয়া!

   আঁধার সমুদ্রতলে                  কি যেন বেড়াই খুঁজে,

             কি যেন পাইতেছি না চাহিতেছি যাহা।

   বুকের যেখানে তারে              রাখিতে চাই গো আমি

             সেখানে পাই নে যেন রাখিতে তাহারে–

   তাইতে অন্তর বুক                 এখনো পূরিতেছে না,

             তাইতে এখনো শূন্য রয়েছে হৃদয়।”

   কবির প্রণয়সিন্ধু                   ক্ষুদ্র বালিকার মন

             রেখেছিল মগ্ন করি অগাধ সলিলে–

   উপরে যে ঝড় ঝঞ্ঝা               কত কি বহিয়া যেত

             নিম্নে তার কোলাহল পেত না শুনিতে,

   প্রণয়ের অবিচিত্র                   নিয়তনূতন তবু

             তরঙ্গের কলধ্বনি শুনিত কেবল,

   সেই একতান ধ্বনি                 শুনিয়া শুনিয়া তার

             হৃদয় পড়িয়াছিল ঘুমায়ে কেমন!

   বনের বালিকা আহা               সে ঘুমে বিহ্বল হোয়ে

             কবির হৃদয়ে রাখি অবশ মস্তক

   স্বর্গের স্বপন শুধু                  দেখিত দিবস রাত,

             হৃদয়ের হৃদয়ের অনন্ত মিলন।

   বালিকার সে হৃদয়ে                সে প্রণয়মগ্ন হৃদে,

             অবশিষ্ট আছিল না এক তিল স্থান–

   আর কিছু জানিত না,   আর কিছু ভাবিত না,

             শুধু সে বালিকা ভাল বাসিত কবিরে।

   শুধু সে কবির গান                 কত যে লাগিত ভাল,

             শুনে শুনে শুনা তার ফুরাত না আর।

   শুধু সে কবির নেত্র                কি এক স্বর্গীয় জ্যোতি

             বিকীরিত, তাই হেরি হইত বিহ্বল!

   শুধু সে কবির কোলে    ঘুমাতে বাসিত ভাল,

             কবি তার চুল লয়ে করিত কি খেলা।

   শুধু সে কবিরে বালা              শুনতে বাসিত ভাল

             কত কি–কত কি কথা অর্থ নাই যার,

   কিন্তু সে কথায় কবি               কত যে পাইত অর্থ

             গভীর সে অর্থ নাই কত কবিতার–

   সেই অর্থহীন কথা,                হৃদয়ের ভাব যত

             প্রকাশ করিতে পারে না এমন কিছু না।

   একদিন বালিকারে                 কবি সে কহিল গিয়া–

             “নলিনি! চলিনু আমি ভ্রমিতে পৃথিবী!

   আর একবার বালা                 কাশ্মীরের বনে বনে

             যাই গো শুনিতে আমি পাখীর কবিতা!

   রুসিয়ার হিমক্ষেত্রে                আফ্রিকার মরুভূমে

             আর একবার আমি করি গে ভ্রমণ!

   এইখানে থাক তুমি,              ফিরিয়া আসিয়া পুনঃ

             ওই মধুমুখখানি করিব চুম্বন।”

   এতেক কহিয়া কবি                নীরবে চলিয়া গেল

             গোপনে মুছিয়া ফেলি নয়নের জল।

   বালিকা নয়ন তুলি                নীরবে রহিল চাহি,

             কি দেখিছে সেই জানে অনিমিষ চখে।

   সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে   তবুও রহিল চাহি,

             তবুও ত পড়িল না নয়নে নিমেষ।

   অনিমিষ নেত্র ক্রমে                করিয়া প্লাবিত

             একবিন্দু দুইবিন্দু ঝরিল সলিল।

   বাহুতে লুকায়ে মুখ               কাতর বালিকা

             মর্ম্মভেদী অশ্রুজলে করিল রোদন।

   হা-হা কবি কি করিলে,ফিরে দেখ, ফিরে এস,

             দিও না বালার হৃদে অমন আঘাত–

   নীরবে বালার আহা                কি বজ্র বেজেছে বুকে,

             গিয়াছে কোমল মন ভাঙ্গিয়া চুরিয়া!

   হা কবি অমন কোরে               অনর্থক তার মনে

             কি আঘাত করিলে যে বুঝিলে না তাহা?

   এত কাল সুখস্বপ্ন                  ডুবায়ে রাখিয়া মন,

             এত দিন পরে তাহা দিবে কি ভাঙ্গিয়া?

   কবি ত চলিয়া যায়–    সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে,

             আঁধারে কাননভূমি হইল গম্ভীর–

   একটি নড়ে না পাতা,   একটু বহে না বায়ু,

             স্তব্ধ বন কি যেন কি ভাবিছে নীরবে!

   তখন বনান্ত হোতে                সুধীরে শুনিল কবি

             উঠিছে নীরব শূন্যে বিষণ্ণ সঙ্গীত–

   তাই শুনি বন যেন                 রয়েছে নীরবে অতি,

             জোনাকি নয়ন শুধু মেলিছে মুদিছে।

   একবার কবি শুধু                  চাহিল কুটীরপানে,

             কাতরে বিদায় মাগি বনদেবী-কাছে

   নয়নের জল মুছি–                যে দিকে নয়ন চলে

             সে দিকে পথিক কবি যাইল চলিয়া।

                       সঙ্গীত

             কেন ভালবাসিলে আমায়?

             কিছুই নাইক গুণ, কিছুই জানি না আমি,

             কি আছে? কি দিয়ে তব তুষিব হৃদয়!

  যা আমার ছিল সাধ্য               সকলি করেছি আমি

             কিছুই করি নি দোষ চরণে তোমার,

  শুধু ভাল বাসিয়াছি,               শুধু এ পরান মন

             উপহার সঁপিয়াছি তোমার চরণে।

  তাতেও তোমার মন              তুষিতে নারিনু যদি

             তবে কি করিব বল, কি আছে আমার?

  গেলে যদি, গেলে চলি,           যাও যেথা ভাল লাগে–

             একবার মনে কোরো দীন অধীনীরে।

  ভ্রমিতে ধরার মাঝে                যত ভালবাসা পাবে,

             তাতে যদি ভাল থাক তাই হোক্‌ তবে–

  তবু একবার যদি                   মনে কর নলিনীরে

             যে দুখিনী, যে তোমারে এত ভালবাসে!

  কি করিলে মন তব                পারিতাম জুড়াইতে

             যদি জানিতাম কবি করিতাম তাহা!

  আমি অতি অভাগিনী              জানি না বলিয়া যেন

             বিরক্ত হোয়ো না কবি এই ভিক্ষা দাও!

  না জানিয়া না শুনিয়া              যদি দোষ করে থাকি,

  ক্ষুদ্র আমি, ক্ষমা তবে করিয়ো আমারে–

  তুমি ভাল থেকো কবি,ক্ষুদ্র এক কাঁটা যেন

             ফুটে না তোমার পায়ে ভ্রমিতে পৃথিবী।

  জননি, কোথায় তুমি              রেখে গেলে দুহিতারে?

             কত দিন একা একা কাটালাম হেথা,

  একেলা তুলিয়া ফুল              কত মালা গাঁথিতাম,

             একেলা কাননময় করিতাম খেলা!

  তোমার বীণাটি ল’য়ে,   উঠিয়া পর্ব্বতশিরে

             একেলা আপন মনে গাইতাম গান–

  হরিণশিশুটি মোর                  বসিত পায়ের তলে,

             পাখীটি কাঁধের ‘পরে শুনিত নীরবে।

  এইরূপ কত দিন                   কাটালেম বনে বনে,

             কত দিন পরে তবে এলে তুমি কবি!

  তখন তোমারে কবি               কি যে ভালবাসিলাম

  এত ভাল কাহারেও বাসি নাই কভু।

  দূর স্বরগের এক                   জ্যোতির্ম্ময় দেব-সম

             কত বার মনে মনে করেছি প্রণাম।

  দূর থেকে আঁখি ভরি             দেখিতাম মুখখানি,

             দূর থেকে শুনিতাম মধুময় গান।

  যে দিন আপনি আসি    কহিলে আমার কাছে

             ক্ষুদ্র এই বালিকারে ভালবাস তুমি,

  সে দিন কি হর্ষে কবি    কি আনন্দে কি উচ্ছ্বাসে

             ক্ষুদ্র এ হৃদয় মোর ফেটে গেল যেন।

  আমি কোথাকার কেবা! আমি ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র,

             স্বর্গের দেবতা তুমি ভালবাস মোরে?

  এত সৌভাগ্য, কবি,     কখনো করি নি আশা–

             কখনো মুহূর্ত্ত-তরে জানি নি স্বপনে।

  যেথায় যাও-না কবি,              যেথায় থাক-না তুমি,

             আমরণ তোমারেই করিব অর্চ্চনা।

  মনে রাখ নাই রাখ,                তুমি যেন সুখে থাক

             দেবতা! এ দুখিনীর শুন গো প্রার্থনা।

 

Amar Rabindranath Logo

কবি কাহিনী তৃতীয় সর্গ কবিতা | কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবি কাহিনী তৃতীয় সর্গ | Kobi Kahini, Tritio Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবি কাহিনী তৃতীয় সর্গ | Kobi Kahini, Tritio Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কত দেশ দেশান্তরে ভ্রমিল সে কবি!

তুষারস্তম্ভিত গিরি করিল লঙ্ঘন,

সুতীক্ষ্নকণ্টকময় অরণ্যের বুক

মাড়াইয়া গেল চলি রক্তময় পদে।

কিন্তু বিহঙ্গের গান, নির্ঝরের ধ্বনি,

পারে না জুড়াতে আর কবির হৃদয়।

বিহগ, নির্ঝর-ধ্বনি প্রকৃতির গীত–

মনের যে ভাগে তার প্রতিধ্বনি হয়

সে মনের তন্ত্রী যেন হোয়েছে বিকল।

একাকী যাহাই আগে দেখিত সে কবি

তাহাই লাগিত তার কেমন সুন্দর,

এখন কবির সেই একি হোলো দশা–

যে প্রকৃতি-শোভা-মাঝে নলিনী না থাকে

ঠেকে তা শূন্যের মত কবির নয়নে,

নাইক দেবতা যেন মন্দিরমাঝারে।

বালার মুখের জ্যোতি করিত বর্দ্ধন

প্রকৃতির রূপচ্ছটা দ্বিগুণ করিয়া;

সে না হোলে অমবস্যানিশির মতন

সমস্ত জগৎ হোত বিষণ্ণ আঁধার।

জ্যোৎস্নায় নিমগ্ন ধরা, নীরব রজনী।

অরণ্যের অন্ধকারময় গাছগুলি

মাথার উপরে মাখি রজত জোছনা,

শাখায় শাখায় ঘন করি জড়াজড়ি,

কেমন গম্ভীরভাবে রোয়েছে দাঁড়ায়ে।

হেথায় ঝোপের মাঝে প্রচ্ছন্ন আঁধার,

হোথায় সরসীবক্ষে প্রশান্ত জোছনা।

নভপ্রতিবিম্বশোভী ঘুমন্ত সরসী

চন্দ্র তারকার স্বপ্ন দেখিতেছে যেন!

লীলাময় প্রবাহিণী চলেছে ছুটিয়া,

লীলাভঙ্গ বুকে তার পাদপের ছায়া

ভেঙ্গে চুরে কত শত ধরিছে মূরতি।

গাইছে রজনী কিবা নীরব সঙ্গীত!

কেমন নীরব বন নিস্তব্ধ গম্ভীর–

শুধু দূর-শৃঙ্গ হোতে ঝরিছে নির্ঝর,

শুধু একপাশ দিয়া সঙ্কুচিত অতি

তটিনীটি সর সর যেতেছে চলিয়া।

অধীর বসন্তবায়ু মাঝে মাঝে শুধু

ঝরঝরি কাঁপাইছে গাছের পল্লব।

এহেন নিস্তব্ধ রাত্রে কত বার আমি

গম্ভীর অরণ্যে একা কোরেছি ভ্রমণ।

স্নিগ্ধ রাত্রে গাছপালা ঝিমাইছে যেন,

ছায়া তার পোড়ে আছে হেথায় হোথায়।

দেখিয়াছি নীরবতা যত কথা কয়

প্রাণের মরম-তলে, এত কেহ নয়।

দেখি যবে অতি শান্ত জোছনায় মজি

নীরবে সমস্ত ধরা রয়েছে ঘুমায়ে,

নীরবে পরশে দেহ বসন্তের বায়,

জানি না কি এক ভাবে প্রাণের ভিতর

উচ্ছ্বসিয়া উথলিয়া উঠে গো কেমন!

কি যেন হারায়ে গেছে খুঁজিয়া না পাই,

কি কথা ভুলিয়া যেন গিয়েছি সহসা,

বলা হয় নাই যেন প্রাণের কি কথা,

প্রকাশ করিতে গিয়া পাই না তা খুঁজি!

কে আছে এমন যার এ হেন নিশীথে,

পুরাণো সুখের স্মৃতি উঠে নি উথলি!

কে আছে এমন যার জীবনের পথে

এমন একটি সুখ যায় নি হারায়ে,

যে হারা-সুখের তরে দিবা নিশি তার

হৃদয়ের এক দিক শূন্য হোয়ে আছে।

এমন নীরব-রাত্রে সে কি গো কখনো

ফেলে নাই মর্ম্মভেদী একটি নিশ্বাস?

কর স্থানে আজ রাত্রে নিশীথপ্রদীপে

উঠিছে প্রমোদধ্বনি বিলাসীর গৃহে।

মুহূর্ত্ত ভাবে নি তারা আজ নিশীথেই

কত চিত্ত পুড়িতেছে প্রচ্ছন্ন অনলে।

কত শত হতভাগা আজ নিশীথেই

হারায়ে জন্মের মত জীবনের সুখ

মর্ম্মভেদী যন্ত্রণায় হইয়া অধীর

একেলাই হা হা করি বেড়ায় ভ্রমিয়া!

ঝোপে-ঝাপে ঢাকা ওই অরণ্যকুটীর।

বিষণ্ণ নলিনীবালা শূন্য নেত্র মেলি

চাঁদের মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া!

জানি না কেমন কোরে বালার বুকের মাঝে

সহসা কেমন ধারা লেগেছে আঘাত–

আর সে গায় না গান, বসন্ত ঋতুর অন্তে

পাপিয়ার কণ্ঠ যেন হোয়েছে নীরব।

আর সে লইয়া বীণা বাজায় না ধীরে ধীরে,

আর সে ভ্রমে না বালা কাননে কাননে।

বিজন কুটীরে শুধু মরণশয্যার ‘পরে

একেলা আপন মনে রয়েছে শুইয়া।

যে বালা মুহূর্ত্তকাল স্থির না থাকিত কভু,

শিখরে নির্ঝরে বনে করিত ভ্রমণ–

কখনো তুলিত ফুল, কখনো গাঁথিত মালা,

কখনো গাইত গান, বাজাইত বীণা–

সে আজ এমন শান্ত, এমন নীরব স্থির!

এমন বিষণ্ণ শীর্ণ সে প্রফুল্ল মুখ!

এক দিন, দুই দিন, যেতেছে কাটিয়া ক্রমে–

মরণের পদশব্দ গণিছে সে যেন!

আর কোন সাধ নাই, বাসনা রয়েছে শুধু

কবিরে দেখিয়া যেন হয় গো মরণ।

এ দিকে পৃথিবী ভ্রমি সহিয়া ঝটিকা কত

ফিরিয়া আসিছে কবি কুটীরের পানে,

মধ্যাহ্নের রৌদ্রে যথা জ্বলিয়া পুড়িয়া পাখী

সন্ধ্যায় কুলায়ে তার আইসে ফিরিয়া।

বহুদিন পরে কবি পদার্পিল বনভূমে,

বৃক্ষলতা সবি তার পরিচিত সখা!

তেমনি সকলি আছে, তেমনি গাইছে পাখী,

তেমনি বহিছে বায়ু ঝর ঝর করি।

অধীরে চলিল কবি কুটীরের পানে–

দুয়ারের কাছে গিয়া দুয়ারে আঘাত দিয়া

ডাকিল অধীর স্বরে, নলিনী! নলিনী!

কিছু নাই সাড়া শব্দ, দিল না উত্তর কেহ,

প্রতিধ্বনি শুধু তারে করিল বিদ্রূপ।

কুটীরে কেহই নাই, শূন্য তা রয়েছে পড়ি–

বেষ্টিত বিতন্ত্রী বীণা লূতাতন্তুজালে।

ভ্রমিল আকুল কবি কাননে কাননে,

ডাকিয়া সমুচ্চ স্বরে, নলিনী! নলিনী!

মিলিয়া কবির স্বরে বনদেবী উচ্চস্বরে

ডাকিল কাতরে আহা, নলিনী! নলিনী!

কেহই দিল না সাড়া, শুধু সে শব্দ শুনি

সুপ্ত হরিণেরা ত্রস্ত উঠিল জাগিয়া।

অবশেষে গিরিশৃঙ্গে উঠিল কাতর কবি,

নলিনীর সাথে যেথা থাকিত বসিয়া।

দেখিল সে গিরি-শৃঙ্গে, শীতল তুষার-‘পরে,

নলিনী ঘুমায়ে আছে ম্লানমুখচ্ছবি।

কঠোর তুষারে তার এলায়ে পড়েছে কেশ,

খসিয়া পড়েছে পাশে শিথিল আঁচল।

বিশাল নয়ন তার অর্দ্ধনিমীলিত,

হাত দুটি ঢাকা আছে অনাবৃত বুকে।

একটি হরিণশিশু খেলা করিবার তরে

কভু বা অঞ্চল ধরি টানিতেছে তার,

কভু শৃঙ্গ দুটি দিয়া সুধীরে দিতেছে ঠেলি,

কভু বা অবাক্‌ নেত্রে রহিছে চাহিয়া!

তবু নলিনীর ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গিছে না,

নীরবে নিস্পন্দ হোয়ে রয়েছে ভূতলে।

দূর হোতে কবি তারে দেখিয়া কহিল উচ্চে,

“নলিনী, এয়েছি আমি দেখ্‌সে বালিকা।”

তবুও নলিনী বালা না দিয়া উত্তর

শীতল তুষার-‘পরে রহিল ঘুমায়ে।

কবি সে শিখর-‘পরে করি আরোহণ

শীতল অধর তার করিল চুম্বন–

শিহরিয়া চমকিয়া দেখিল সে কবি

না নড়ে হৃদয় তার, না পড়ে নিশ্বাস।

দেখিল না, ভাবিল না, কহিল না কিছু,

যেমন চাহিয়া ছিল রহিল চাহিয়া।

নিদারুণ কি যেন কি দেখিছে তরাসে

নয়ন হইয়া গেল অচল পাষাণ।

কতক্ষণে কবি তবে পাইল চেতন,

দেখিল তুষারশুভ্র নলিনীর দেহ

হৃদয়জীবনহীন জড় দেহ তার

অনুপম সৌন্দর্য্যের কুসুম-আলয়,

হৃদয়ের মরমের আদরের ধন–

তৃণ কাষ্ঠ সম ভূমে যায় গড়াগড়ি!

বুকে তারে তুলে লয়ে ডাকিল “নলিনী”,

হৃদয়ে রাখিয়া তারে পাগলের মত কবি

কহিল কাতর স্বরে “নলিনী” “নলিনী”!

স্পন্দহীন, রক্তহীন অধর তাহার

অধীর হইয়া ঘন করিল চুম্বন।

  তার পর দিন হোতে সে বনে কবিরে আর

পেলে না দেখিতে কেহ, গেছে সে কোথায়!

ঢাকিল নলিনীদেহ তুষারসমাধি–

ক্রমে সে কুটীরখানি কোথা ভেঙ্গে চুরে গেল,

ক্রমে সে কানন হোলো গ্রাম লোকালয়,

সে কাননে–কবির সে সাধের কাননে

অতীতের পদচিহ্ন রহিল না আর।

 

কবি কাহিনী চতুর্থ সর্গ কবিতা | কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবি কাহিনী চতুর্থ সর্গ | Kobi Kahini, Chaturtha Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি কাহিনী চতুর্থ সর্গ | Kobi Kahini, Chaturtha Sorgo। কবি কাহিনী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“এ তবে স্বপন শুধু, বিম্বের মতন

আবার মিলায়ে গেল নিদ্রার সমুদ্রে!

সারারাত নিদ্রার করিনু আরাধনা–

যদি বা আইল নিদ্রা এ শ্রান্ত নয়নে,

মরীচিকা দেখাইয়া গেল গো মিলায়ে!

হা স্বপ্ন, কি শক্তি তোর, এ হেন মূরতি

মুহূর্ত্তের মধ্যে তুই ভাঙ্গিলি, গড়িলি?

হা নিষ্ঠুর কাল, তোর এ কিরূপ খেলা–

সত্যের মতন গড়িলি প্রতিমা,

স্বপ্নের মতন তাহা ফেলিলি ভাঙ্গিয়া?

কালের সমুদ্রে এক বিম্বের মতন

উঠিল, আবার গেল মিলায়ে তাহাতে?

না না, তাহা নয় কভু, নলিনী, সে কি গো

কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত!

যাহার মোহিনী মূর্ত্তি হৃদয়ে হৃদয়ে

শিরায় শিরায় আঁকা শোণিতের সাথে,

যত কাল রব বেঁচে যার ভালবাসা

চিরকাল এ হৃদয়ে রহিবে অক্ষয়,

সে বালিকা, সে নলিনী, সে স্বর্গপ্রতিমা,

কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত

তরঙ্গের অভিঘাতে জন্মিল মিশিল?

না না, তাহা নয় কভু, তা যেন না হয়!

দেহকারাগারমুক্ত সে নলিনী এবে

সুখে দুখে চিরকাল সম্পদে বিপদে

আমারই সাথে সাথে করিছে ভ্রমণ।

চিরহাস্যময় তার প্রেমদৃষ্টি মেলি

আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া।

রক্ষক দেবতা সম আমারি উপরে

প্রশান্ত প্রেমের ছায়া রেখেছে বিছায়ে।

দেহকারাগারমুক্ত হইলে আমিও

তাহার হৃদয়সাথে মিশাব হৃদয়।

নলিনী, আছ কি তুমি, আছ কি হেথায়?

একবার দেখা দেও, মিটাও সন্দেহ!

চিরকাল তরে তোরে ভুলিতে কি হবে?

তাই বল্‌ নলিনী লো, বল্‌ একবার!

চিরকাল আর তোরে পাব না দেখিতে,

চিরকাল আর তোর হৃদয়ে হৃদয়

পাব না কি মিশাইতে, বল্‌ একবার।

মরিলে কি পৃথিবীর সব যায় দূরে?

তুই কি আমারে ভুলে গেছিস্‌ নলিনি?

তা হোলে নলিনি, আমি চাই না মরিতে।

তোর ভালবাসা যেন চিরকাল মোর

হৃদয়ে অক্ষয় হোয়ে থাকে গো মুদ্রিত–

কষ্ট পাই পাব, তবু চাই না ভুলিতে!

তুমি নাহি থাক যদি তোমার স্মৃতিও

থাকে যেন এ হৃদয় করিয়া উজ্জ্বল!

এই ভালবাসা যাহা হৃদয়ে মরমে

অবশিষ্ট রাখে নাই এক তিল স্থান,

একটি পার্থিব ক্ষুদ্র নিশ্বাসের সাথে

মুহূর্ত্তে না পালটিতে আঁখির পলক

ক্ষণস্থায়ী কুসুমের সুরভের মত

শূন্য এই বায়ুস্রোতে যাইবে মিশায়ে?

হিমাদ্রির এই স্তব্ধ আঁধার গহ্বরে

সময়ের পদক্ষেপ গণিতেছি বসি,

ভবিষ্যৎ ক্রমে হইতেছে বর্ত্তমান,

বর্ত্তমান মিশিতেছে অতীতসমুদ্রে।

অস্ত যাইতেছে নিশি, আসিছে দিবস,

দিবস নিশার কোলে পড়িছে ঘুমায়ে।

এই সময়ের চক্র ঘুরিয়া নীরবে

পৃথিবীরে মানুষেরে অলক্ষিতভাবে

পরিবর্ত্তনের পথে যেতেছে লইয়া,

কিন্তু মনে হয় এই হিমাদ্রীর বুকে

তাহার চরণ-চিহ্ন পড়িছে না যেন।

কিন্তু মনে হয় যেন আমার হৃদয়ে

দুর্দ্দাম সময়স্রোত অবিরামগতি,

নূতন গড়ে নি কিছু, ভাঙ্গে নি পুরাণো।

বাহিরের কত কি যে ভাঙ্গিল চূরিল,

বাহিরের কত কি যে হইল নূতন,

কিন্তু ভিতরের দিকে চেয়ে দেখ দেখি–

আগেও আছিল যাহা এখনো তা আছে,

বোধ হয় চিরকাল থাকিবে তাহাই!

বরষে বরষে দেহ যেতেছে ভাঙ্গিয়া,

কিন্তু মন আছে তবু তেমনি অটল।

নলিনী নাইকো বটে পৃথিবীতে আর,

নলিনীরে ভালবাসি তবুও তেমনি।

যখন নলিনী ছিল, তখন যেমন

তার হৃদয়ের মূর্ত্তি ছিল এ হৃদয়ে,

এখনো তেমনি তাহা রয়েছে স্থাপিত।

এমন অন্তরে তারে রেখেছি লুকায়ে,

মরমের মর্ম্মস্থলে করিতেছি পূজা,

সময় পারে না সেথা কঠিন আঘাতে

ভাঙ্গিবারে এ জনমে সে মোর প্রতিমা,

হৃদয়ের আদরের লুকানো সে ধন!

ভেবেছিনু এক বার এই-যে বিষাদ

নিদারুণ তীব্র স্রোতে বহিছে হৃদয়ে

এ বুঝি হৃদয় মোর ভাঙ্গিবে চূরিবে–

পারে নি ভাঙ্গিতে কিন্তু এক তিল তাহা,

যেমন আছিল মন তেমনি রয়েছে!

বিষাদ যুঝিয়াছিল প্রাণপণে বটে,

কিন্তু এ হৃদয়ে মোর কি যে আছে বল,

এ দারুণ সমরে সে হইয়াচে জয়ী।

গাও গো বিহগ তব প্রমোদের গান,

তেমনি হৃদয়ে তার রবে প্রতিধ্বনি!

প্রকৃতি! মাতার মত সুপ্রসন্ন দৃষ্টি

যেমন দেখিয়াছিনু ছেলেবেলা আমি,

এখনো তেমনি যেন পেতেছি দেখিতে।

যা কিছু সুন্দর, দেবি, তাহাই মঙ্গল,

তোমার সুন্দর রাজ্যে হে প্রকৃতিদেবি

তিল অমঙ্গল কভু পারে না ঘটিতে।

অমন সুন্দর আহা নলিনীর মন,

জীবন সৌন্দর্য্য, দেবি তোমার এ রাজ্যে

অনন্ত কালের তরে হবে না বিলীন।

যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবে তা দেবি,

এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়।

তোমার আশ্বাসবাক্যে হে প্রকৃতিদেবি,

সংশয় কখনো আমি করি না স্বপনে!

বাজাও রাখাল তব সরল বাঁশরী!

গাও গো মনের সাধে প্রমোদের গান!

পাখীরা মেলিয়া যবে গাইতেছে গীত,

কানন ঘেরিয়া যবে বহিতেছে বায়ু,

উপত্যকাময় যবে ফুটিয়াছে ফুল,

তখন তোদের আর কিসের ভাবনা?

দেখি চিরহাস্যময় প্রকৃতির মুখ,

দিবানিশি হাসিবারে শিখেছিস্‌ তোরা!

সমস্ত প্রকৃতি যবে থাকে গো হাসিতে,

সমস্ত জগৎ যবে গাহে গো সঙ্গীত,

তখন ত তোরা নিজ বিজন কুটীরে

ক্ষুদ্রতম আপনার মনের বিষাদে

সমস্ত জগৎ ভুলি কাঁদিস না বসি!

জগতের, প্রকৃতির ফুল্ল মুখ হেরি

আপনার ক্ষুদ্র দুঃখ রহে কি গো আর?

ধীরে ধীরে দূর হোতে আসিছে কেমন

বসন্তের সুরভিত বাতাসের সাথে

মিশিয়া মিশিয়া এই সরল রাগিণী।

একেক রাগিণী আছে করিলে শ্রবণ

মনে হয় আমারি তা প্রাণের রাগিণী–

সেই রাগিণীর মত আমার এ প্রাণ,

আমার প্রাণের মত যেন সে রাগিণী!

কখন বা মনে হয় পুরাতন কাল

এই রাগিণীর মত আছিল মধুর,

এমনি স্বপনময় এমনি অস্ফুট–

পাই শুনি ধীরি ধীরি পুরাতন স্মৃতি

প্রাণের ভিতরে যেন উথলিয়া উঠে!”

ক্রমে কবি যৌবনের ছাড়াইয়া সীমা,

গম্ভীর বার্দ্ধক্যে আসি হোলো উপনীত!

সুগম্ভীর বৃদ্ধ কবি, স্কন্ধে আসি তার

পড়েছে ধবল জটা অযত্নে লুটায়ে!

মনে হোতো দেখিলে সে গম্ভীর মুখশ্রী

হিমাদ্রি হোতেও বুঝি সমুচ্চ মহান্‌!

নেত্র তাঁর বিকীরিত কি স্বর্গীয় জ্যোতি,

যেন তাঁর নয়নের শান্ত সে কিরণ

সমস্ত পৃথিবীময় শান্তি বরষিবে।

বিস্তীর্ণ হইয়া গেল কবির সে দৃষ্টি,

দৃষ্টির সম্মুখে তার, দিগন্তও যেন

খুলিয়া দিত গো নিজ অভেদ্য দুয়ার।

যেন কোন দেববালা কবিরে লইয়া

অনন্ত নক্ষত্রলোকে কোরেছে স্থাপিত–

সামান্য মানুষ যেথা করিলে গমন

কহিত কাতর স্বরে ঢাকিয়া নয়ন,

“এ কি রে অনন্ত কাণ্ড, পারি না সহিতে!”

সন্ধ্যার আঁধারে হোথা বসিয়া বসিয়া,

কি গান গাইছে কবি, শুন কলপনা।

কি “সুন্দর সাজিয়াছে ওগো হিমালয়

তোমার বিশালতম শিখরের শিরে

একটি সন্ধ্যার তারা! সুনীল গগন

ভেদিয়া, তুষারশুভ্র মস্তক তোমার!

সরল পাদপরাজি আঁধার করিয়া

উঠেছে তাহার পরে; সে ঘোর অরণ্য

ঘেরিয়া হুহুহু করি তীব্র শীতবায়ু

দিবানিশি ফেলিতেছে বিষণ্ণ নিশ্বাস!

শিখরে শিখরে ক্রমে নিভিয়া আসিল

অস্তমান তপনের আরক্ত কিরণে

প্রদীপ্ত জলদচূর্ণ। শিখরে শিখরে

মলিন হইয়া এল উজ্জ্বল তুষার,

শিখরে শিখরে ক্রমে নামিয়া আসিল

আঁধারের যবনিকা ধীরে ধীরে ধীরে!

পর্ব্বতের বনে বনে গাঢ়তর হোলো

ঘুমময় অন্ধকার। গভীর নীরব!

সাড়াশব্দ নাই মুখে, অতি ধীরে ধীরে

অতি ভয়ে ভয়ে যেন চলেছে তটিনী

সুগম্ভীর পর্ব্বতের পদতল দিয়া!

কি মহান্‌! কি প্রশান্ত! কি গম্ভীর ভাব!

ধরার সকল হোতে উপরে উঠিয়া

স্বর্গের সীমায় রাখি ধবল জটায়

জড়িত মস্তক তব ওগো হিমালয়

নীরব ভাষায় তুমি কি যেন একটি

গম্ভীর আদেশ ধীরে করিছ প্রচার!

সমস্ত পৃথিবী তাই নীরব হইয়া

শুনিছে অনন্যমনে সভয়ে বিস্ময়ে।

আমিও একাকী হেথা রয়েছি পড়িয়া,

আঁধার মহা-সমুদ্রে গিয়াছি মিশায়ে,

ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র নর আমি, শৈলরাজ!

অকূল সমুদ্রে ক্ষুদ্র তৃণটির মত

হারাইয়া দিগ্বিদিক্‌, হারাইয়া পথ,

সভয়ে বিস্ময়ে, হোয়ে হতজ্ঞানপ্রায়

তোমার চরণতলে রয়েছি পড়িয়া।

ঊর্দ্ধ্বমুখে চেয়ে দেখি ভেদিয়া আঁধার

শূন্যে শূন্যে শত শত উজ্জ্বল তারকা,

অনিমিষ নেত্রগুলি মেলিয়া যেন রে

আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া।

ওগো হিমালয়, তুমি কি গম্ভীর ভাবে

দাঁড়ায়ে রয়েছ হেথা অচল অটল,

দেখিছ কালের লীলা, করিছ গননা,

কালচক্র কত বার আইল ফিরিয়া!

সিন্ধুর বেলার বক্ষে গড়ায় যেমন

অযুত তরঙ্গ, কিছু লক্ষ্য না করিয়া

কত কাল আইল রে, গেল কত কাল

হিমাদ্রি তোমার ওই চক্ষের উপরি।

মাথার উপর দিয়া কত দিবাকর

উলটি কালের পৃষ্ঠা গিয়াছে চলিয়া।

গম্ভীর আঁধারে ঢাকি তোমার ও দেহ

কত রাত্রি আসিয়াছে গিয়াছে পোহায়ে।

কিন্তু বল দেখি ওগো হিমালয়গিরি

মানুষসৃষ্টির অতি আরম্ভ হইতে

কি দেখিছ এইখানে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে?

যা দেখিছ যা দেখেছ তাতে কি এখনো

সর্ব্বাঙ্গ তোমার গিরি উঠে নি শিহরি?

কি দারুণ অশান্তি এই মনুষ্যজগতে–

রক্তপাত, অত্যাচার , পাপ কোলাহল

দিতেছে মানবমনে বিষ মিশাইয়া!

কত কোটি কোটি লোক, অন্ধকারাগারে

অধীনতাশৃঙ্খলেতে আবদ্ধ হইয়া

ভরিছে স্বর্গের কর্ণ কাতর ক্রন্দনে,

অবশেষে মন এত হোয়েছে নিস্তেজ,

কলঙ্কশৃঙ্খল তার অলঙ্কাররূপে

আলিঙ্গন ক’রে তারে রেখেছে গলায়!

দাসত্বের পদধূলি অহঙ্কার কোরে

মাথায় বহন করে পরপ্রত্যাশীরা!

যে পদ মাথায় করে ঘৃণার আঘাত

সেই পদ ভক্তিভরে করে গো চুম্বন!

যে হস্ত ভ্রাতারে তার পরায় শৃঙ্খল,

সেই হস্ত পরশিলে স্বর্গ পায় করে।

স্বাধীন, সে অধীনেরে দলিবার তরে,

অধীন, সে স্বাধীনেরে পূজিবারে শুধু!

সবল, সে দুর্ব্বলেরে পীড়িতে কেবল–

দুর্ব্বল, বলের পদে আত্ম বিসর্জ্জিতে!

স্বাধীনতা কারে বলে জানে সেই জন

কোথায় সেই অসহায় অধীন জনের

কঠিন শৃঙ্খলরাশি দিবে গো ভাঙ্গিয়া,

না, তার স্বাধীন হস্ত হোয়েছে কেবল

অধীনের লৌহপাশ দৃঢ় করিবারে।

সবল দুর্ব্বলে কোথা সাহায্য করিবে–

দুর্ব্বলে অধিকতর করিতে দুর্ব্বল

বল তার– হিমগিরি, দেখিছ কি তাহা?

সামান্য নিজের স্বার্থ করিতে সাধন

কত দেশ করিতেছে শ্মশান অরণ্য,

কোটি কোটি মানবের শান্তি স্বাধীনতা

রক্তময়পদাঘাতে দিতেছে ভাঙ্গিয়া,

তবুও মানুষ বলি গর্ব্ব করে তারা,

তবু তারা সভ্য বলি করে অহঙ্কার!

কত রক্তমাখা ছুরি হাসিছে হরষে,

কত জিহ্বা হৃদয়েরে ছিঁড়িছে বিঁধিছে!

বিষাদের অশ্রুপূর্ণ নয়ন হে গিরি

অভিশাপ দেয় সদা পরের হরষে,

উপেক্ষা ঘৃণায় মাখা কুঞ্চিত অধর

পরঅশ্রুজলে ঢালে হাসিমাখা বিষ!

পৃথিবী জানে না গিরি হেরিয়া পরের জ্বালা,

হেরিয়া পরের মর্ম্মদুখের উচ্ছ্বাস,

পরের নয়নজলে মিশাতে নয়নজল–

পরের দুখের শ্বাসে মিশাতে নিশ্বাস!

প্রেম? প্রেম কোথা হেথা এ অশান্তিধামে?

প্রণয়ের ছদ্মবেশ পরিয়া যেথায়

বিচরে ইন্দ্রিয়সেবা, প্রেম সেথা আছে?

প্রেমে পাপ বলে যারা, প্রেম তারা চিনে?

মানুষে মানুষে যেথা আকাশ পাতাল,

হৃদয়ে হৃদয়ে যেথা আত্ম-অভিমান,

যে ধরায় মন দিয়া ভাল বাসে যারা

উপেক্ষা বিদ্বেষ ঘৃণা মিথ্যা অপবাদে

তারাই অধিক সহে বিষাদ যন্ত্রণা,

সেথা যদি প্রেম থাকে তবে কোথা নাই–

তবে প্রেম কলুষিত নরকেও আছে!

কেহ বা রতনময় কনকভবনে

ঘুমায়ে রয়েছে সুখে বিলাসের কোলে,

অথচ সুমুখ দিয়া দীন নিরালয়

পথে পথে করিতেছে ভিক্ষান্নসন্ধান!

সহস্র পীড়িতদের অভিশাপ লোয়ে

সহস্রের রক্তধারে ক্ষালিত আসনে

সমস্ত পৃথিবী রাজা করিছে শাসন,

বাঁধিয়া গলায় সেই শাসনের রজ্জু

সমস্ত পৃথিবী তাহার রহিয়াছে দাস!

সহস্র পীড়ন সহি আনত মাথায়

একের দাসত্বে রত অযুত মানব!

ভাবিয়া দেখিলে মন উঠে গো শিহরি–

ভ্রমান্ধ দাসের জাতি সমস্ত মানুষ।

এ অশান্তি কবে দেব হবে দূরীভূত!

অত্যাচার-গুরুভারে হোয়ে নিপীড়িত

সমস্ত পৃথিবী, দেব, করিছে ক্রন্দন!

সুখ শান্তি সেথা হোতে লয়েছে বিদায়!

কবে, দেব, এ রজনী হবে অবসান?

স্নান করি প্রভাতের শিশিরসলিলে

তরুণ রবির করে হাসিবে পৃথিবী!

অযুত মানবগণ এক কণ্ঠে, দেব,

এক গান গাইবেক স্বর্গ পূর্ণ করি!

নাইক দরিদ্র ধনী অধিপতি প্রজা–

কেহ কারো কুটীরেতে করিলে গমন

মর্য্যাদার অপমান করিবে না মনে,

সকলেই সকলের করিতেছে সেবা,

কেহ কারো প্রভু নয়, নহে কারো দাস!

নাই ভিন্ন জাতি আর নাই ভিন্ন ভাষা

নাই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আচার ব্যাভার!

সকলেই আপনার আপনার লোয়ে

পরিশ্রম করিতেছে প্রফুল্ল-অন্তরে।

কেহ কারো সুখে নাহি দেয় গো কণ্টক,

কেহ কারো দুখে নাহি করে উপহাস!

দ্বেষ নিন্দা ক্রূরতার জঘন্য আসন

ধর্ম্ম-আবরণে নাহি করে গো সজ্জিত!

হিমাদ্রি, মানুষসৃষ্টি-আরম্ভ হইতে

অতীতের ইতিহাস পড়েছ সকলি,

অতীতের দীপশিখা যদি হিমালয়

ভবিষ্যৎ অন্ধকারে পারে গো ভেদিতে

তবে বল কবে, গিরি, হবে সেই দিন

যে দিন স্বর্গই হবে পৃথ্বীর আদর্শ!

সে দিন আসিবে গিরি, এখনিই যেন

দূর ভবিষ্যৎ সেই পেতেছি দেখিতে

যেই দিন এক প্রেমে হইয়া নিবদ্ধ

মিলিবেক কোটি কোটি মানবহৃদয়।

প্রকৃতির সব কার্য্য অতি ধীরে ধীরে,

এক এক শতাব্দীর সোপানে সোপানে–

পৃথ্বী সে শান্তির পথে চলিতেছে ক্রমে,

পৃথিবীর সে অবস্থা আসে নি এখনো

কিন্তু এক দিন তাহা আসিবে নিশ্চয়।

আবার বলি গো আমি হে প্রকৃতিদেবি

যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবেক তাহা,

এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়।

এ যে সুখময় আশা দিয়াছ হৃদয়ে

ইহার সঙ্গীত, দেবি, শুনিতে শুনিতে

পারিব হরষচিতে ত্যজিতে জীবন!”

সমস্ত ধরার তরে নয়নের জল

বৃদ্ধ সে কবির নেত্র করিল পূর্ণিত!

যথা সে হিমাদ্রি হোতে ঝরিয়া ঝরিয়া

কত নদী শত দেশ করয়ে উর্ব্বরা।

উচ্ছ্বসিত করি দিয়া কবির হৃদয়

অসীম করুণা সিন্ধু পোড়েছে ছড়ায়ে

সমস্ত পৃথিবীময়। মিলি তাঁর সাথে

জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী ভারতী

কাঁদিলেন আর্দ্র হোয়ে পৃথিবীর দুখে,

ব্যাধশরে নিপতিত পাখীর মরণে

বাল্মীকির সাথে যিনি করেন রোদন!

কবির প্রাচীননেত্রে পৃথিবীর শোভা

এখনও কিছু মাত্র হয় নি পুরাণো?

এখনো সে হিমাদ্রির শিখরে শিখরে

একেলা আপন মনে করিত ভ্রমণ।

বিশাল ধবল জটা, বিশাল ধবল শ্মশ্রু,

নেত্রের স্বর্গীয় জ্যোতি, গম্ভীর মূরতি,

প্রশস্ত ললাটদেশ, প্রশান্ত আকৃতি তার

মনে হোত হিমাদ্রির অধিষ্ঠাতৃদেব!

জীবনের দিন ক্রমে ফুরায় কবির!

সঙ্গীত যেমন ধীরে আইসে মিলায়ে,

কবিতা যেমন ধীরে আইসে ফুরায়ে,

প্রভাতের শুকতারা ধীরে ধীরে যথা

ক্রমশঃ মিশায়ে আসে রবির কিরণে,

তেমনি ফুরায়ে এল কবির জীবন।

প্রতিরাত্রে গিরিশিরে জোছনায় বসি

আনন্দে গাইত কবি সুখের সঙ্গীত।

দেখিতে পেয়েছে যেন স্বর্গের কিরণ,

শুনিতে পেয়েছে যেন দূর স্বর্গ হোতে,

নলিনীর সুমধুর আহ্বানের গান।

প্রবাসী যেমন আহা দূর হোতে যদি

সহসা শুনিতে পায় স্বদেশ-সঙ্গীত,

ধায় হরষিত চিতে সেই দিক্‌ পানে,

একদিন দুইদিন যেতেছে যেমন

চলেছে হরষে কবি সেই দেশ হোতে

স্বদেশসঙ্গীতধ্বনি পেতেছে শুনিতে।

এক দিন হিমাদ্রির নিশীথ বায়ুতে

কবির অন্তিম শ্বাস গেল মিশাইয়া!

হিমাদ্রি হইল তার সমাধিমন্দির,

একটি মানুষ সেথা ফেলে নি নিশ্বাস!

প্রত্যহ প্রভাত শুধু শিশিরাশ্রুজলে

হরিত পল্লব তার করিত প্লাবিত!

শুধু সে বনের মাঝে বনের বাতাস,

হুহু করি মাঝে মাঝে ফেলিত নিশ্বাস!

সমাধি উপরে তার তরুলতাকুল

প্রতিদিন বরষিত কত শত ফুল!

কাছে বসি বিহগেরা গাইত গো গান,

তটিনী তাহার সাথে মিশাইত তান।

Amar Rabindranath Logo

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত