কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ‘চৈত্ররজনী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মরমী, প্রকৃতি-নির্ভর ও আত্মমগ্ন লিরিক কবিতা হলো ‘চৈত্ররজনী’। এই কবিতায় চৈত্র মাসের এক উন্মাদ ও স্নিগ্ধ নিশিতে প্রকৃতির চাঁদ এবং ঘরের ছাদে একাকী বসে থাকা কবির মনের মধ্যে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা ও মিলনের সুর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামচৈত্ররজনী (চৈত্র-রজনী)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকল্পনা
কবিতার ধরনপ্রকৃতি ও আত্মমগ্ন লিরিক কবিতা (Nature and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের এক বর্ণাঢ্য ও নান্দনিক সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় রোমান্টিক সৌন্দর্যপ্রীতি, নিসর্গচেতনা এবং মানবজীবনের গভীর অনুভূতির রূপায়ণ দেখা যায়। ‘চৈত্ররজনী’ কবিতায় কবি চৈত্র রাতের নিস্তব্ধতায় আকাশিক চাঁদের সাথে নিজের নিঃসঙ্গতার এক সুন্দর সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন—যেখানে চাঁদ যেমন বিশ্বচরাচরের দিকে একা তাকিয়ে থাকে, কবিও তেমনি শূন্য ভবন-ছাদে একা বসে রাতের বাতাসের সাথে নিজের মনকে মিলিয়ে দেন।

চৈত্ররজনী – সম্পূর্ণ কবিতা

আজি উন্মাদ মধুনিশি ওগো
চৈত্রনিশীথশশী!
তুমি এ বিপুল ধরণীর পানে
কী দেখিছ একা বসি
চৈত্রনিশীথশশী!
কত নদীতীরে, কত মন্দিরে,
কত বাতায়নতলে,
কত কানাকানি, মন-জানাজানি,
সাধাসাধি কত ছলে!
শাখাপ্রশাখার, দ্বার-জানালার
আড়ালে আড়ালে পশি
কত সুখদুখ কত কৌতুক
দেখিতেছ একা বসি
চৈত্রনিশীথশশী।
মোরে দেখো চাহি, কেহ কোথা নাহি,
শূন্য ভবন-ছাদে
নৈশ পবন কাঁদে।
তোমারি মতন একাকী আপনি
চাহিয়া রয়েছি বসি
চৈত্রনিশীথশশী!

Romanized Version

Aji unmad modhunishi ogo
Choitronishithoshoshi!
Tumi e bipul dhoronir pane
Ki dekhiho eka bosi
Choitronishithoshoshi!
Koto noditire, koto mondire,
Koto batayon-tole,
Koto kanakani, mon-janajani,
Sadhashadhi koto chole!
Shakha-proshakhar, dwar-janalar
arale arale poshi
Koto sukh-dukh koto koutuk
dekhitecho eka bosi
Choitronishithoshoshi!
More dekho chahi, keho kotha nahi,
shunyo bhobon-chhade
naish pobon kande.
Tomari moton ekaki aponi
chahiya royechhi bosi
Choitronishithoshoshi!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • চৈত্র রাতের রহস্যময় দৃষ্টি:
“আজি উন্মাদ মধুনিশি ওগো / চৈত্রনিশীথশশী! / তুমি এ বিপুল ধরণীর পানে / কী দেখিছ একা বসি…”
— চৈত্র মাসের এই মত্ত রাতে চাঁদ যেন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা মানুষের প্রেম, কানাকানি, সুখ-দুঃখ ও কৌতুক একা বসে উপভোগ করছে।
  • কবির একাকী সত্তা ও চাঁদের সাথে মিতালি:
“মোরে দেখো চাহি, কেহ কোথা নাহি, / শূন্য ভবন-ছাদে / নৈশ পবন কাঁদে। / তোমারি মতন একাকী আপনি / চাহিয়া রয়েছি বসি…”
— প্রকৃতির মাঝে চাঁদ যেমন একা, কবির জীবনও তেমনি চারপাশের শূন্যতায় একাকী। চাঁদের সাথে কবির এই নিঃসঙ্গতার মেলবন্ধন কবিতাকে এক অপূর্ব বিষাদমাখা সৌন্দর্যে উন্নীত করেছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি (টাইপো সংশোধনসহ) এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কল্পনা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন